Dr. Taimur Khan

রোমান্টিক কল্পনাছায়ার ভেতর আত্মস্ফুরণের ঘোর

🍁

তৈমুর খান

🍁

ফরাসি দার্শনিক ও লেখক জাঁ-পল সার্ত্র বলেছেন:

“For a consciousness to be capable of imagining…it needs to be free.”

(Jean-Paul Sartre,The Imaginary: A Phenomenological Psychology of the Imagination)

অর্থাৎ একটি চেতনা কল্পনা করতে সক্ষম হওয়ার জন্য…এটি মুক্ত হতে হবে। এই মুক্ত হওয়ার মধ্যেই কাব্য রচনার বীজ লুকিয়ে থাকে। বাস্তবকে অধিবাস্তবের আলোয় বিচার করার ক্ষমতা একমাত্র কবিরই থাকে। সম্প্রতি হাতে এসেছে নুসরাত নাজনিনের ‘ছন্দভাঙা গান'(বইমেলা ২০২৩) কাব্যখানি। এই মুক্তির সোপানটিই এই কাব্যে উপলব্ধ হলো।

নুসরাত নাজনীন খুব বেশিদিন ধরে কাব্য-কবিতায় বিচরণ করেননি। মূলত এটিই তাঁর দ্বিতীয় কাব্য। উদ্ভিদ বিদ্যা নিয়ে সর্বোচ্চ ডিগ্রি লাভ করেও কাব্যজগতে মানবরসায়নের খোঁজ করেছেন আর একান্ত নিজস্ব উপলব্ধির জগৎকে মুক্তি দিতে চেয়েছেন। চিরাচরিত ছন্দপ্রকরণের শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ না করেও নিজের মতো করে নিজস্ব ভাষায় লিখতে চেয়েছেন কবিতা। স্বাভাবিকভাবেই ছন্দের পর্বভেঙে ক্ষুদ্রপর্ব বা উপপর্বে সঞ্চারিত করেছেন তাঁর কাল্পনিক মুহূর্তগুলিকে। তাই কখনো একটি শব্দে দুমাত্রার পর্ব, কখনো দুটি শব্দে চার মাত্রার পর্ব, কখনো তিনটি শব্দে ছয় মাত্রার পর্ব নির্মিতি পেয়েছে। পর্বের এই সঞ্চরণ যেমন গতিময়তাকে অনুধাবন করেছে, তেমনি বিষয়কে উল্লঙ্ঘন করে মুক্তির প্রান্তর খুঁজেছে। যেমন:

“হায়!

তবু,

প্রভু মোর

ভক্তি-ভয়ে ত্রস্ত!

দেবালয়ের ক্রন্দনে

চেয়ে রই

তোমা-পানে

সুদূর ওই বাতায়নে…”

আরেকটি কবিতায় লিখেছেন:

“তবু

জাগো,

দ্যাখো

আঁধারের বিলাস ধুয়ে যায়

বোধনের ধ্বনিতে,

আর নিঃশব্দে

খুলে যায়

অন্তহীন আরেক পথ…”

ক্রিয়া আর অব্যয়, অনুজ্ঞা আর নির্দেশক বাক্য নিয়েই শব্দের রেখা টেনে গেছেন কবি। আর তাতেই অন্তহীন পথের দৃশ্য তৈরি হয়ে গেছে। সুদূর বাতায়নে আত্মোৎসর্গের অবিন্যস্ত আলাপী অনুক্ষণই কবির শূন্য হৃদয়কে পূর্ণতার পরশ এনে দিয়েছে। কবিতাগুলি পড়তে পড়তে মনে হয়েছে এক সূর্যকণিকার মুহূর্তগুলি সুরের লহরির উচ্ছ্বাসে ভেজা মন নিয়ে লাজুকলতার মতো কম্পন তুলতে চেয়েছে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পংক্তিগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তরঙ্গের মতো মন আর আবেগ, হৃদয় আর অনুভূতিকে ভাসিয়ে দিয়েছে। কাব্যনির্মিতির গাম্ভীর্য বা গরিমা কোনোটিই কবি অনুসরণ করেননি। শুধু নির্ভার শব্দের ধ্বনিসঞ্চারে তাঁর অর্ঘ্যকুসুম নিবেদন করেছেন। কোথাও গোপন আলোকসত্তায় রুপোলি আগুন লুকিয়ে রেখেছেন, কিন্তু তাকেও মুক্তি দিতে চান মুক্তির গানে গানে। তাই তাঁর নিজ সত্তার দ্বৈত রূপকে জাগাতে চেয়ে লিখেছেন:

“মুক্ত গগনে

জাগাও চিত্ত

মুগ্ধ নয়নে

বিহঙ্গ অনিরুদ্ধ।”

এই সত্তাকেই ‘বাঁশিওয়ালা’ বলে গহন সুরে বিকশিত হতে বলেছেন। রবীন্দ্রনাথের ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ যেমন সূর্য আর সুরের প্রবল ঝঙ্কারে জেগে উঠেছিল, ঠিক তেমনি এই কবির মধ্যেও ‘হিয়ার অনল জ্বলে’ উঠেছে বিশ্ববীণার রাগিনী হয়ে। অনুভূতিগুলি রহস্যময় হয়ে লুকোচুরি খেলেছে। কখনো মুখরতায়, কখনো নীরবতায় প্রশ্রয় পেয়েছে। আত্মখননের মানবজমিনে সোনা ফলাতে চেয়েছেন। সৃষ্টির মাধুর্য শব্দের ঠোঁটে আবেগ দীপ্ত শক্তি সঞ্চয় করেছে। তাই কবি ‘অদৃশ্য যাত্রী’ হয়ে উপলব্ধি করেছেন:

“হিয়া কাঁপে, বারংবার হিয়া কাঁপে—

শূন্যতার ভাঙন দেখেছি যে বাঁকে বাঁকে।”

শূন্যতার ভাঙন আবেগচারণায় অন্তর্কথনের রূপ পেয়েছে।

রোমান্টিক এই কল্পনাছায়ার ভেতর আত্মস্ফুরণের ঘোর কেটে কবি বেরিয়ে আসতে চেয়েছেন অনন্তলোকের দিকে। সেখানে রবীন্দ্রনাথের আবহাওয়াটিও এক মগ্নতা এনে দিয়েছে। তাই রাবীন্দ্রিক শব্দের প্রচ্ছন্নতায় কবির আত্মিক প্রবাহ ঘনীভূত হয়ে উঠেছে। রাবীন্দ্রিক কাব্যে ব্যবহৃত তৎসম শব্দের স্বরভক্তি বিন্যাসকেও গ্রহণ করেছেন। কখনো হরষে-পরশে-রতন-যতন যেমন ব্যবহৃত হয়েছে, তেমনি নিত্য-নব-নব, বিহঙ্গ, মম, মোর, উদ্বেলিয়া, সহিবার, তোমা, সন্ধ্যারতি, কেমনে, দেবালয়, উচ্ছ্বাসি, দোঁহে প্রভৃতি শব্দগুলিও ব্যবহার করেছেন। সাম্প্রতিককালের কবিতার ক্ষেত্রে এই শব্দগুলি আর কোনো কবিই ব্যবহার করেন না। তাই অনেকের কাছেই মনে হবে কবি রবীন্দ্র যুগকেই তাঁর বিচরণ ক্ষেত্র করে নিয়েছেন।

🐦

ছন্দভাঙার গান : নুসরাত নাজনীন, ভ্রমণপিপাসু প্রকাশনী, ডি এল-১০/১,সেক্টর-২,সল্টলেক, কলকাতা-৭০০০৯১, প্রচ্ছদ সুব্রত ঘোষ, মূল্য ১৫০ টাকা।

বই রিভিউ

Leave a Reply