DIPANKAR BERA

ছিল নেই আছে

দীপঙ্কর বেরা

এ কথা তো ঠিক যে প্রথমে শরীর তারপর অশরীরী। অবিনাশবাবুকে জানি চিনি। তাই অবিনাশবাবু হঠাৎ মধ্যরাতে একলা ঘরে আবছা আলোতে এসে হাজির। বেশ বুঝতে পারি উনি জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে বলছেন – কি রে কত করে না বললুম তবু শুনলি না। করে ফেললি? – দেখুন। করে যখন ফেলেছি আর তো কোন চারা নেই। এবারের মত ছেড়ে দিন। – দিলুম ছেড়ে। ব্যাস, আমি খাট থেকে ধপাস করে পড়লুম। বাড়ির লোক বলল – কি রে খাটে শুতে শিখিস নি। যা মাটিতে শো। হাঁ মুখ করে অবাক চোখে তাকিয়ে আছি। অবিনাশবাবুকে যে শরীরী চেহারায় দেখেছিলুম সেই চেহারা চোখের সামনে ভাসছে। বাড়ির লোক আরও কি সব বলছে। কিন্তু কিছু বলছি না। বললেই সবাই হ্যা হ্যা করে হাসবে। বলবে – শেষ পর্যন্ত তুইও ভুত দেখিস? কিছুতেই বোঝাতে পারব না ভুত আর অশরীরী এক নয়। আর কি করতে না বলেছিল কিন্তু করে ফেলেছি সেও এক গোলকধাঁধা। সেও কত কাজ নিজে করতে ইচ্ছে করে না তাও করে ফেলি। করে ফেলতে হয়। যদি না করি তাহলেও আর এক ঝামেলা। তার চেয়ে করে ফেলে নির্ঝঞ্ঝাট থাকা ভাল। তাই করে ফেলি। এর আগে কতবার রাতের অন্ধকারে জঙ্গলের রাস্তা ডিঙিয়ে ঝোপের ধার দিয়ে এসেছি। কাওকে সাদা কাপড়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি নি। সবাইকে সাহস জুগিয়ে বলি – ভুত টুত সব ফালতু কথা। আসলে অবিনাশবাবুর সঙ্গে একটু বেশি ইণ্টিমেশি। কথা শুনি আলোচনা করি ওঠাবসা দেখাশোনা সব করি। হঠাৎ নাই। মাথার মধ্যে এই নেই ব্যাপারটা কিছুতেই আছে থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। ফলে কত কি যাই নাই তাই বলত তবু বিন্দাস করে ফেলতাম। আবার আলোচনায় আলাপে ভুল ঠিক ইত্যাদির মাপকাঠিতে বলত – এবার শুধরে যা। না হলে ছেড়েই পালাব। সেই ছেড়ে যাওয়া চেনা শরীরের অশরীরী থেকে বেরোতেই পারছি না। যে আছে আমার সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে সেই নাই অশরীরীতে আছে হয়ে যায়। পাশে বসে আছে কথা বলছি শুনছি এ রকম কত কি? নিজের শরীর যে অর্জিত বিজ্ঞতায় চলমান তারই আশেপাশে অশরীরী সঙ্কেত। সাধারণ কাজের মানুষ এসব শুনলে আমাকেই না আবার অশরীরী ভেবে বসে। তাই সংযত হয়ে কথা বলাই শ্রেয়। তাই থেমে যাওয়াই ভাল। আবার থামব ভাবছি তখনই দেখি আরে বাপরে! কি যেন দেখলাম, কে যেন বলল, কে যেন হাত ধরে টানল অথচ কেউ নেই। কেমন যেন ছায়া ছায়া। মুখ নেই মূর্তি নেই। অস্তিত্বই বিনীল। তবু বলাটুকু আছে, থাকাটুকু আছে। না অবিনাশবাবু নয়, বিনয়বাবু নয়, বাবা নয়, মা নয় এমন কি আমিও নয়। কেউ দেখে নি তবু আমি করতে পারছি না কেউ বাধা দিচ্ছে। কে সে? কিছুতেই চিনতে পারছি না। চেনা জানার অনেক ঊর্ধ্বে এক অবলম্বন। ‘এই ছাড়লাম।’ কিন্তু ছাড়তে গিয়েও কে যেন ছাড়ল না। পড়লাম না। বাঁচিয়ে দিল। রাস্তায় পেছন থেকে গাড়ি আসার এক মুহূর্তক্ষণে কে যেন ঠেলে নিরাপদ করে দিল। একেবারে খাদের কিনারে যেন একটা শক্তপোক্ত দেওয়াল। অচেনা এক শরীর বিহীন অশরীরী। দ্বন্দ্বের আকারে এক বুক আকাশ পাতাল আকাশ কুসুম। ভাবনার বাইরে ভাবনার ভেতরের এক নিশ্চিত কক্ষ। ছুটতে ছুটতে বাইরে দাঁড়িয়ে এত স্পষ্ট ভেতরের অবলম্বনে সে দাঁড়িয়ে। কিন্তু কে? কেউ না। না। ওই তো সে।আমি বা তুমি নয়। সে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top