Abhisek Saha

  • # অণুগল্প — হঠাৎ বৃষ্টিতে
    # গল্পকার — অভিষেক সাহা

    বলা নেই , কওয়া নেই বৃষ্টি এসে হাজির। রোজ এই এক হয়েছে।সারাটা দিন মেঘলা রোদের গুমোট, আর তারপর সন্ধ্যা হলেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। সেকি তেজ , মনে হয় যেন ছাদ ফুটো করে ঘরে ঢুকে যাবে। এমনিতে করোনার জন্য বাড়ি থেকে বেরোন প্রায় বন্ধ নিশান্তর। এখন একটু ছাড় দিয়েছে বলে বহু দিন পর বাড়ির বাইরে পা রাখল।তাও ছোটবেলার বন্ধু প্রমথর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে । পনেরো বছর হল স্কুলের চাকরি থেকে অবসর নিয়েছে নিশান্ত। প্রমথর নাতি- নাতনিরা মিলে দাদুর পঁচাত্তরতম জন্মদিনটা একটু হৈহৈ করে পালন করতে দাদুর সব ছোটবেলার বন্ধুদের ডেকেছিল। এমনিতে নিশান্তর ছেলে- বৌমা বাবাকে একটুও বাড়ির বাইরে যেতে দেয় না। কিন্তু এক্ষেত্রে আর না করতে পারেনি। নিশান্তও কথা দিয়ে এসেছে কিচ্ছু হবে না!
    কিন্তু এই অঝোর ধারায় বৃষ্টি হঠাৎ এসে সব পরিকল্পনায় জল ঢেলে দিল। রাত আটটার মধ্যেই প্রমথর বাড়ি থেকে ডিনার সেরে বেরিয়েও পড়েছিল। প্রমথ বারবার বলেছিল ওদের গাড়ি করে বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার কথা। নিশান্ত আপত্তি করে। বলে, এটুকু পথ হেঁটেই চলে যাব। কোনও অসুবিধা হবে না, আর খাওয়াটাও হজম হবে। কিন্তু সে আর হল কোথায়! অর্ধেক পথ আসার আগেই বৃষ্টি নামল।
    আগে ঝড়-বৃষ্টি যাই হোক, রাত এগারোটাতেও রাস্তায় লোকজন থাকত, করোনা আসার পর থেকে আটটা বাজলেই রাস্তাঘাট ধীরে ধীরে জনশূন্য হয়ে যাচ্ছে। এখনও তেমনই অবস্থা। রাস্তার আলোগুলোও আঁধারের সাথে লুকোচুরি খেলছে। একটা বড় বাড়ির নিচে আপাতত আশ্রয় নিল ও ।
    সঙ্গের কাঁধব্যাগে হাত ঢুকিয়ে আরও হতাশ হল নিশান্ত। ছাতাটা আনতে ভুলে গেছে! ওর এই এক সমস্যা। কিছুতেই ছাতা নেওয়ার কথা মনে থাকে না। যতদিন সহধর্মিণী বেঁচে ছিলেন, তিনিই এসব দেখতেন। কথা যেমন শোনাতেন, মনে করে ব্যাগে ঢুকিয়েও দিতেন। বছর পাঁচেক হল তিনি গত হয়েছেন। সেই থেকে বেশিরভাগ দিনই আর ছাতা নেওয়ার কথা মনে থাকে না। ছেলে- বৌমাও বলে বলে ক্লান্ত হয়ে এখন বলাই ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু বৃষ্টি যদি একদম না কমে, বাড়ি ফিরবে কী করে? কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল নিশান্তর।
    ” বাবু কোথায় যাবেন , ছেড়ে দেব ?” নিশান্তর না চাইতেই যেমন বৃষ্টি এসেছে, তেমনই না চাইতেই একটা সাইকেল রিক্সা ওর সামনে এসে দাঁড়ালো। রিক্সা চালক ওকে উদ্দেশ্য করে বলল।
    নিশান্ত দেখল , রিক্সা চালক বয়স্ক, তবে ওর থেকে কম। আর রিক্সার উপরটা প্লাস্টিক দিয়ে ঢাকা। চালক এবং যাত্রী কারুরই গায়ে জল পড়বে না।
    ” বাড়তি কত নেবে ?” ঠিকানা বলে জানতে চাইল নিশান্ত ।
    ” ভাড়ার উপর কুড়ি টাকা বেশি দেবেন ।” রিক্সা চালক উত্তর দিল।
    আর কথা না বাড়িয়ে রিক্সায় উঠে বসল নিশান্ত। প্লাস্টিক দিয়ে ভালো করে ঢেকে নিল যাতে গায়ে জল না পড়ে। রিক্সাচালকের মুখটাও ভাল করে দেখল না, অন্য কোনো দিন দিনেরবেলায় দেখা হলে চিনতে পারবে না ।
    রিক্সাচালক খুবই ভালো ভাবে জল জমে যাওয়া রাস্তার উপর দিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিল। রিক্সার ভাড়া মিটিয়ে, বাড়ির অন্য সবাইকে আড়াল করে নিজের ঘরে ঢুকে গেল নিশান্ত। এক্ষুনি ছেলে- বৌমাদের চোখে পড়লে চারটে কথা শুনতে হত !
    ঘরে ঢুকে গা- হাত -পা- মাথা মুছে, পোশাক বদলে বৌয়ের ছবির সামনে গিয়ে দাঁড়াল নিশান্ত। আজ ওর অভাব ভীষণ মনে হচ্ছে। এমন দিনে ও থাকলে ছাতা নিতে ভুল হত না!
    ” জানতো বিমলা, তুমি থাকলে আজ আমি একটুও ভিজতাম না !” বৌয়ের ছবির দিকে তাকিয়ে আদুরে গলায় বলল নিশান্ত।
    খানিক আগে আসা বৃষ্টির মতই নিশান্তর মনে হল ছবির মধ্যে বৌ যেন হঠাৎ নড়ে উঠলো। তারপর পরিস্কার শুনতে পেল সেই বাজখাঁই গলায় বিমলা বলছে ,” জানি তো! তোমার জন্য তো আমার মরেও শান্তি নেই! সবসময় ভুলো মন। না সংসার , না নিজের প্রতি, কোন দিকে নজর নেই। এই বৃষ্টিতে ভিজলে নিজে তো কষ্ট পাবেই, সেই সঙ্গে বাড়ির সবাইকে ভোগাবে। তাই তো তিন বছর আগে মরে যাওয়া আমার রাখী-ভাইকে রিক্সা দিয়ে পাঠালাম,  তোমাকে ঠিক মত বাড়ি নিয়ে আসতে।”

  •  সমাপ্ত

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top