তন্ত্র মায়া – পর্ব-১ – কথা চ্যাটার্জ্জী

সে এক দুর্গম জায়গা, রায়দিঘি থেকে প্রায় ৪৫ কিমি ভিতরে,নদীর ধারে। এই গ্রামের লোকেদের, মাছ ধরাই প্রধান জীবিকা। সেই স্থানে, সাস্থসাথীর একটি ক্যাম্প আয়োজন করা হয়,এবং আমি সেই ক্যাম্পের অন্যতম উদ্যোক্তা হিসাবে যোগ দিতে যাচ্ছি। ট্রেন মথুরাপুর স্টেশনে এসে থামলো। ট্রেন থেকে নেমে অটো ধরে, বৈদ্যপাড়া বাসস্ট্যান্ড;সেখান থেকে বাস ধরে ফেরিঘাট। সেখান থেকে নৌকায় বা স্টীমার এ করে, আমার গন্তব্যস্থল। ফেরিঘাটে এসে ডাক দিলাম—-“ও! ভাই ওপারে যাবে? কত ভাড়া?”

মাঝি বড়ই চুপচাপ গম্ভীর ভাবে মাথায় জড়ানো গামছা টা আর একটু টেনে নিয়ে,নৌকার ভেতরের থাকা পাটাতন টা ঘাটের গা থেকে নদীতে এমন ভাবে রাখলো যাতে সোজাসুজি নৌকায় উঠতে অসুবিধা না হয়।

আমি দেখলাম প্রায় বেলা গড়িয়ে এসেছে, ২:৩০ বাজবে; তাই কথা না বাড়িয়ে নৌকায় উঠে পড়লাম। ফুরফুরে হাওয়া বইছে,গ্রীষ্মকাল বেশ ভালোই লাগছে। নদীতে ভরা জোয়ার বেশ চলছে নৌকাটা। সারাদিন ট্রেন-বাসের ঝাকুনিতে বড়ই ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। নৌকার দুলুনিতে ঘুম এসে গেলো। হঠাৎ ঘুমের মধ্যেই বুঝতে পারলাম কিছু ভিজে ভিজে জিনিস গায়ে ঠেকছে। চাইছি চোখ খুলতে কিন্তু পারছি না। হঠাৎ খুব জোর আওয়াজে,ধড়ফড় করে উঠে বসলাম। চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। তবে দূর হতে একটা আলো এসে পড়েছে,খুব ক্ষীণ।
জানি না কটা বাজে….
একটু বাদে সেই মাঝি এসে আমায় বললো-“কর্তা মা ডাকছে,যেতি হবে। চলেন”

আমি খানিক ভয় পেয়ে গিয়ে বললুম-“কে? কে কর্তা মা,আর সে ডাকলে যেতেই বা হবে কেন?”

মাঝি বললো-অত সত জানি না বাপু মা ডাকটিছে যেতি হবে ব্যাস।”———-এই বলে ওই ফিঙ্গার মতো চেহারার মাঝি টা আমায় মাটি দিয়ে টানতে টানতে নিয়ে গেল সেই স্থানে,যেখানে আলোর উৎসস্থল।

হঠাৎ! অন্ধকার থেকে, আলোয় আসায় প্রথমটায় কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছিলাম না। পরে যখন সবটা পরিষ্কার হলো দেখি চারিদিকে নরকঙ্কালের মুন্ড, কোনটাতে
রক্তের দাগ জমে কালো হয়ে গেছে। যেদিকে তাকাই শুধু নরকঙ্কাল….কি বীভৎস যেন কেউ রক্তের খেলায় মেতেছে। তারই মধ্যে এক স্থানে এক বিশাল হোমকুন্ড, যার মধ্যে লাল আগুনের শিখা অগ্নিদানবের মতো গুহার চারিপাশ টাকে উত্তপ্ত করে রেখেছে। হোমকুন্ডুর ওপাশে এক উপুড় করে রাখা শবদেহ। তার উপরে যিনি বসে আছেন তিনি আরো ভয়ঙ্কর…..

গলায় কঙ্কালেরমুন্ডমালা অথচ গলার উপরের মাথাই নেই তার। সেই কাটা গলার থেকে অবিরত রক্তের স্রোত সেই মহিলার বাম হাতে থাকা উল্টানো মুন্ডর হাঁ করে থাকা মুখে গিয়ে পড়ছে। এই দৃশ্য দেখে আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেছি। ভয় শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল।
‌হঠাৎ! সেই মহিলা যে কি না শবাসনে বসে ছিলেন ওই অবস্থায় আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগলেন, আমার শরীর শিথিল হয়ে পড়েছিল, উঠে পালানোর মতো ক্ষমতা ছিল না। কোথা থেকে একটা কাক কর্কশ ভাবে বারবার ডাকছিল, মা বলে, কাক নাকি মৃত্যুর খবর বয়ে আনে। কিন্তু এইমুহূর্তে আমার মনে হচ্ছিল যে সেই কাকটা আমাকে বিদ্রুপ করছে।

‌মহিলা তার ডান হাত দিয়ে আমার চুলের মুঠি ধরে টেনে তুললো, এবং তার হাতের মুন্ডটি বলে উঠলো, আজ আমার সাধনা সিদ্ধি পাবে;শ্রীধর…. ১০১ তম মানুষ বলি দিয়ে, আমার সাধনায় সিদ্ধি প্রাপ্তি হবে। এবং অট্টহাসি হাসতে লাগলো। সেই হাসি অত্যন্ত ভয়ানক। যেন সারা গুহাটা কেঁপে উঠছিল সেই শব্দে। সঙ্গের মাঝিটি আমার হাত চেপে ধরলো,শক্ত করে আর সেই মহিলা-তান্ত্রিক,আমার শিরোশ্ছেদ করবে বলে খাঁড়াটা তুলে নিলো। আমি ভাবলাম যে করেই হোক এই স্থান থেকে বেরোতেই হবে। কিছুতেই এই ভূতের হাতে মরতে আমি পারবো না।

‌আমি মনে সাহস এনে বললাম-” হুঁ, তুই তো সামান্য তান্ত্রিক,তোর মতো কত দেখেছি? তুই তো জানিস না আমার গুরু কে? সে এই দুনিয়ার সব চাইতে শক্তিশালী তান্ত্রিক চাইলে,
‌এখনই মেরে ফেলবে তোকে।”

‌আবার সেই অট্টহাসি, হেসে বললো-“তোর গুরু আমায় মারবে? এতই সোজা? হুঁ: তুই তো জানিস না আমায় একমাত্র এই যজ্ঞের আগুনে
ফেলে দিলেই তবে আমার মৃত্যু সম্ভব।”

এই কথা বলে, যখনই আমায় মারতে গেলো, সঙ্গে সঙ্গে আমি ওকে এক ধাক্কায় ওর যজ্ঞের আগুনে ফেলে দিলাম।
আর প্রানপনে দৌড়াতে লাগলাম। একসময় দৌড়াতে দৌড়াতে মাটিতে লুটিয়ে পড়লাম।
যখন জ্ঞান এলো, তখন সকাল হয়েছে আমার ক্যাম্পের বাকি লোকেরা আমার আসায় দেরি হচ্ছে দেখে খুঁজতে বেরিয়েছিল, এবং তারাই আমায় নদীর ধার থেকে উদ্ধার করে, হাসপাতালে নিয়ে যায়। তারপর….এখন একটা নিজস্য গাড়ি কিনেছি সেটা করেই কাছে পিঠের ক্যাম্পে যাই। বেশি দূরে যেতে চাইনা। কেউ কারণ জানতে চাইলে, বলি-“থাক সে গল্প নয় আর এক দিন হবে চা খেতে খেতে।”

Leave a Comment

Your email address will not be published.