নতুন রহস্য ধারাবাহিক- মৃত্যুহীন- পর্ব ১ – সুব্রত মজুমদার

    গত একমাসে পরপর চারটে মার্ডার হয়ে গেছে। সম্ভবত সিরিয়াল কিলিং। প্রত্যেকটাই মেয়ে। একই স্টাইলে হত্যা। কোনো একটা বিষাক্ত গ্যাস প্রয়োগে মারা হয়েছে চারজনকে। দারোগার করঞ্জয় সান্যাল শিপ্রার বডির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। বগলে টুপি, ডানহাতে বেতের রুলার আর বামহাতে একটা ডায়েরি বুকের কাছে ধরা আছে।


             দারোগাবাবু বললেন, “পরপর চারটে  ইনসিডেন্ট ঘটেগেল ভায়া, দেখো তুমি কিছু করতে পারো কিনা। ডিপার্টমেন্ট এত খচে আছে যে এই কেসটা সলভ করতে না পারলে আমাকে পত্রপাঠ বিদায় দেবে।  চাকরি গেলে বুড়ো এই বয়সে খাব কি?”লাশটা খুঁটিয়ে দেখছিল বিক্রম । লাশের ঘাড়ের কাছে একটা ট্যাটু, সদ্য আঁকা হয়েছে। সারা দেহে ধস্তাধস্তির কোনও চিহ্ন নেই। 

বাহ্যিকভাবে পরীক্ষা করে আর তেমন কোনও ক্লু পাওয়া গেল না।”লাশটা ফরেন্সিকে পাঠিয়ে দেন। আর আগের তিনটে কেসের ডিটেলস আমার চাই।  যদি সিরিয়াল কিলিং হয় তবে সবগুলো কেস ভালোভাবে স্টাডি করতে হবে।” বিক্রম উঠে দাঁড়াল। মিঃ সান্যাল লাশটাকে ফরেন্সিকে পাঠানোর অর্ডার দিয়ে গাড়িতে চেপে বসলেন। মুখে চিন্তার কালো ছায়া।
                              বিক্রম বলল, “চিন্তার কিছুই নেই মিঃ সান্যাল, আমি আমার যথাসাধ্য করব। শহরের ভেতরে একটা পাগল খুনি ঘুরে বেড়াবে এ আমি হতে দিতে পারি না। তবে এলাকায় পুলিশ টহল বাড়িয়ে দিতে হবে।

আর দরকার একটু সচেতনতা। বাকি কাজটা আমার।””হ্যাঁ বিক্রমবাবু, কেসটা আপনাকে দিয়ে আমি নিশ্চিন্ত। আমি এই থানায় আসার পরপরই এই চারটে ইনসিডেন্ট ঘটল বলে নিজেকে জাস্ট ক্ষমা করতে পারছি না। ”  দারোগাবাবু জবাব দিলেন।বিক্রমকে নামিয়ে দিয়ে দারোগাবাবু থানায় চলে গেলেন। বিক্রম স্নান করে খাওয়া দাওয়া করে নিল।

একটু ঘুমিয়ে নিতে হবে। রাতে বেশ গরম ছিল, সারারাত দু’চোখের পাতা এক করা যায়নি। বিকেলে আবার অঘোরবাবু এসে নানান বায়নাতে জেরবার করে তুলবেন, সুতরাং ঘুমিয়ে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।বিকেলে ঘুম ভাঙতেই মাধবদা চা নিয়ে হাজির।

                  অঘোরবাবুও এসে পড়েছেন। অঘোরবাবুর হাতে একটা ফাইল। ফাইলটা বিক্রমের হাতে দিয়ে বললেন, “কি চলছে মশাই ? শহরটা আর আমাদের বাসযোগ্য থাকল না। শুধু খুন আর খুন। এবার তো বেছে বেছে কুমারী মেয়েদের তুলে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে। শয়তানের কাজ মশাই শয়তানের।

এই নেন আপনার প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট, আপনি বাথরুমে ছিলেন তখন একটা কনস্টেবল এসে  দিয়ে গেল। “”কই দেন। ”  হাত বাড়িয়ে ফাইলখানা নিয়ে তাতে চোখ বোলাতে বোলাতে বিক্রম বলল,” হ্যাঁ মানুষরুপী শয়তান।  ধরতে না পারলে ও আরও খুন করবে।

তবে সাইকো কিলার বলেই মনে হচ্ছে। আগের তিনটে মার্ডারের পদ্ধতি একই, মুখে প্লাস্টিক পরিয়ে দমবন্ধ করে মারা হয়েছে। কোত্থাও কোনও ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেই। আগের কেসগুলোতে যাদের সন্দিগ্ধ হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়েছিল তাদের প্রত্যেককেই প্রমাণের অভাবে ছেড়ে দিতে হয়েছে। কোনও ক্লু পাওয়া যায়নি। “


                   “তাহলে এবার এগোবে কিভাবে ? ” আমি জিজ্ঞাসা করলাম। অঘোরবাবু একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন,” বিক্রমকে তুমি এখনো চিনে ওঠোনি সায়ক, ও পারে না এমন কিছুই নেই। তুমি শুধু চুপচাপ বসে দেখো। “বিক্রম বলল,” ভগবান আমি নই অঘোরবাবু, তবে আপনাদের চেয়ে চোখকান অনেকটাই সতেজ আমার।

আপনারা চোখের সামনে থাকতেও যে যে জিনিস দেখতে পান না সেগুলো আমি দেখতে পাই। আপনাদের সঙ্গে এটাই আমার পার্থক্য। তবে এই কেসে আমি এখনো পর্যন্ত কোনও ক্লু পাইনি। ফাইলগুলো আপনারাও স্টাডি করুন, হয়তো এমন কিছু আপনাদের চোখে পড়ে যেতে পারে যেটা আমার চোখ এড়িয়ে যাবে। ছ’টা চোখের ঘেরাটোপ পেরিয়ে অপরাধীর  পালানো মুশকিল। “
                      বিক্রম বোর্ডের উপ চারটে মেয়ের নাম লিখলে। নামগুলোর তলায় ডিটেইলস। এবার আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল,”প্রথমে দেখতে হবে এই খুনগুলোর মধ্যে কমন কি আছে। একটা কম ফ্যাক্টরের কথা তো আগেই বলেছি, পলিথিনের প্যাকেট পরিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা।

দ্বিতীয় যে কমন ফ্যাক্টর সেটা হল….””…. সবগুলোই আইবুড়ো। ঠিক বললাম কিনা ?” বিক্রমকে থামিয়ে দিয়ে বললেন অঘোরবাবু ।বিক্রমের চোখ ঊজ্জ্বল হয়ে উঠল। “একদম ঠিক বলেছেন অঘোরবাবু । সবগুলো মেয়েই কুমারী।  এছাড়াও আরেকটা কমন পয়েন্ট আছে যেটা  সহজে চোখে পড়া সম্ভব নয়। তবে আমার বিচারে এটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ ক্লু। এনিওয়ান গেস ?”


                       আমি মাথা নেড়ে অপারগতার কথা জানালাম। অঘোরবাবু বলল, “আর তো কিছু মাথায় আসছে না মশাই। তবে চারটে মেয়েই কিন্তু শিক্ষিত ও আধুনিকা। “বিক্রম বলল,”না অঘোরবাবু না, সেটা নয়। যে জিনিসটা আপনারা  মিস করে গেছেন সেটা হল তারিখ। আমি আশা করেছিলাম সায়ক অন্তত এটা খেয়াল করবে। কিন্তু ওর নজরও এড়িয়ে গেছে।”আমি বললাম, “হ্যাঁ তোমার কথাটা মোটেই ফেলনা নয়। সংখ্যাতত্ত্বের উপর আমার বরাবরের ঝোঁক, এই বিষয়টা যে কি করে দৃষ্টি এড়িয়ে গেল…!  “
                   নামের তলায় থাকা তারিখগুলোর তলায় দাগ দিতে দিতে বিক্রম বলতে লাগল,” প্রথম খুনটা হয় ফেব্রুয়ারির পনেরো তারিখ। দ্বিতীয়টি চব্বিশ তারিখ, তৃতীয় খুন হয় মার্চের ছয় তারিখ আর শেষ খুন হল মার্চের পনেরোই। তাহলে সংযোগগুলি হল 15,24,6 এবং 15।” বিক্রম বোর্ডে লিখতে লাগল

“15 =1 +5 =6,  24 =2+4 =6 , 6 , 15=1+5=6
এখানে ছক্কার বন্যা বয়ে গেছে সায়ক ।  আর ছয় মানে তো জানোই, এটা শয়তানের সংখ্যা। সেই ঘুরেফিরে vergin sacrifice। শয়তানের পুজো এবং মানসিক বৈকল্য।  আততায়ী কোনও জটিল মানসিক রোগে ভুগছেন। সে হয়তো মনেপ্রাণে শয়তানের দেখা পাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে । “

” এ তো ডেঞ্জারাস মশাই। শুনেছি এসব লোক খুব ভয়ঙ্কর হয়। না না মশাই একে যে করেই হোক ধরতে হবে। একে না ধরা গেলে মৃত্যুর মিছিল শুরু হবে। আমার তো মশাই হাত পা পেটের ভেতর সেঁধোতে শুরু করেছে। ”  বলতে বলতে চোখ বুজে ফেললেন অঘোরবাবু।বিক্রম কিছু বলতেই যাচ্ছিল কিন্তু ঠিক তখনই মাধবদা এসে দাঁড়াল। “মরা হাজার পরে হবখন। আপনারা রাতে কি খাবেন বলুন। সকাল সকাল রান্না চাপিয়ে দেব। রাতের ট্রেনে আমার  মাসতুতো ভাইয়ের ছেলে আসবে। ওকে নিতে যাব। “


                    “রুটি আর এঁচড়ের তরকারি করে দাও। ফ্রিজে বোধহয় মিষ্টি আছে। একটু পরে আমরাও বেরোবো। আসার সময় কিছুটা মাটন রোগনজুস বা চাপটাপ নিয়ে আসব। তুমি বেশি চাপ নিয়োগ না মাধবদা। ”  বিক্রম উঠে পড়ল।কিছু পরেই আমরা বেরিয়ে পড়লাম। উদ্দেশ্য সন্দেহভাজন যারা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক হয়েছিল তাদেরকে একটু বাজিয়ে দেখা।

চলবে ……

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: