“আমাদের জন্ম দেওয়া এ সমাজ’ই হবে ভবিষ্যতে আমাদের অভিশাপ!” তন্ময় সিংহ রায়

Tanmoy Sinha Roy

এক হাতে দশ লিটারের পাত্র ও অপর হাতে যদি হয় লিটার খানেক , তো এতে সমাজের ভারসাম্য বজায় তো দূর , কবর থেকে অসহায় ও বেদনাবিদ্ধ উঁকি মারে শুধু সমাজের মুন্ডুটা!
দুর্নীতি’র দগ্ধ ঘা আজ এভারেস্ট থেকে মারিয়ানা’র কোষ থেকে কোষে ছুটে চলেছে বিদ্যুৎ গতিতে , এবং তা ক্রমবর্ধমান!
রক্ষক যেন আজও অবতীর্ণ ভক্ষকের ভূমিকায়!
মাৎস্যন্যায় আজও জীবিত তো বটেই , বরং সুস্থ-সতেজতায় দিব্যি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সমাজের প্রসস্থ বুকে!
ফুটবল খেলার মতই সমাজ পরিবর্তন একার দ্বারা হয়না , তবে গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় যে কোনো সরকার আত্মস্বার্থ ও অভিনয় যথাসম্ভব ত্যাগ করে প্রকৃতভাবে যদি করেই বসে সমাজের জন্যে ভালো কিছু’র চিন্তা , তো তা বিলকুল সম্ভব অনেকাংশেই।
এদিকে বিষয়টা হল , বিলাসবহুল জীবন যাপনের স্বপ্নকে দু’চোখের পাতায় চামড়া’র মতন জড়িয়ে , শুধুমাত্র নিজের পরিবার’কে নিয়ে আ-মৃত্যু পরম সুখ ভোগ করার আন্তরিক ইচ্ছেকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরতে গিয়ে উদ্বৃত্ত অর্থ চিন্তায় , মাথা যন্ত্রণার একটা ক্রসিন অ্যাডভান্সড টুক করে জলের সাহায্যে পাকস্থলীতে ছুঁড়ে ফেলতে তো বেমালুম পারে প্রায় সবাই , কিন্তু ব্যাপারটা যদি হয় সমাজকে নিয়ে , তো এর জন্যে সবার আগে ভালো নম্বর নিয়ে মানসিকভাবে কমপক্ষে গ্র‍্যাজুয়েশনটা করা অত্যন্ত জরুরী , যা আবার পারেনা ও চেষ্টা করার ইচ্ছেটুকুও প্রকাশ করেনা অনেকেই।
বর্তমানে এসব চিন্তা করেন বোধকরি আন্তর্জাতিক সিংহী লেখিকা
তসলিমা নাসরিন বা নচিকেতা-এর মতন চুড়ান্ত বোকা বা মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষরা!
তবে এক্ষেত্রে পাওয়া যাবেনা কোনো সরকারী সার্টিফিকেট।
আর এর জন্যে ভোগী নয় , ত্যাগী হওয়াটাও বেশ জরুরী , যা সিংহভাগের যোগ্যতা’র দেওয়ালে আবার ঝোলানোও যায়না।

চায়ের দোকান , রাস্তাঘাট বা হাটে-বাজারে মুখে-মুখে আমরা সমাজ পরিবর্তন করতে পারি অনেকেই ,
পারলে সমগ্র পৃথিবীটা’ই নিতে পারি
কিনে ,
অথবা জিভ চালিয়ে নিজেকে প্রমাণ করতেই পারি সক্রেটিস , কিন্তু বাস্তব প্রয়োগের বেলায় সেই তাঁদের’ই আবার খুঁজে খুঁজে বের করতে লাগে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ!
ইঁদুর যেমন তাঁর নিজের প্রয়োজন মিটিয়েই ঝুপ করে ঢুকে যায় গর্তে , সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে আজ বিষয়টা ঠিক তেমন’ই।
সমাজের উত্তর-দক্ষিণ ও পূব-পশ্চিম আজ পরিপূর্ণতা লাভ করছে যেন সব নিখুঁত অভিনয় দক্ষতায় ভরা মানুষ নামক আত্মকেন্দ্রিক ও বিচিত্র জীবগুলোয়!
অতি সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষগুলো ছাড়াও চতুর্দিকে শুধু যেন ‘আরো চাই , আরো চাই’ ধ্বনিতে মুখরিত সমাজের আকাশটা!
লোভ-লালসার সেনসেক্স সর্বদাই
উর্ধ্বমুখী , এখানে যে কেউ , যে কোনো সময়ে পয়সা রেখে দেখতেই পারে লাভের সুশ্রী বদনখানা।
আর হিংসা ও ঈর্ষা যেন আজ হয়ে দাঁড়িয়েছে মানুষের আদর্শ-এর অঙ্গদ্বয়!

লজ্জা ও ঘেন্না’য় মনুষ্যত্ব আজ প্রবলভাবে ডিভোর্স দিতে চাইছে আমাদের , তবু নাকি আমরা আজও সর্বশ্রেষ্ঠ ডিগ্রিধারী!
পশু-পাখিগুলো কথা বলতে পারেনা , তাই এ যাত্রায় রক্ষে।
ভারতীয় সভ্যতা ও বিশেষত বাংলা’র সংস্কৃতি আজ লুঙ্গি পরে খোলা ময়দানে শীর্ষাসনের মতন অবস্থায় পরিণত!
মর্ডানাইজেশন হতে হতে নগ্নতা আজ প্রবল উল্লাসে ও নির্দ্বিধায় নৃত্য করে বেড়াচ্ছে সমাজের আনাচে-কানাচে!
নবপ্রজন্ম প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার
চেনে’না ,
চেনে লুঙ্গি ডান্স!
এভাবেই সমাজের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কাটা-ছেঁড়াগুলো যদি জোড়া লাগানোর কোনো চেষ্টা আদৌ করা না হয় এখন থেকেই , তো আগামী কয়েক প্রজন্ম পরে ধর্ষণ , খুন , অসভ্যতা , মানসিক ভারসাম্যহীনতা , জালিয়াতি সর্বোপরি দুর্নীতি , বিষাক্ত ঘা-রূপে
একে একে সংক্রমণের মাধ্যমে পচাতে শুরু করবে সমাজের বাকি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে!
অর্থাৎ ক্লোরোফ্লুওরো কার্বন গ্রাস করে নেবে গোটা সমাজটাকেই!
আত্মকেন্দ্রিকতা যে ধর্ষন বা খুনের চেয়েও অনেক বড় ক্রাইম , আর নিজেদের জীবনেই আগামীতে তা উঠবে এক বড় অভিশাপ হয়ে ,
বোঝা যাবে ঠিক সেসময়েই!
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ শেষ সময়ে গিয়ে আর করারও থাকবেনা সু’সজ্জার মাধ্যমে এসবের পুনর্গঠন , অর্থাৎ দাঁত’ই যখন
নেই , তখন আর কি লাভ মর্যাদা দিয়ে?

অন্যদিকে সিংহভাগ মানুষের মগজে পোঁতা রাজনীতির চারাগুলো দিনের পর দিন বেড়ে উঠছে এভাবেই যে ,
কিছু লেখা যদি হিন্দুদের প্রতি দুর্নীতির বিরুদ্ধে লেখা হয় , তো প্রায় অনেকেই ভেবে বসবেন ইনি নিশ্চিত বিজেপি প্রেমে মগ্ন , আবার মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি অন্যায়ের বিরূদ্ধে যদি কিছু ফেলি লিখে , তো বেশিরভাগ মানুষ ভেবে বসবেন যে , ইনি তৃণমূল ভক্ত।
যেন মানুষ বলে আজ আর নেই কিছুই , চতুর্দিকে হিন্দু , মুসলাম , খ্রিস্টান , উঁচু জাত , নিচু জাত , তৃণমূল , বিজেপি , কংগ্রেস , সিপিএম ইত্যাদিতে গিজগিজ করছে সমাজের গর্ভটা!
অনেকে তো আবার সংগোপনে ও নিঃশব্দে ঘ্রাণশক্তি’র দৈর্ঘ্য শুঁড়-এর দ্বারা বাড়িয়ে রাখেন এমনভাবে , যে অন্যের প্রায় প্রতি শব্দেই সি আই ডি হয়ে খুঁজতে থাকেন যে , তিনি বিজেপি , তৃণমূল , কংগ্রেস না সিপিএম?

আসলে মানুষ নামক জীবের মাথাটাই অত্যন্ত অদ্ভুৎ এক বস্তু!
ব্যাপারটা যেন এমন’ই , নিরপেক্ষভাবে বেঁচে থেকে , বাক্ বা লিখন-স্বাধীনতা বলে কিছু উচিৎ নয় হওয়া।
যাঁরা তা করবে বা চাইবে করতে ,
তাঁদের মাথা চেপে ধরবে কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ আর ওদিকে ঠ্যাং ধরবে আর কিছুজন।
তারপর চলবে দুই অথবা চার দলের দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে দুই বিপরীত মেরুতে বেধড়ক টান!
অনেকে তো করেই বসেন প্রশ্ন , ‘আপনি কাউকে দেন না ভোট?’
আমি বলি , ‘হ্যাঁ! মা’কে ভালোবাসি বলে , মা-এর ভূল ধরা কি অন্যায় , নাকি তিনি পারেন’ই না কোনো ভূল করতে?
ভূল করে মানুষ’ই বেশি , পশু-পাখি তো নয়? কিন্তু সেই ভূল যদি চলে দিনের পর দিন , আর তাতে ভালোর থেকে মন্দ হয় বেশি সমাজের , তো বলা বা লেখায় অন্যায়টা ঠিক কোথায়?’

এখন যে প্রসঙ্গে যাবো , তা আগেও ছিল বৈকি কম-বেশি ,
তবুও বিশেষত বর্তমান সমাজের প্রায় সর্বস্তরের মানুষের অনুভূতি’র স্বচ্ছ এক প্রতিফলন!
ধরে নেওয়া যাক পাশাপাশি দুই পাড়ায় হচ্ছে দুই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ,
প্রথমটিতে মুখ্য অতিথি হিসেবে নিয়ে আসা হয়েছে বর্তমান বাংলা সিনেমার কোনো এক জনপ্রিয় অভিনেতা অথবা অভিনেত্রী’কে।
আর দ্বিতীয়টি’তে আনা হয়েছে এক স্বনামধন্য সাহিত্যিক’কে।
এখন দুটি অনুষ্ঠান মিলিয়ে সর্বমোট দর্শক সংখ্যা যদি হয় ১০০ জন , নবপ্রজন্ম তো দেওয়া যাক ছেড়েই , দেখা যাবে ৭০-৮০ জন আবালবৃদ্ধবনিতারূপী দর্শক , বাঁধভাঙা খুশি-আনন্দ ও বিপুল উত্তেজনাকে সপাটে জড়িয়ে ধরে পিঁপড়ের মতন সারিবদ্ধভাবে লাইন দিয়েছে প্রথমটি’র মিষ্টি রস চুষে চুষে খাবে বলে।
কিন্তু প্রশ্ন হল , ছাকনিতে ছেঁকে বাকি যে ২০-৩০ জন বেরিয়ে এসেছে দ্বিতীয়টিতে যাওয়ার জন্যে ,
তবে কি তাঁদের মোট ওজন ওই প্রথম অনুষ্ঠানে’র ৭০-৮০ জনের সমান?
বিষয়টি কি এক্ষেত্রেও তাহলে এমন যে ,
ভারী বস্তুকে তুলতে পারে কিংবা চায় কম সংখ্যক মানুষ , আর হালকা পারে প্রায় সব্বাই?
নাকি মনোরঞ্জন হয় শুধু গ্ল্যামারেই?
না এতে সমাজের ক্ষয়-ক্ষতিগুলো আরোগ্যলাভ করছে বেমালুম?
সাহিত্যিক ও স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সাথে নবপ্রজন্মের ইদানীং পরিচয় ঘটছে ভীষণ কম ,
পাশাপাশি রাজনীতিবিদ আর নায়ক-নায়িকারা ঢুকে পড়ছে তাঁদের কোষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে!
সর্বশেষ একথা বলা’ই বোধকরি যুক্তিসংগত যে , নেতাজি সুভাষচন্দ্র-এর দেশে এভাবে চলতে থাকলে , আমাদের এই ছোটো ছোটো স্বার্থ’ই এ মহীরুহ-সম সমাজকে এক্কেবারে ধূলিস্যাৎ করবে অতি শীঘ্র , এখন অপেক্ষা
শুধু সময়ের , কারণ সময় এ যাবৎকাল পর্যন্ত নিঁখুতভাবে বলে দিয়েছে অনেক কিছুই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *