ASHIM KUMAR CHATTOPADHYAY

নীল দিঘি  //

অসীম কুমার চট্টোপাধ্যায়  //

 

শিশির ভেজা সকাল । ঘুমিয়ে আছে শহর । আমি আর ব্রজমোহন গাড়ি নিয়ে হাইওয়ে  দিয়ে  ছুটে চলেছি । সকালের সোনালী রোদ ছড়িয়ে পড়েছে সদ্য  পাক ধরা ধানের ওপরে । কতরকম পাখি উড়ে বেড়াচ্ছে ।

ব্রজমোহনকে বললাম ,  বলতো এটা  কি কাল ?

জানি না । বলতে পারবো না । কেন বলতো ?

আকাশের রঙ আর চার দিকের প্রকৃতি বলে দিচ্ছে এটা শরৎকাল ।  আসলে আমিও খোঁজ  রাখি না কখন কোন কাল আসে ? একমাত্র শরৎকাল আমার জীবনে জায়গা করে নিয়েছে ।

হঠাৎ থামালাম গাড়িটা । রাস্তার ধার ঘেঁষে দাঁড় করিয়ে নেমে পড়লাম ।

ব্রজমোহন বলল , কি হল , গাড়ি থামালি ? নেচারস কল ।

বললাম ,  না । দেখ ,  ওই গাছটা । শিউলি ফুলে ঢেকে আছে । একটা মাটির বাড়ি । উঠোনে ছড়িয়ে সকালের শিউলিফুল । এর গন্ধ তোকে বলে দেবে ” এসেছে শরৎ  …।” এ জিনিস তোদের ইউ পি তে পাবি না । চল , কাছে গিয়ে দেখবি ।

তুই যে কবি হয়ে গেলি । কবিতা লিখিস ?

না ।  আমি  রসকষ হীন এক ইঞ্জিনিয়ার । লোহা লক্কর নিয়ে আমার কাজ । তবে শরৎকালের সাথে আমার জীবনের একটা বড় অধ্যায় জড়িয়ে ।

ইন্টারেস্টিং । শুনতেই হয় ।

তাহলে শোন ।

আমি তখন সদ্য ষোল পেরিয়ে সতেরোয় পদার্পণ করেছি । তবুও আমি ছোট । একা  একা বাড়ির বাইরে যাওয়া নিষেধ । স্কুলে যাওয়া আসা পুল কারে । বাড়িতে কড়া শাসন। তার ওপর রয়েছে আমার দিদির খবরদারি । পান থেকে চুন খসলেই মায়ের কাছে নালিশ । আশ্চর্যের ব্যাপার মা সব সময় দিদির কথা বিশ্বাস করত । আর তার ফল স্বরূপ বকা জুটতো আমার কপালে । এক কথায় আমি ছিলাম গৃহবন্দী । স্কুলের পড়া বাদ  দিলে বাকি সময়টা আমি ছবি আঁকতাম  আর কাটুম-কুটুম করতাম ।ঠিক এমন সময় একদিন মাসি আর মেসো এসে হাজির । বছরে প্রতিবার এই সময়টা মাসি আর মেসো আমাদের বাড়িতে আসে ।

মাসির বাড়ি বীরভূমের লাভপুরে । একটা গ্রামে । তবে বর্ধিষ্ণু গ্রাম । ছোট বেলায় মার সাথে কয়েকবার গেছি । মাসির বাড়ি দূর্গা পুজো হয় । দুর্গাপুজোর কটা দিন ওখানে কাটিয়ে বিজয়া করে তারপরে বাড়ি ফিরতাম । আর একটু বড় হয়ে বাবার সাথে কলকাতার ঠাকুর দেখে আমিতো বিভোর হয়ে গেছি । এত জাঁকজমক,এত আলোর রোশনাই, প্যান্ডেলের কারুকার্য , দুর্গাপ্রতিমা নির্মাণে শিল্পের বৈচিত্র আমাকে মুগদ্ধ করে দিয়েছে । পুজোর সময় গ্রামে যাওয়ার ইচ্ছেটাই নষ্ট হয়ে গেল। দিদিও যাবে না । অগত্যা আমাদের ছেড়ে মা একা কি করে যায় ? সেই থেকে পুজোর সময় মাসির বাড়ি যাওয়া বন্ধ । তবুও প্রতিবছর পুজোর আগে মাসি আর মেসো আসবে । আমাদের নেমন্তন্ন করতে । বার বার অনুরোধ করবে যাওয়ার জন্য ।

সেবারেও এসেছে । মেসো হঠাৎ প্রস্তাব দিল, ঠিক আছে গনু এখন বড় হয়ে গেছে । ও আসুক ।

আমার ভালো নাম গনেশ । সে তো তুই জানিস । ওই একটাই নাম । বাড়ির সবাই আদর করে গনু বলে ডাকে তবে স্কুলের স্যাররা আমাকে দাশু   বলে ডাকতেন । দাশু বলে ডাকার কি কারন থাকতে পারে ? আমার নাম তো আর দাশু নয় গনেশ । পরে অবশ্য জেনেছি যে আমার চেহারার সাথে সুকুমার রায়ের লেখা ” দাশুর কীর্তি ” গল্পের দাশুর সাথে নাকি অনেক মিল । বিশেষ করে দুজনের চুল অবিন্যস্ত এবং উস্কোখুস্কো ।

যে কথা বলছিলাম, মা তো আমাকে কিছুতেই একা ছাড়বে না । মা সব সময় আমাকে ভাবে বাচ্চা ছেলে । রাস্তায় হারিয়ে যাবো আর তা না হলে ছেলেধরা আমাকে ধরে নিয়ে যাবে । মা কে কিছুতেই বোঝাতে পারি না যে আমি বড় হয়েছি ।

মেসো বলল , কলকাতা থেকে বোলপুর কয়েক ঘন্টার ব্যাপার ।   এখান  থেকে ট্রেনে তুলে দেবে ,ওখানে আমি নিজে থাকবো স্টেশনে । কোন অসুবিধে হবে না ।

মাসি আর মেসোর চাপা চাপিতে শেষ পর্যন্ত মা রাজি হয়ে গেল ।

আমার তো দারুন আনন্দ । গ্রামের পুজো দেখার আনন্দ মোটেই না । এই প্রথম একা  একা  বাড়ির বাইরে যাবো । ভাবলেই গায়ে কাটা দিচ্ছে । এছাড়া অন্য  একটা কারন আছে । ওখানে আছে অন্তরা । মাসিদের পাশের বাড়িতে থাকে সুধা মাসি । সুধা মাসির মেয়ে অন্তরা । টানা টানা চোখ , তন তনে  গাল , লাল ঠোঁট । কি দারুন দেখতে । তবে হ্যাঁ , নাকটা একটু বোঁচা । না , বোঁচা  ঠিক না । চাপা । টোপা  কুলের মত । মুখের সাথে মানিয়ে গেছে । মেয়েটার সব ভালো শুধু একটাই দোষ ।  আমার  চেয়ে তো অন্তত বছর দুয়েকের ছোট হবে । হলে কি হবে মানেই না   আমাকে । সব সময় দুস্টুমি । এমন এমন প্রশ্ন  করত   যে  আমি একদম বোকা হয়ে যেতাম ।

একবারের কথা শোন । তখন  সবে  ক্লাস সিক্সে   উঠেছি | মায়ের সাথে গেছি মাসির বাড়ি । এক বাড়ি  লোকের মাঝে  আমার মাথাটা একদম হেট  করে দিল । সবার সামনে না বললে কি চলতো না ? মাসির ছেলে রাহুল দাদা আমাকে   বলেছিল শান্তিনিকেতন দেখাতে নিয়ে যাবে । শান্তিনিকেতন  কি তখন আমি জানি না । একটা বেড়াবার জায়গা ভেবে গেছিলাম মার  কাছে অনুমতি নিতে । মা তখন গল্পে মশগুল । এক ঘর লোক ।

একটু ভুল করে বলে ফেলেছিলাম ,  রাহুল দাদার শান্তিনিকেতনে যাবো ?

মা কিছু বলার আগেই  অন্তরা  বলে উঠলো , কার শান্তিনিকেতন ?

আমি কিছু না বুঝে বললাম , রাহুলদাদার ।

সবার কি হাসি । বুঝলাম কিছু একটা ভুল করেছি ।

অন্তরা  বলল , বুদ্ধুরাম , ওটা রাহুল দাদার না , রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তৈরী । ওখানে উনি থাকতেন । এখন একটা বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় ।

আমি তো এসব কিছুই জানি না । হা করে তাকিয়ে আছি অন্তরার মুখের দিকে । খুব রাগ হল । সবার সামনে আমাকে বুদ্ধুরাম বলার কি দরকার ?

তবু আমার ভালো লাগে অন্তরাকে । মাসির বাড়ি যাওয়া মানে অন্তরার সাথে দেখা হওয়া ।বুকটা আনন্দে নেচে উঠলো । আরে বাবা সতেরো বছর বয়স হল এখনো যদি প্রেম না আসে আর কবে আসবে ? কত ভাবনা । রাত্রে ছটফটানি । মনে হচ্ছে সাদা মেঘের মত ভেসে বেড়াচ্ছি । দোহাই ভগবান, এর মধ্যে যেন অসুরের মত কালো মেঘ ছুটে না আসে । আমার আর অন্তরার ভালোবাসায় যেন জল না ঢালে ।

পৌঁছে গেলাম মাসির বাড়ি । দারুন সব ব্যবস্থা । মেসো একটা সাদা আম্বাসাডার কিনেছে । সেটা নিয়েই গেছিল আমাকে স্টেশন থেকে আনতে । গ্রামের দুর্গাপুজোর আবহাওয়া আমার মনে হিন্দোল জাগিয়েছে । উহ ! কী  বোকা আমি । শুধু ভিড়ের মধ্যে শহরের পুজো দেখতে গিয়ে এতগুলো বছর অন্তরাকে মিস করলাম । যা হয়ে গেছে তার জন্য আর দুঃখ করে লাভ নেই । এখন থেকে প্রতি বছর আসতেই হবে ।

সেদিন ছিল সপ্তমী । আমার ঘরটা দোতালায় রাস্তার দিকে । ঘরে শুয়ে শুয়ে খোলা জানলা দিয়ে বাইরেটা দেখা যায় । পাঁচিলের  ধারে একটা শিউলিফুলের গাছ । ফুলে ঢাকা । শিউলি ফুলের গন্ধে বাতাস গেছে ভরে । সকালের হিমেল হাওয়া যাতে ঘরে না আসে সেইজন্য মাথার দিকের জানলাটা মাসি বন্ধ করে দিয়েছে ।

বলেছে , খবরদার ! জানলা একদম খুলবি না । নতুন জায়গা । শরৎকালের এই সময়টা বিশেষ করে   সকাল আর সন্ধ্যে বেলায় খুব সাবধানে থাকতে হবে । মনে রাখবি এটা  শহর নয় ,গ্রাম ।একটা হালকা শীতের আমেজ আছে।আমাদের অভ্যেস আছে । তোর নেই । তাই একটু সাবধানে থাকবি ।

মা আর মাসি দুজনেই এক । সব সময় আমাকে ছোট বানিয়ে রাখবে । আমি যে বড় হয়েছি সেটা কিছুতেই মানবে না । না মানুক আমি আমার মত থাকবো । দুদিন হল এসেছি এখনো অন্তরার সাথে একবারও দেখা হল না । কাউকে জিজ্ঞেস করাও যাচ্ছে না । কে কি ভাববে?

নিচে রাস্তায়  কারা  যেন কথা বলছিল । তাদের কথায় আমার ঘুমটা গেল ভেঙে । বুঝতে পারছি না কটা  বাজে । ঘরের ভেতরটা অন্ধকার । মশারির ভেতর থেকে হাত বাড়িয়ে জানলাটা খুললাম ।জানলা খোলা পেয়ে ছোট শিশুর মত ঝাঁপিয়ে পড়লো একমুঠো রোদ্দুর । সকালের শিশির ভেজা রোদ । মুখটা একটু ঝুঁকিয়ে নিচের দিকে তাকাতে দেখি একটি কিশোরী মেয়ে একটা ম্যাক্সি পরে হাঁটু  মুড়ে বসে কি করছে । একটু দূরে আর একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে । দুজনে মিলে  গল্প করছে । দূরে দাঁড়ানো মেয়েটা একটু রোগা । গায়ের রঙ কালো ।মুখটা শুকনো । দেখে মনে হয় গরিব ঘরের মেয়ে । হঠাৎ মেয়েটা বলল ,

অন্তরা দিদি , তোমার পেছনে দেখ কত ফুল ।

লাফিয়ে উঠলাম বিছানায় । তারমানে যে মেয়েটা ফুল কুড়াচ্ছে সেই আমার অন্তরা । এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে মাসি যে চাদরটা দিয়েছিল সেটা গায়ে জড়িয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে নামলাম নিচে ।ওর সামনে গিয়ে অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম । এবার কি করবো ? এতটা উৎসাহ দেখানো কি ঠিক হল ? যা চালাক মেয়ে ঠিক বুঝে যাবে । একটু লজ্জা লাগছে । আমার পায়ের শব্দে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো । কি সুন্দর দেখতে হয়েছে অন্তরাকে । এত সকালে স্নান করা হয়ে গেছে । একটা ঝুড়িতে শিউলি ফুল কুড়াচ্ছে ।

আমার দিকে না তাকিয়েই বলল , শুনেছি তুমি এসেছ । পুজোর কাজে এত ব্যস্ত যে সময় করে উঠতে পারি নি । তুমি কত বড় হয়ে গেছ । তবে মাথার চুলগুলো আগের মতই  কাকের বাসা ।

প্রতিবাদ করে উঠলাম , মোটেই না । ঘুম থেকে উঠলাম বলে ওরকম লাগছে । তুমি অনেক সকালে উঠেছ ?

শুধু ওঠা নয়, স্নান পর্যন্ত হয়ে গেছে । এরপর তো ঠাকুর মশাইকে সব জোগাড় দিতে  হবে ।

কথা খুঁজে পাচ্ছি না । কী বলবো ? আমার এই এক দোষ । মেয়েদের সামনে কেমন বোকা হয়ে যাই । কিছুতেই মুখে কথা যোগায় না । কিছু না ভেবে দুম করে বলে  বসলাম ,

এত ফুল দিয়ে কী হবে ?

ভাগ হবে ।

মানে ?

দুটো ভাগ হবে । একটা আমাদের মানে তোমার মাসির বাড়ির পুজোর জন্য আর একটা মুনিয়ার জন্য ।

কে মুনিয়া ?

এই যে দাঁড়িয়ে আছে । আমার বন্ধু । ওর মা আমাদের বাড়িতে কাজ করে । শরৎকালে দুর্গাপুজোর সময় মুনিয়া বাজারে ফুল বিক্রি করে । দুটো পয়সা পায় । ও ফুলে হাত দেয় না । আমি কুড়িয়ে দিই । এই ফুলগুলো নিয়ে যাবো নীল দীঘির ধারে । জীবন কাকাকে বলা আছে । পদ্মফুল তুলে আনবে । সেটাও দু ভাগ হবে । একটা আমাদের জন্য আর একটা মুনিয়ার জন্য । জানো  গনু , মুনিয়া খুব ভালো মেয়ে । আমি অনেকবার বলেছি এই সব ফুল বিক্রি করে তুই যে টাকা পাস আমি তত টাকা আমার বাবার কাছ থেকে চেয়ে দেব । ও কিছুতেই টাকা নেবে না ।

বলে , কাজ করে পয়সা আয়  করবো । পরের টাকা দিয়ে বাবুগিরি ভালো দেখায় না । তা ও যখন টাকা নেবেই না তখন ওকে ফুল তুলে দিই । কারোর জন্য কিছু করতে পারলে ভালো লাগে ।

আমারও কেমন ইচ্ছা করলো কিছু করার । এক দৌড়ে ঘরে চলে গেলাম । একটা ছোট ঝুড়ি নিয়ে আবার এলাম ।

অন্তরা   বলল , তুমি আবার ঝুড়ি দিয়ে কি করবে ?

বললাম , তুমি বাড়ির পুজোর জন্য ফুল তোল আর আমি মুনিয়ার জন্য তুলছি ।

মুচকি হাসলো অন্তরা ।

বলল, খুব ভালো । দুজনে মিলে ফুল তুললে তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে ।

আমাকে তখন আর কে পায় । মনের আনন্দে ফুল কুড়াচ্ছি আর ঝুড়ি ভর্তি করছি ।

বললাম , কাল থেকে সকালে আমাকে ডাকবে । দুজনে একসাথে ফুল তুলবো ।

 

হঠাৎ ঘড়ির দিকে নজর পড়াতে বললাম ,  ব্রজমোহন , অনেক বেলা হয়ে গেল । খিদেও পেয়েছে । চল , আগে কোলাঘাটে যাই । ব্রেকফাস্ট সেরে তারপর আবার যাওয়া যাবে ।

গাড়ি স্টার্ট দিলাম । এগিয়ে চলেছি কোলাঘাটের দিকে । এক সময় পৌঁছে গেলাম । গাড়ি পার্ক করে একটা টেবিলে বসলাম । গাড়ি ড্রাইভ করার সময় আমি হালকা খাই । তাই খেলাম । ব্রজমোহন অবশ্য পুরোটাই খেল । আবার গাড়িতে গিয়ে বসলাম । গাড়ির ঝাঁকুনিতে  ব্রজমোহনের চোখ বুজে আসছিল ।

বললাম , পেছনের সিটে  বসে একটু ঘুমিয়ে নাও । বাধ্য ছেলের মত ব্রজমোহন পেছনের সিটে বসে ঘুম লাগাল ।

ঘন্টা খানেক যাবার পরে ঘ্যাচ করে ব্রেক চেপে গাড়ি থামালাম। আচমকা গাড়ি থামাতে ব্রজমোহন ব্যালেন্স হারিয়ে নিচে পড়ে যাচ্ছিল । সামলে নিল কোনমতে ।

বলল, কি হল আবার ?

বললাম বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখ । পুকুরটায় ভর্তি পদ্মফুল । চল, একটু হেঁটে আসি ।

তুই কি পাগল হয়েছিস ? এই রোদ্দুরে কি করতে যাবো ?

পদ্মফুল একটু ছুঁয়ে দেখবো ।

আমি আর দাঁড়ালাম না । মেঠো ঢালের পথ ধরে এগিয়ে চললাম ।ব্যাচারা ব্রজমোহন ! আমার জেদের কাছে হার মেনে আমাকে অনুসরণ করলো । কাছে গিয়ে একটা পদ্মফুলের ওপর হাত বুলাতে বুলাতে বললাম ,

এখানটায় না এলে আমার গল্পটা শেষ করতে পারতাম না ।

একটা সিগারেট ধরিয়ে ব্রজমোহন বলল , তাহলে শোনা যাক গল্পের বাকি অংশটা ।

ফুল তোলা হয়ে গেলে তিনজনে মিলে চললাম নীল দীঘির ধারে । এই দিকটায় আমি আগে কখনো আসি নি । বেশ বড় বড় পুকুর । প্রত্যেকটার আলাদা আলাদা নাম । নীলদীঘি , লালদীঘি , তেতুঁল দীঘি  , বামুনদীঘি এই রকম আরও কত । একমাত্র নীলদীঘিতেই প্রচুর পদ্মফুল ফুটেছে । সব নীল পদ্ম । সেইজন্য মনে হয় এর নাম নীলদীঘি ।বাঁধানো একটা ঘাট আছে বটে তবে পলেস্তরা উঠে ইট বেরিয়ে গেছে । অনেক জায়গায় ইটও নেই ।

অন্তরা বলল , এই দীঘিতে কেউ স্নান করে না । দীঘির জল ভ্রমরের মত কালো , স্থির । একটু ভালো করে তাকালে দেখা যায় জলের নিচে প্রচুর শ্যাওলা ।

অন্তরা বলল, এগুলোকে বলে ঝাঁঝি । খুব বিপদজনক ।

জীবন কাকা ঘাটে বসে মনের সুখে বিড়ি টানছিলেন । আমাদের আওয়াজ পেয়ে ঘুরে দেখলেন ।

বললেন, অনেক্ষন থেকে এসে বসে আছি ।

জীবন কাকা জামা কাপড় খুলে একটা লম্বা গামছাকে মালকোচার মত পড়লেন । একটা ছোট শিশি থেকে সর্ষের তেল বের করে খুব ভালো করে গায়ে হাতে,পায়ে মেখে নিলেন । তারপর একটা লম্বা বাঁশ  ছুড়ে দিলেন জলের ওপর । বাঁশের ডগায় ছোট মত একটা কঞ্চি আকসির মত বাঁধা । পদ্মফুলের ডাঁটিতে আকসিটা লাগিয়ে একটা টান দিতেই ডাঁটি সমেত পদ্মফুল উঠে আসছে । দেখতে দেখতে প্রচুর তোলা হয়ে গেল ।আমি আর অন্তরা বসলাম ভাগ করতে ।

অন্তরা বলল , জীবন কাকা , আজকে আর তুলতে হবে না ।  কালকে আবার তুললে  হবে ।

জীবন কাকা উঠে এলো । আমরা হাঁটা দিলাম বাড়ির পথে । মুনিয়া একটা ব্যাগের মধ্যে শিউলিফুল আর একটা ব্যাগের মধ্যে পদ্মফুল নিয়ে চলল বাজারের দিকে ।পুরো রাস্তাটা আমি আর অন্তরা গল্প করতে করতে এলাম । এতো ভালো লাগছিল যে মনে হচ্ছিল আমি যেন শরতের আকাশের সাদা মেঘ । ভালোবাসার ভেলায় ভেসে চলেছি । জীবনে প্রথম কোন সুন্দরী মেয়ের পাশে পাশে হাঁটা । সতেরো বছর বয়সে বান্ধবী । বড় হতে আর বাকি কি আছে ?

পরের দিন খুব ভোরে উঠে পড়েছি । ডাকতে হয় নি । আগের দিনের ঝুড়িটা নিয়ে চলে গেলাম শিউলি ফুল কুড়াতে । একটু বাদেই এসে গেল অন্তরা আর মুনিয়া । অনেক গল্প হল । ফুল কুড়াতে যে এত মজা লাগে আগে তা জানা ছিল না । তারপর সেখান থেকে গেলাম নীলদীঘিতে । জীবন কাকা তখনও আসেন নি । আমরা বসে আছি । সময় এগিয়ে চলেছে । অষ্টমী পুজো বলে কথা । দেরি করা যাবে না । আবার বেশি দেরি করলে মুনিয়ার সব ফুল বিক্রিও হবে না ।

অন্তরা বলল , ইস ! কত বেলা হয়ে যাচ্ছে । এর পরে জীবন কাকা এলে অনেক দেরি হয়ে যাবে । কি যে করি ?

হঠাৎ আমার কি হল কথা নেই বার্তা নেই ঝাঁপ দিলাম দিঘীর জলে ।

অন্তরা  চিৎকার করে উঠলো । উঠে এসো । এখুনি উঠে এসো ।

আমি বললাম , সাঁতার জানি । ভয় পেয়  না ।

তারপর লম্বা বাঁশটা  দিয়ে আকসির মত করে জীবন কাকার মত ফুলের ডাঁটায়  লাগিয়ে টান  দেবার চেষ্টা করলাম । ব্যাপারটা যত  সহজ ভেবে ছিলাম তত সহজ নয় । বাঁশ  সামলাতে গেলে মাথা ডুবে যায় । আবার মাথা তুলে রাখতে গেলে ফুলের পাপড়ি ছিঁড়ে  যাচ্ছে । মহা  সমস্যা । বাধ্য হয়ে বাঁশ  ফেলে দিলাম । ভেসে ভেসে ফুলের কাছে গিয়ে ডাঁটি  ধরে টানতেই উঠে আসতে  লাগল । এটাই ভালো । ফুল তুলতে তুলতে খেয়াল করি নি কখন অনেকটা ভেতরে চলে গেছি ।হঠাৎ মালুম হল ঝাঁঝরিতে পা আটকে গেছে । আপ্রাণ চেষ্টা করছি পা ছাড়াবার । যত  চেষ্টা করি ততই আটকে যাচ্ছে । কোন ভাবেই নিজেকে ছাড়াতে পারছি না । হাত ধরে আসছে । মাথা ভার হয়ে আসতে আসতে ডুবে যাচ্ছি জলের ভেতর । আর ভেসে থাকতে পারছি না । আমার ভয়ঙ্কর অবস্থা বুঝতে পেরে কান্না জুড়ে দিল অন্তরা । চিৎকার করে লোক ডাকতে লাগল কিন্তু কাছে পিঠে কোন মানুষজন নেই । মুনিয়াকে পাঠালো বাড়িতে ।

বলল , দাদাকে ডেকে আন । তাড়াতাড়ি যা ।

মুনিয়া ছুটলো পাই পাই করে । এর পর আমার আর কিছু মনে নেই । জ্ঞান যখন ফিরলো দেখি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছি । চারপাশে মাসির বাড়ির লোকজন ।

কে একজন বলল , জ্ঞান ফিরেছে । সবাই এসো ।

সেই যাত্রায় বেঁচে গেলাম অন্তরার তৎপরতায় । সুস্থ  হলে মেসো  নিজে আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেল । সব শুনে মায়ের কি কান্না ।

কাঁদতে কাঁদতে বলল , এই জন্য  গনুকে আমি একা কোথাও ছাড়ি  না । আমি কালকেই  সত্যনারায়নের পুজো দেব । ঠাকুরের আশীর্বাদে আমার ছেলেকে ফিরে  পেয়েছি এই ঢের ।

তাকালাম ব্রজমোহনের দিকে । এক পলকে তাকিয়ে আছে আমার দিকে ।

বলল , অন্তরার কি হল ?

জানি না । আর যাই নি মাসির বাড়ি ।

কোন খোঁজ নিস নি ?

না ।

কেন ?

আমার মায়ের নিষেধ । তার বদ্ধমূল  ধারণা   আমার ওই বিপদের জন্য অন্তরাই দায়ী । মা কোনদিন ক্ষমা করবে না অন্তরা  কে ।

অনেক চেষ্টা করেছি ।

বলেছি , মা , এটা  তোমার সম্পূর্ণ ভুল ধারণা  । আজ আমি যে বেঁচে আছি সেটা সম্পূর্ণ ওর জন্য । ও অসম্ভব ভালো মেয়ে , মা ।

তোমার কাছ থেকে আমাকে শিখতে হবে না কে ভালো আর কে খারাপ । আমার কথা অমান্য করার ফল ভালো হবে না । এইটুকু বলে রাখলাম ।

সেইজন্য সারা জীবন আর বিয়েই করলাম না ।

গাড়ি চালাতে চালাতে খালি অন্তরার মুখটাই ভেসে উঠছে । আমার চালানো দেখে ব্রজমোহন স্টিয়ারিংয়ে এসে বসলো ।

বলল , তোর মনটা আপসেট হয়েছে । চুপ করে পাশে বসে থাক।

শরতের  নীল আকাশ –

অন্তরা তুমি ভালো আছ  তো ?

নীল আকাশের বুকে পেঁজা তুলোর মত সাদা মেঘ    –

অন্তরা ,তোমার স্বামী নিশ্চয়ই তোমাকে খুব ভালোবাসে ?

অবজ্ঞায় পড়ে  থাকা  কাশ  ফুলের গোছা -দোল দিয়ে যায় প্রেমিক বাতাস

তুমি খুব ভালো অন্তরা |

শিউলি ফুল আর কি তুমি কুড়াও ? জীবন কাকা কি এখনো পদ্মফুল তুলে দেয় ?

অন্তরা , আমার কথা কি তোমার মনে পড়ে ? ভালো থেকো । খুব খুব ভালো থেকো ।

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *