বাবুদের টাকায় হতো বারাঙ্গণাদের বাণীবন্দনা – পুলক মন্ডল

বাবুদের টাকায় হতো বারাঙ্গণাদের বাণীবন্দনা

 

তাঁদের পল্লীর মাটি না হলে দূর্গামূর্তি গড়া যায় না। কিন্তু একসময় তাঁদের বাণীবন্দনার খ‍্যাতি ছিল কলকাতা থেকে সারা বাংলা জুড়ে। অমূল্যচরণ বিদ‍্যাভূষন তাঁর ‘সরস্বতী’ গ্রন্থে ১৩৪০ সনে লিখেছেন, ‘ সত্তর আশি বছর পূর্বে কলকাতায় গণিকাদের বাড়িতে কলার অধিকারী দেবীরূপে সরস্বতী পূজায় বেজায় ধুম হইত’।

পলাশির যুদ্ধের পর ইংরেজদের সংস্পর্শে এসে বাংলার যেসব জমিদার, তালুকদার, দেওয়ান হঠাৎ নবাব হয়ে উঠেছিলেন, তাঁরা দু’হাতে পয়সা উড়িয়ে ‘নববাবু’ নামে পরিচিত হন। এই বাবুরা বারো মাসে তের পার্বণে বাঈ নাচিয়ে, গোলাপ জলে জলশৌচ করে, টাকার নোটের ঘুড়ি উড়িয়ে বাবুগিরি ফলাতেন। এঁদের বাবুগিরির অন্যতম প্রধান অঙ্গ ছিল ‘নববিবি’ রাখা। এই নববিবি বা বারাঙ্গনাদের হাজার আবদার রাখার মধ্যে নববাবুদের ইজ্জত বাড়ত ধনী সমাজে।

একসময় পুরোনো কলকাতায় ধনীবাবুদের সরস্বতী পূজার খুব জাঁকজমক ছিল। ১২৫২ সনের ২২শে মাঘ ‘সম্বাদ ভাস্কর’ লিখছে, ‘ গত শনিবার কলিকাতা নগরে সরস্বতী পূজা অতি বাহুল্য রূপে হইয়াছে। বিশেষত, বাবু আশুতোষ দেব, বাবু প্রাণকৃষ্ণ মল্লিক ও বাবু ব্রজনাথ ধর- এই তিন সম্ভ্রান্ত ধনীর বাটীতে উত্তমরূপে আমোদ হইয়াছিল’। পূজো উপলক্ষ্যে কালোয়াতি বা ওস্তাদি গানবাজনার আসর বসত এবং অবশ‍্য করে নববিবিদের নাচের আসর। আবার কলকাতা থেকে দূরে গ্রামের জমিদার বাড়িতেও পূজো উপলক্ষ্যে হত মস্ত সমারোহ। যেমন কৈখালির জমিদার বাবু কৃষ্ণকান্ত দত্তের বাড়ির বাণীবন্দনায় কলকাতা থেকে গোলকমনি, রাসমনি ও দয়ামনি এই তিন নামডাকওয়ালা বারাঙ্গণা নাচতে আসত।

তো এইরকম এক সরস্বতী পূজোর আগের দিন বিকেলে বাবুদের বাড়ি বাড়ি প্রতিমা সাজানো হচ্ছে দেখে এক বারাঙ্গণার হঠাৎ পূজো করার সাধ হলো। বাবু পূজোর ব‍্যবস্থা করে দিলেন। কুমোরটুলির অবিক্রিত জগদ্ধাত্রীকে সরস্বতী বানানো হলো।

গণিকাপাড়ায় যেদিন সরস্বতী পূজো চালু হল, বাবুরা নিজেদের বাড়ির পূজো ফেলে নববিবিদের পূজো দেখতে ছুটতেন। ১২৮০ সনের ‘সুলভ সমাচার’ লেখে, ‘ হিন্দু পর্বের মধ্যে কার্ত্তিক ও সরস্বতী পূজোর প্রতি বেশ‍্যাদিগের কিছু অনুরাগ দেখিতে পাওয়া যায়। সন্তান কামনা করিয়া লোকে কার্ত্তিক পূজো করে এবং বিদ‍্যালাভের জন্য সরস্বতী। গণিকাদের পক্ষে এই প্রকার কামনা নিতান্ত অনধিকার চর্চা, তথাপি তাহারা কার্ত্তিক ও সরস্বতী পূজায় খুব ধুমধাম করিয়া থাকে’।

পদ্মপুরান, কৈবর্ত‍্যপুরান প্রমুখ পৌরাণিক ব‍্যাখ‍্যানুযায়ী সরস্বতী পান্ডিত‍্যের সাথে নৃত্য ও সঙ্গীতে পারদর্শী ছিলেন। একারনেই হয়ত সেকালে বারাঙ্গণারা বাণীবন্দনায় মেতে উঠেছিলেন কেননা সেসময় বারাঙ্গণাদের প্রধান অস্ত্রই ছিল নাচে-গানে পারদর্শিতা দেখানো।

সরস্বতী পূজোর দিন নববিবিদের আস্তানা নতুন এক উৎসবে মেতে উঠত। নতুন মেয়েদের বাবু ভোলানো বিদ‍্যায় হাতেখড়ি দেওয়া হতো সেদিন। কেউ কেউ একে ‘নথ ভাঙার দিন’ বলতেন। সেদিন এসব মেয়েদের নতুন নামকরণ হতো। যেমন খেঁদি, খেন্তিরা হয়ে উঠত গোলাপ বা টগর, জুঁই বা কামিনী। এদের তালিম দেওয়া হতো নাচ-গান, হারমোনিয়াম, ঘুঙুর আর তানপুরাতে।
এসবের বিস্তৃত বিবরণ রয়েছে ভবানীচরন বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়র ‘ নববিবি বিলাস’ গ্রন্থে। আবার ভুবনচন্দ্র মুখোপাধ‍্যায় নিশাচর ছদ্মনামে ‘ সরস্বতী পূজা’ শীর্ষক সামাজিক নক্সাতে লিখেছেন, ‘ কলকাতা শহরের সকলই সৃষ্টিছাড়া। এখানে গৃহস্থ বাড়ির চেয়ে বেশ‍্যা বাড়ির পূজার সংখ্যা ও জাঁকজমক শতগুণে অধিক। অনেক বড় মানুষ নিজ বাড়িতে বুট ও বীরখন্দী বরাদ্দ করে মুদীর দোকানে বরাৎ দিয়ে দু-হাজারী তোড়া নিয়ে নতুন বাড়িতে হাজির হলেন ‘।

সেকালে বারাঙ্গণারা সমাজে মোটেই নিন্দিত ছিলেন না, বরং অনেক বেশি সম্মান ছিল কেননা নারীজাতির মধ্যে একমাএ তাঁরাই ছিলেন শিক্ষিত। সে কারণে নাচ-গান থেকে নাটক-যাত্রার আসরে অভিনয়ের জন্য তাঁদেরই ডাক পড়ত। গৃহস্থবাড়ির মেয়েরা অন্দরমহলের বাইরে কদাচিৎ বের হতেন এবং তাও পর্দা ঢাকা পালকিতে। অন্যদিকে বারাঙ্গণারা সহজেই পথে বের হতেন এবং পুরুষ সমাজে মেলামেশা করতেন, খোঁজ রাখতেন সমাজজীবন ও রাজনীতির। তাঁদের চৌষট্টি কলায় পারদর্শী হতে হতো, তাই একাধারে তাঁরা যেমন নাচে-গানে দক্ষ ছিলেন তেমনই তাৎক্ষণিক বুদ্ধিতেও তাঁরা অন্যান্য নারীদের থেকে এগিয়ে থাকতেন। সেকারনেই রূপে-গুনে শ্রেষ্ঠা বহু বারাঙ্গণার নাম সেকালে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ঘুরত।

তবে ঊনিশ শতকের বাংলায় শিক্ষাক্ষেত্র বা ভদ্রপল্লীর চেয়ে নিষিদ্ধ পল্লীতে কেন সরস্বতী পূজো সংখ্যায় অনেক বেশি হতো তা বোধহয় আজও গবেষণার বিষয় হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *