Joy Narayan Sarkar

অলৌকিক // জয়নারায়ণ সরকার

 

সকাল থেকেই টিপটিপ বৃষ্টি পড়েই চলেছে। বিছানায় চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকে সন্দীপ। আজ আর বিছানা ছাড়তে ইচ্ছে করছে না। আজ যে শনিবার। কলেজ ছুটি। কতক্ষণ এভাবে শুয়েছিল জানে না সন্দীপ। কিন্তু বেশিক্ষণ আর শুয়ে থাকতে পারেনি। চাদর টেনে তুলে দিয়েছিল ভাস্কর। এই হোস্টেলে ওই তো রুমমেট সন্দীপের। প্রায় প্রতিদিন দুই বন্ধু রাত জেগে পড়াশোনা করে। ঘরের দু’পাশে দু’টি চৌকি পাতা। তবে জানলার দিকে যে চৌকি তাতে শোয় ভাস্কর। যদিও প্রথম দিন ভাস্কর বলেছিল, জানলার ধারেরটা তুমি নিও।

সন্দীপ তৎক্ষণাৎ বাতিল করেছিল ওর প্রস্তাব। গভীর রাতে কোনও শব্দ হলে ভাস্করের নাম ধরে চিৎকার করে সন্দীপ।

ভাস্কর হেসে বলে, আরে ইঁদুর বা ছুঁচো হবে। অত ভয় পাওয়ার কি আছে।

হোস্টেলের বাড়িটা বহু দিনের পুরোনো। ঠিকমতো দেখভাল হয় না, দেওয়াল আর ছাদের পলেস্তরা খসে গিয়ে ভেতরের রডগুলো হাঁ হয়ে বেরিয়ে আছে। সিঁড়িগুলো কাঠের। ওঠানামা করলে শব্দ হয়। প্রথম প্রথম কয়েকদিন রাতে শব্দ কানে এলেই সন্দীপের মনে হত সিঁড়ি দিয়ে কেউ ওঠানামা করছে।

হোস্টেলের ম্যানেজার অবনীবাবুকে এ নিয়ে প্রশ্ন করলে বড় বড় দাঁত বের করে হাসেন। তার ওরকম হাসি দেখে রাজীবের মনে আরও ভয়ের উদ্রেক হয়। তবে অবনীবাবু করিৎকর্মা লোক। কখনও কোনও কিছুর দরকার পড়লে ওনাকে পরিত্রাতার ভূমিকায় দেখা মেলে। আবার বেশ কড়া ধাতের লোকও বটে।। রাত দশটা বাজলেই সদর দরজায় পেল্লাই একটা তালা ঝুলিয়ে দেন। সে কারণে আবাসিকরা সময় মতো ফিরে আসে।

সকাল হতেই ভাস্কর এককাপ চা আর দুটো থিন অ্যারারুট বিস্কুট ধরে দাঁড়িয়ে থাকে ওর বিছানার পাশে। সন্দীপ চোখ কচলে বলে, ওরে বাবা, এ তো মেঘ না চাইতেই জল! বলেই ফিক করে হাসে।

চায়ের প্লেটটা ওর হাতে দিয়ে বিছানার একপাশে এসে বসে ভাস্কর। ওকে ওভাবে বসতে দেখে সন্দীপ বলে, কিছু বলবি?

ভাস্কর কিছু বলতে যাবে, এরমধ্যে অচিন্ত্য হুড়মুড় করে এসে ঘরে ঢোকে। ওকে ওভাবে ঢুকতে দেখে ঘাবড়ে যায় ওরা দুজন।

ঘরে ঢুকে উল্টোদিকের বিছানায় ধপাস করে বসে অচিন্ত্য বলে, দু’দিন কলেজ ছুটি। চল না, একটা জায়গা থেকে ঘুরে আসি।

খানিকটা অবাক হয়ে ভাস্কর বলে, এখন যা বৃষ্টি হচ্ছে তাতে কোথায় যাবি?

অচিন্ত্য জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে বলে, তালডিহি। ওখানে পিসির বাড়ি। এই বর্ষায় দারুণ লাগবে ঘুরতে।

সন্দীপ ফস করে বলে, তালডিহি যেতে তো অনেক সময় লাগবে!

অচিন্ত্য উৎসাহ নিয়ে বলে, তা লাগুক। চল এখনই রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়ি। তার আগে পিসতুতো দাদা ভোম্বলদাকে ফোন করে বলে দিচ্ছি।

ওর কথায় সম্মতি জানায় ভাস্কর।

চটপট তৈরি হয়ে নেয় ওরা। বেরোবার আগে ভূপেনবাবুকে বলে যায়, পরশু বিকেলে ফিরবে। রাতের খাবারের ব্যবস্থা করে রাখতে।

***

ট্রেনটা এসে প্ল্যাটফর্মে থামতেই সামনে যে কামরাটা পড়েছে তাতেই ওরা তিনজন উঠে পড়ে। ভাস্কর অবাক হয়ে দ্যাখে সারা কামরায় ওদের নিয়ে পাঁচজন। অচিন্ত্য জানলার ধারের সিটটায় গিয়ে বসে। রাজীব ওর উল্টোদিকের সিটে। সন্দীপ ধীর পায়ে গিয়ে বসে সন্দীপের পাশে।

তালডিহি স্টেশন আসতেই অচিন্ত্য হুড়মুড় করে সিট থেকে উঠে নেমে যায়। রাজীব আর সন্দীপ প্রথমে ভ্যাবাচ্যাখা খেলেও ওর পেছন পেছন নেমে পড়ে।

প্ল্যাটফর্ম একেবারে শুনশান। শুধুমাত্র কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ভোম্বলদা। অচিন্ত্য তাকে দেখে দ্রুত তার কাছে যায়। এবারও ওরা দুজন অচিন্ত্যকে অনুসরণ করে।

ভোম্বলদা প্রায় সমবয়সী। ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠতে বেশি সময় লাগল না।

শুনশান স্টেশনের বাইরে এসে দূরে দাঁড়ানো ভ্যানরিকশার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় সন্দীপ। চোখের পলক না ফেলে লোকটা তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। একটা ঢোক গিলে সন্দীপ বলে, কাঁঠালতলা যাবে?

মুখে কোনও পরিবর্তন লক্ষ্য করেনা।

ওরা চারজন উঠে বসে ভ্যান রিকশায়। কালো পিচের রাস্তা শেষ করে মাটির রাস্তা ধরে। টিপটিপ বৃষ্টি হওয়াতে রাস্তাটাও পিচ্ছিল।

রাস্তার দু’ধারে সবুজ ধান খেত। কিছুটা যেতেই কতগুলো বাড়ি। হঠাৎ সন্দীপের খেয়াল হয়, এতটা রাস্তায় একটা মানুষেরও দেখা পাওয়া যায়নি।

রাস্তার ঢালু অংশেরওপরে রেলব্রিজ। গ্রামের একেবারে পশ্চিমপ্রান্তে অচিন্ত্যর পিসির বাড়ি।

ভ্যানরিকশা থেকে বাড়িটা দেখে সন্দীপ মনে মনে হিসেব কষে ফেলে। অন্তত একশো বছরের পুরোনো তো হবেই। বাড়িতে ঢোকার মুখের তোরণ দুটো এককালের আভিজাত্য প্রমাণ করছে। সন্দীপের মনে একের পর এক প্রশ্ন উঁকি দিতে থাকে।

হঠাৎ সম্বিৎ ফেরে ভাস্করের ডাকে, অ্যাই সন্দীপ। ভ্যান থেকে নেমে পড়।

দোতলা বাড়ির দেওয়ালগুলো বেশ চওড়া। জানালাগুলো মেঝের একটু ওপর থেকে প্রায় সিলিং অবধি। হাট করে খোলা জানালা দিয়ে হু হু করে হাওয়া আসছে। পিসিকে দেখামাত্র ওরা প্রণাম করে।

পিসি বলে, তোমরা হাত-মুখ ধুয়ে এসো। খাবার দিচ্ছি।

ওরা ব্যাগগুলো বিছানার পাশে রেখে চলে যায় বাইরে। বাড়ির পেছনে যেতেই দ্যাখে উঠোনের মাঝখানে একটা কুয়ো।

দড়ি দিয়ে বাঁধা বালতিটা নিমেষে কুয়োর মধ্যে ফেলে এক বালতি জল তুলে আনে ভোম্বলদা। ওরা হাত-মুখ ধুয়ে ঘরের মেঝেতে পাতা আসনে এসে বসে। পিসিমাওদের খাবার দিতে থাকে। কী নেই সেই তালিকায়। শাক থেকে শুরু করে কোর্মা, পোলাও। শেষ পাতে পায়েস। চেটেপুটে খায় ওরা। অনেকদিন পর ভাল-মন্দ খাওয়া গেল। মনে মনে অচিন্ত্যকে ধন্যবাদ দেয় সন্দীপ। খাওয়াদাওয়া শেষ হতেই পিসিমা বলেন, তোরা দক্ষিণদিকের ঘরের বিছানায় একটু গড়িয়ে নে।

একথা শুনে ভোম্বলদা বলে, ইস। একদিনের জন্য এসে কেউ ঘুমোয় নাকি? চল,আমরা ঘুরে আসি।

অচিন্ত্য হইহই করে সায় দেয়, ঠিক বলেছো ভোম্বলদা। ছোটবেলায় এসে আমরা ভাইবোনেরা কেউ ঘরে বসে থাকতাম না। বেরিয়ে পড়তাম।

হঠাৎ সন্দীপের কাঁধে চাপড় মেরে ভোম্বলদা বলে, নে নে, আর দেরি করিস না।

ভোম্বলদার চাপড়ে সন্দীপ চমকে ওঠে। লিকলিকে চেহারার মানুষটার হাতে এত জোর! পিঠে যেন কয়েক কিলো ওজনের কিছু পড়ল। সে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আমতা আমতা করে সায় দেয় ভাস্কর।

***

অনেকটা পথ হেঁটে এসে হাজির হয় রেলব্রিজের তলায়। বৃষ্টি হওয়ায় গরম ভাবটা একেবারে নেই বললেই চলে। বেশ লাগছে সন্দীপের‌। ভোম্বলদা আর অচিন্ত্য অনেকটা এগিয়ে গেছে। সন্দীপ আর ভাস্কর প্রায় ছুটে গিয়ে ওদের ধরে ফেলে। বুকটা অনবরত ওঠানামা করছে।

ওই অবস্থা দেখে ভোম্বলদা বলে, তোদের শহুরে ছেলেদের ওই এক সমস্যা। একটুতেই দম বন্ধ হয়ে যায়। আয়, এদিকে আয়। রেললাইনের ধারে গিয়ে বসবো। একটু জিরিয়ে নিবি।

সন্দীপ খেয়াল করেছে রেলব্রিজটা অনেক দিন পরিচর্যা না হওয়ায় কেমন নড়বড়ে দেখতে লাগছে। তবে রেলব্রিজের গা-ঘেঁষে পায়ে হাঁটা চড়াই রাস্তা গিয়ে মিলেছে রেললাইনে। ভোম্বলদা ওই চড়াই বেয়ে একেবারে রেললাইনের মাঝে পৌঁছে গেছে। ওরা তিনজন পিছু পিছু গিয়ে পৌঁছয়।

ভোম্বলদা বলে, রাতে কেউ এই এলাকায় আসে না। সন্ধে থেকেই তেনাদের উপদ্রব শুরু হয়।

কথাটা শুনে সন্দীপের গলাটা শুকিয়ে আসে। সে দম চেপে বলে, সন্ধে নেমে আসতে আর তো বেশিক্ষণ সময় নেই ভোম্বলদা!

ভোম্বলদা হেসে বলে, আমি থাকতে তোদের ভয় কি!

হঠাৎ দ্যাখে সাদা কাপড়ে ঘোমটা দিয়ে অচিন্ত্যর পিসি রেললাইন ধরে এগিয়ে আসছে ওদের দিকে।

ভোম্বলদা এবার চিৎকার করে বলে, এদিকে আসবি না। অন্যদিকে চলে যা।

অবাক হয় সন্দীপ। ভোম্বলদা পিসিকে তুই-তুকারি করছে দেখে। পিসি তবুও এগিয়ে আসছে ওদের দিকে।

ভোম্বলদা এবার বাজখাঁই গলায় চিৎকার করে বলে, সোজা চলে যাবি। এদিকে আসার চেষ্টা করবি না।

ভোম্বলদার চোখ থেকে আগুনের গোলা ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। তার হাতগুলো যেন অস্বাভাবিক লম্বা দেখাচ্ছে।

সন্দীপ পাশে বসা ভাস্করকে জাপটে ধরে। ঠকঠক করে কাঁপতে থাকে। সারা শরীর বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ে মাটি ভিজিয়ে দিচ্ছে। ধীরে ধীরে অন্ধকার গিলে নিচ্ছে চারিদিক।

আর দেরি করে না প্রাণপনে দৌড়ে রেলব্রিজের মাথা থেকে একেবারে পিসিমার বাড়ির সামনে এসে থামে সন্দীপ। কিন্তু সেখানে তো কোনও বাড়ি নেই। নেই সেই তোরণও। সন্দীপ ভয়ার্ত গলায় বলে, কোথায় এলাম আমরা?

ভাস্কর তড়িঘড়ি বলে, আর দাঁড়াস না। বলেই প্রচণ্ড গতিতে দৌড়ে চোখের আড়ালে চলে যায়। অন্ধকার ততক্ষণে জাঁকিয়ে বসেছে। অচিন্ত্যকেও দেখতে পাচ্ছে না সন্দীপ। দৌড়ে কিছুটা গেলেও কোথাও কোনও বাড়ি, কুয়ো কিছুই চোখে পড়ছে না। ঘামে জামা ভিজে গেছে। সে শরীরের সব শক্তি দিয়ে দৌড়তে চেষ্টা করলেও, পারছে না দৌড়তে। সারা শরীর ভিজে যাচ্ছে ঘামে।

***

খাটটা ঠকঠক করে কাঁপতে থাকায় ভাস্কর তাকিয়ে দ্যাখে, সন্দীপ বিড়বিড় করে হাত-পা ছুঁড়ছে। ভাস্কর ছুটে এসে সন্দীপকে ঠেলা দিতে থাকে। তবুও সে আরও জোরে হাত-পা ছুঁড়তে থাকে। ভাস্কর দৌড়ে গিয়ে অবনীবাবুকে ডেকে নিয়ে আসে। অবনীবাবু এসেই সন্দীপের গালে কষে চড় মারেন। সম্বিৎ ফিরে পেয়ে উঠে বসে সন্দীপ। রাজীব এক গ্লাস জল এগিয়ে দেয়। ঠিক তখনই হুড়মুড় করে ঘরে ঢোকে অচিন্ত্য।

কাঁপা কাঁপা হাতে জলের গ্লাসটা নিয়ে এক চুমুকে শেষ করে সন্দীপ। তারপর বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে দ্যাখে ওকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে রাজীব, অচিন্ত্য ও অবনীবাবু।

রাজীব কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই অচিন্ত্য বলে, দু-দিন তো কলেজ ছুটি, চল না ঘুরে আসি…

# শেষ #

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top