গোলাপ – অভিষেক সাহা || খোলা চিঠি – শম্পা সাহা || এড়িয়ে -সুতপা ব‍্যানার্জী(রায়) ||

abhisek saha
গোলাপ – অভিষেক সাহা
” আরে শিল্পা, এখনও এখানে। বরের সাথে বেড়াতে যাসনি। একে ভ্যালেন্টাইন ডে ,তাও রোববার, তোর বর তোকে একা ফেলে কোথায় গেল রে ! এই কচি বয়সে ঘুরবি না তো কবে ঘুরবি।” শোভা বৌদি শিল্পাকে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল ।
” আমাদের আবার রোববার, ভ্যালেন্টাইন ডে এসব আছে নাকি! আর কচি বলছ কাকে ? তিরিশ বছর বয়স হল আমার। এক বাচ্চার মা। ওর কারখানায় এখন ওটি চলছে। টাকা কী দেবে জানিনা, তবে যেতেই হবে। এমনিতেই লকডাউনের সময় চারমাস  মালিক বসিয়ে বসিয়ে হাফ মাইনে দিয়েছিল। এখন সব সুদে- আসলে উসুল করে নেবে। মেয়েটার ক্লাস ফোর হল, পড়াশোনার খরচ কী কম ?” শিল্পা উত্তর দিল।
” সে তুই যাই বল, তিরিশ বছর এখন কচিই। কত মেয়ের বিয়ে হয় না। তোরা তো সব প্রেম করে তাড়াতাড়ি বিয়ে করেছিস, তাই এক বাচ্চার মা হয়েছিস। শোন না, আমাদের সময় তো এসব দিনের কথা বাপের জন্মে শুনিনি। এখন যদি আমার ওনাকে বলি, রাগবে কম হাসবে বেশি। তা কিছু স্পেশাল করেছিস ?” শোভা বৌদি জানতে চাইল।
” স্পেশাল করেছি তো। বাড়িতে চিকেন কষা করেছি। ও বলেছে কারখানা থেকে ফেরার সময় বিরিয়ানি নিয়ে আসবে। তিনজনে জমিয়ে খাব। খুব মজা হবে বল!” উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল শিল্পা।
” ব্যস, বিরিয়ানি আর চিকেন কষা। আর কিছু নেই। তোর বরটা কী রে , আনরোমান্টিক, এমন দিনে এত সুন্দর বৌ-টাকে তো গোলাপ দিতে পারত!” বেশ হতাশ হয়ে শোভা বৌদি বলল।
” দিয়েছে তো ।” চোখ দুটো বড় বড় করে বলল শিল্পা।
” কখন দিল রে? ও তো সাতসকালে কারখানায় যায় , রাতে নিয়ে এসেছিল?” আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করল শোভা বৌদি।

একগাল হেসে শিল্পা বলল ” না গো বৌদি, তোমার দেওর যদি আমাকে গোলাপ দিতেও চায় আমি নিতে পারব না। আমার গন্ধ ফুলে এলার্জি আছে। তাই তো ও আমাকে বিয়ের আগে থেকেই  গোলাপ বলে ডাকে।”

খোলা_চিঠি #শম্পা_সাহা

খোলা – চিঠি  –  শম্পা সাহা

নিখিলেশ

আজ প্রেম দিবস। প্রেম ফুল ফোটায় না আমার বাগানে বহুকাল। ধূসর বালি আর বালি, যে দিকে চোখ যায়। সমুদ্রে ঢেউ ওঠাও বন্ধ বহুকাল। মাঝে মাঝে জলরাশি আছড়ে পড়ে সৈকতে , প্রশ্ন করে কি ভুল ছিল আমার, কেন ছেড়ে গেলে, না বলে?

তোমার মনে আছে তুমি আমায় শোনাতে, এই তো হেথায় কুঞ্জ ছায়ায়, স্বপ্ন মধুর মোহে, এই জীবনে যে কটি দিন পাবো, তোমায় আমায় হেসে খেলে কাটিয়ে দেবো দোহে!” কিন্তু কই কাটালে জীবন একসাথে হেসে খেলে?তুমি দূরে চলে গেলে সামান্য কারণে! সন্দেহ, মাত্র এইটুকুই! যদি কারো সঙ্গে কথা বলা মানে প্রেমে পড়া হয়, কোনো পুরুষের সঙ্গে কথা বা গল্প করা মানে তাকে ভালোবাসা হয়, তাহলে বলবো তুমি হয় বোকা অথবা বিশ্বাস শব্দটা তোমার অভিধানে নেই।

তুমিও তো তোমার প্রাক্তন প্রেমিকার বাড়ি যেতে, তা নিয়ে অভিযোগ করেছি কিন্তু ছেড়ে তো যাই নি। ছেড়ে যাওয়া এতোটাই সহজ? হয়তো সহজ, তাই আমার সঙ্গে সঙ্গে আমার বাবাকেও জানিয়ে দিলে তুমি আমাকে বিয়ে করতে পারবে না!

নিখিলেশ প্রেম করবার সময় কি আমার বাবা কে জানিয়েছিলে? যে ছেড়ে যাবার সময় জানালে! তুমি কি এটাই চেয়েছিলে যে বাবা আমাদের সম্পর্কের আরো বিরোধী হয়ে উঠুন? কারণ তুমি জানতে বাবা কোনোদিনই মেনে নেননি আমাদের সম্পর্ক। আমাকে সোজাসুজি ঝেড়ে ফেলতে পারছিলে না বলেই কি আমার বাবাকে জানিয়ে বসলে?

নিখিলেশ, আমার ছেলেবন্ধুর সঙ্গে কথা বলা দেখে ভুলে গেলে, তোমার জন্য কত মার খেয়েছি বাড়িতে? ভুলে গেলে কি ভাবে প্রতিটা চিঠি গোপনে লুকিয়ে পোস্ট করতাম? ভুলে গেলে প্রতি বার তুমি যখন ডিউটিতে যেতে আমার পাগলের মত কাঁদতাম তোমায় জড়িয়ে ধরে, ভুলে গেলে ঘন্টার পর ঘণ্টা তোমার জন্য বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়ানো, ভুলে গেলে হাত ধরাধরি ভিক্টোরিয়ার সামনের রাস্তা ধরে হাঁটা? একজন পুরুষ বন্ধুর সঙ্গে কথা বলার অপরাধে আমাদের সাত বছরের প্রেম মিথ্যে হয়ে গেল? নাকি সত্যি বলতো ওটা তোমার অজুহাত?

তোমার মনে পড়ে সেই ক্যাসেট, “প্রিয় বান্ধবী”, শ্রুতি নাটক, ” হোক না রং ফ্যাকাশে তোমার আমার আকাশে, চাঁদের হাসি হোক না যত ই ক্লান্ত, চাঁদ উঠুক নাই বা উঠুক, ফুল ফুটুক নাই বা ফুটুক আজ বসন্ত! ” আজ আকাশে চাঁদ উঠেছে, গাছে ফুলের অভাবও নেই কিন্তু আমার বাগানে বসন্ত আসেনি আর।

বেঁচে তো থাকে সবাই, যদি শ্বাস নেওয়াকে বেঁচে থাকা বলো, যদি হাঁটাচলা কে বেঁচে থাকা বলো? তাহলে আমি নিশ্চয়ই বেঁচে আছি, বহাল তবিয়তে বেঁচে আছি!

তুমি প্রশ্ন করেছ, যে ছেলেটির জন্য তুমি আমাকে ছেড়ে গেলে আমি তো আজ তার বৌ,তাহলে তোমার সন্দেহ কি সত্যি নয়? জানো ও ও আমাকে ঠিক এই প্রশ্ন টাই করে, সাত বছরের সম্পর্কে আমি কি এঁটো হইনি কখনো?

কি করে প্রমাণ দি বলো তো? , যে তুমি চলে যাবার পর আমার আর কোনো উপায় ছিল না, তুমি আমাকে আমার বাবার কাছ হারিয়ে দিয়ে চলে গেছিলে।বাবা আমাকে যেখানে খুশি, যার সাথে খুশি বিয়ে দিতে পারতো, আর তাকে ঠকিয়ে, লুকিয়ে আমি বিয়ে করতে চাইনি, আর তুমি তো আমাকে প্রত্যাখান করেছিলে!

আমি কি তোমার কাছে দয়া ভিক্ষা করতাম, যে “দয়া করে আমায় বিয়ে করো”, আর বাবা মা এর বিরুদ্ধে আমাদের সময়ে যাওয়ার অত চল ছিল না বা স্বাধীনতা বা মনের জোর ও বলতে পারো! আমাকে তো সিদ্ধান্ত নিতেই হতো। আমি নিলাম, রাগে, ঘেণ্ণায়, তোমার উপর প্রতিশোধ নিতে, ” দেখো তুমি আমাকে ত্যাগ করলেও সবাই আমায় এতটা তুচ্ছও মনে করে না! ” ভেবেছিলাম ও সব জানে, আমাদের সম্পর্ক টাকে অন্তত সম্মান করবে!

কিন্তু না, ও তো আমাকে এঁটো বানিয়ে দিলো! মাঝে মাঝে ভাবি, প্রশ্ন করি, “যদি এঁটো ই ভাবতে তো সব জেনে শুনে বিয়ে কেন করেছিলে? “, কিন্তু করি না। জানি তুমি ও যেমন তোমার সমর্থনে অনেক যুক্তি সাজাবে, ও ও তেমনি সাজাবে।

সব ক্ষেত্রে পুরুষরাই কেন ফরিয়াদি আর আমরা আসামি? কেন আমাদের ই শুধু কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়, কেন আমাদের ই শুধু কৈফিয়ত দিতে হয়? কেন তোমরা সব সময় প্রশ্নকর্তা আর আমরা উত্তর দিতে বাধ্য? কেন? কেন?

 Sutapa Roy

এড়িয়ে 
কলমে-সুতপা ব‍্যানার্জী(রায়)

 

” অতনু দেখ তো এই উত্তরটা লেখা ঠিক হয়েছে কিনা”-
বলেই খাতাটা মেলে ধরে প্রবাল। দুজনেই বোটানি অনার্স নিয়ে পড়ছে প‍্যারিমোহন কলেজে। এটা ওদের ফাইনাল ইয়ার, সাথে এসএসসিতে বসার প্রস্তুতিও নিচ্ছে। অতনু বইয়ের পাতায় তার গোঁজা ঘাড়টাকে উঁচু করে বলে-“কেন রে আমি কি তোর মাষ্টার?”

“না তুই আমাদের ইয়ারের ফার্স্ট বয় আর একটা আস্ত বইয়ের পোকা তাই তোর কাছে আসা।”- প্রবালের কথার ধরণে আপাত গম্ভীর অতনুও হেসে ফেলে। অতনুর এই চেষ্টা যেমন লেখাপড়াকে ভালবেসে তেমন কতকটা অবস্থার চাপে। ওর বাবা ওর ছোটবয়সেই মারা গেছেন তারপর থেকে মামার বাড়িতে মানুষ। ছেলেকে মানুষ করবার জন্য অতনুর মা বিমলাকে দাদা-বউদিদের মন জুগিয়ে চলতে হয়। তাই অতনু চায় একটা ভদ্রস্থ চাকরি, যা দিয়ে ওদের মা-ছেলের সংসার চলে যাবে।

সেই তুলনায় প্রবালের চাপ কম, বাবা-মা দুজনেই চাকরি করে, স্বাচ্ছল‍্যেই থাকে। প্রবাল লিটল্ থিয়েটারে মেতে থাকে, আজকাল একটা সিনেমা হাউসে ওয়ার্কশপ করছে। তাই পড়ায় যা খামতি থাকে তার জন্য অতনুর কাছে চলে আসে। বাইরে হোটেলে খাওয়াতে নিয়ে গিয়ে প্রবাল বন্ধুর ঋণ শোধ করে। যদিও অতনু বেশীরভাগ সময় যেতে চায় না, সময় নেই বলে। কলেজের পর টিউশন পড়িয়েই অতনু নিজের খরচ চালায়, মনে মনে স্বপ্ন, পাশ করে যদি স্কুলের চাকরিটা পাওয়া যায়।

থিয়েটার, সিনেমা যে অতনুর ভালো লাগে না তা নয় কিন্তু ওসব দেখতে যাওয়া ওর কাছে বিলাসিতার নামান্তর। অতএব অতনু আর প্রবাল দুজনে প্রাণের বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও দুজনের জীবনখাতা ভিন্নভাবে লেখা হয়। অতনু ধারাবাহিক পরিশ্রমের ফল পায় চূড়ান্ত ফলাফলে, ভাল রেজাল্ট করে সরকারি কলেজে বিএড-এ ভর্তি হয়।

প্রবাল চলে যায় মুম্বাইয়ে তার অভিনয় জীবনের জন্য বিভিন্ন রকম তালিম নিতে। প্রথম প্রথম দুই বন্ধুর ফোনে যোগাযোগ থাকলেও আস্তে আস্তে তা ক্ষীণ হয়ে যায়। বরঞ্চ ওদের ইয়ারের যারা পড়াশোনার দিকে এগোতে চায় তাদের সঙ্গে অতনুর যোগাযোগ থাকে।

এভাবে বছর পাঁচেক কেটে যায়, অতনু বিএড শেষ করে এসএসসি দেয়, টেট পাশ করে কিন্তু পরের ধাপে আর এগোতে পারে না, তালিকা ঝুলে থাকে। একদিন ওদের ইয়ারের কুন্তল ফোন করে-” হ‍্যালো অতনু শুনতে পাচ্ছিস, শহর কার্ হোর্ডিং-এ ছেয়ে গেছে দেখ।” অতনু নির্লিপ্তভাবে বলে-“কার?” “কার আবার, আমাদের বন্ধু প্রবালের, “স্বপ্ন সুন্দর”-সিনেমার নতুন নায়ক, খবরের কাগজেও আছে, সব নিউজ পেপারেই দিয়েছে দেখলাম, কাল সিলভার বাংলায় ইন্টারভিউ আছে ওর, দেখিস, এখন রাখছি, আরও খবর পেলে তোকে জানাব।”

ফোনটা ছেড়ে অতনুর বেশ অভিমান হয়, প্রবাল শহরে ফিরে এল, একবারও বলল না, ও যখন বলে নি নিজের থেকে আর অতনু যোগাযোগ করবে না। আর কি বলবে সে-” এই দেখ প্রবাল, ডিগ্রীর কাগজগুলো নিয়ে টেট প্রার্থীদের ধর্ণায় আমার জীবন কেমন কাটছে এই দেখ।” প্রবাল তার সুখ নিয়ে বাঁচুক, মাটির কাছাকাছি রোজকার সমস‍্যাগুলো না হয় তোলা থাক অতনুর জন‍্য।

বাবার কিনে দেওয়া নতুন গাড়িতেই স্টুডিওপাড়ায় যাওয়াআসা করে প্রবাল। আজ গাড়ি চলছে ধীর গতিতে। ড্রাইভার জানালো, সামনে একটা ধর্ণা মঞ্চ আছে, রাস্তায় জ‍্যাম ওই জন‍্যই। প্রবাল স্বগতোক্তি করল-” শহরটা ধর্ণায় ধর্ণায় শেষ হয়ে যাবে, কাজ নেই তো খই ভাজ।” গাড়িটা আস্তে আস্তে জায়গাটা পার হচ্ছে,-” আরে মঞ্চে ও কে? অতনু না, চাকরির দাবীতে অনশন মঞ্চ,”- উক্তিটা করেই তার নতুন বুটসহ পা-টা নিয়ে নামতে যেতে গিয়ে থমকাল। না নামা যাবে না, ওর সব কিছুর ওপর ওর নতুন ছবির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। যদি বিতর্কে জড়িয়ে যায় এই চিন্তায় গাড়ির কাঁচটা নামিয়ে পেরিয়ে যায় প্রবাল।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *