Azam Zahirul Islam

অণুগল্প

অভিশাপ

আজম জহিরুল ইসলাম

রাতের শেষ প্রহর। স্থানীয় মসজিদ থেকে ভেসে এলো ফজরের আজান। হাসেম তার স্ত্রীকে নিয়ে গভীর ঘুমে। এ সময় বালিশের নিচে রাখা মোবাইল ফোনটা ক্রিং ক্রিং শব্দে বেজে উঠলো। ফোনটি অন করতেই ইতারে ভেসে এলো একটি নারী কণ্ঠ। অর্চনা নামে জেলা হাসপাতালের এক নার্স নমস্কার জানিয়ে বললেন, আপনি কি হাসেম সাহেব?

ঘুম ঘুম কণ্ঠে হাসেম বললো, কী ব্যাপার, এতো রাতে ফোন! কে আপনি?

: আমি হাসপাতালের একজন নার্স। আপনাদের জন্য একটা দুঃসংবাদ আছে! আপনার বাবা এইমাত্র মারা গেছেন। উনার করোনা পজেটিভ ধরা পড়েছিলো। জলদি উনার লাশ নিয়ে যান।

বাবার মৃত্যুর সংবাদে হাসেম মনোবেদনায় ভেঙে পড়ার কথা! কিন্তু তার চিত্তে সে ধরনের কোনো ভাবান্তর লক্ষ্য করা গেলো না।

নার্স হাসেমকে প্রশ্ন করলেন, কি ব্যাপার কিছু বলছেন না যে?

: দেখুন আমার বাবা একজন। তিনি অনেকদিন আগেই মারা গেছেন।

এই বলে ফোন কেটে দিলো হাসেম। নাম্বার ভুল হয়েছে মনে করে শিউর হওয়ার জন্য আবার চিরকুটে চোখ বুলালেন নার্স। কিন্তু নাম্বার ঠিকই আছে। নার্স বুঝতে পারলেন এর পেছনে কোনো রহস্যময় ঘটনা লুকিয়ে আছে!

বাবার মৃত্যুর সংবাদ প্রথমে ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন এবং পরে পাড়া-প্রতিবেশীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লো। কিন্তু করোনায় মৃত্যুর কারণে আতংকে কেউ এগিয়ে এলো না।

এদিকে বাবা রহিমের জমিজমা নিয়ে ভাইদের মধ্যে শুরু হলো চরম দ্ব›দ্ব! উত্তরপাড়ার বড় জমিটার কে মালিক হবে; তাই নিয়ে ভাইয়ে ভাইয়ে তৈরি হলো সংঘাত। বড় ভাই হাসেমের উপর ছোট দুভাই ঝাপিয়ে পড়লো। কিল-ঘুষি মেরে রক্তাক্ত করলো আপন ভাইকে। পাড়া-প্রতিবেশীরা নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে তাদের মধ্যকার ঝগড়া-ফ্যাসাদ উপভোগ করলো। কিন্তু কেউ কাছে এসে থামানোর চেষ্টা করলো না।

তখন দুপুর বেলা। প্রচণ্ড গরমে মানুষ অতিষ্ঠ। এমন সময় রহিমের লাশ বহনকারী একটি সাদা গাড়ি বাড়ির সামনে এসে থামলো। বাবার লাশ দেখে ছেলেমেয়েরা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেলো অন্যত্র। পাড়া-প্রতিবেশীরাও তাদের পথ অনুসরণ করলো।

দ্রæত লাশ সৎকার করতে হবে। কিন্তু কাদের নিয়ে করবেন? আশেপাশে কোনো লোকজন নেই। করোনা আতংকে সবাই হাওয়া। অগত্যা লাশবাহী গাড়ি থেকে নেমে এলেন একজন পুলিশ। সাদা পোশাকধারী ওই পুলিশের নাম সোমনাথ। তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক। সাথে থাকা দুজন সহকর্মী নিয়ে গাড়ি থেকে লাশ নামালেন তিনি। বাড়ির সামনেই ছিলো পারিবারিক কবরস্থান। সেখানেই তড়িঘড়ি লাশ দাফন করে চলে গেলেন তারা।

রহিমের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন লতিফ। তার বাড়ি পাশের গ্রামেই। বন্ধুর মৃত্যুর সংবাদ শুনে লাঠিতে ভর করে ছুটে এলেন। বন্ধুর কবরের পাশে গিয়ে বিয়োগ-ব্যথায় ডুকরে কাঁদতে লাগলেন। আর ধিক্কার জানালেন বন্ধু রহিমের ছেলেমেয়েদের, যারা জন্মদাতা পিতাকে অবহেলার চোখে দেখেছে। বাবার লাশ মাটিতে রেখেই জমিজমা নিয়ে বিরোধে লিপ্ত হয়েছে। তাদের তিনি অভিশাপ দিলেন। অশ্রæপাত করে বললেন, হে মাওলা, তুমি কোনো পিতার ঔরসে এমন কুসন্তান জন্ম দিও না, যারা পিতার লাশ দেখে নিরাপদ দূরে পালিয়ে থাকে!

************************* সমাপ্ত **************************

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, গৌরীপুর লেখক সংঘ,

উপদেষ্টা সম্পাদক, সাপ্তাহিক রাজগৌরীপুর, ময়মনসিংহ

মোবাইল : ০১৭৫৯-৪৭৬২৫৩।

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top