maitrayee sinharay

রোজনামচায়
কবি বেঁচে থাক
মৈত্রেয়ী সিংহরায়
25.09.2021

      বেশ কিছুদিন ধরেই ডিপ্রেশনে ভুগছে অনন‍্য। সবসময় ওয়ার্ক ফ্রম হোমের নামে
ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে থাকে। বাইরে
সকলের সামনে খুব একটা আসে না। দক্ষিণের একফালি জানলা দিয়ে বাইরের
সঙ্গে তার যোগ। অনেক ডাক্তার দেখানো
হয়েছে। কিছুতেই কিছু হয় না। অনন‍্যর মা বলেন “ডাক্তারে যা বলে বলুক। তুমিই একমাত্র আমার ছেলেকে সারিয়ে তুলতে
পারো অনিন্দিতা। তুমি ওকে ভালোবাসা
দাও, খুব ভালোবাসা, আরও আরও অনেক
ভালোবাসা। ওই ভালোবাসার টান ও কিছুতেই এড়াতে পারবে না।”
অনিন্দিতা কিছুতেই বুঝতে পারে না
কেন অনন‍্য এরকম করছে! মাস্টার্স করার
সময় ওর সঙ্গে পরিচয়। এখনো মনে পড়ে
কখনো ইউনিভার্সিটির গাছগাছালি ভরা
রাস্তায় আবার  কখনো বা লাল ফুলে ভরা শিমুল গাছের তলায় অনন‍্যর গলায় জীবনানন্দ আর ওর কন্ঠে রবীন্দ্রনাথ। তারপর দুজনেরই জীবন বাঁক নিয়েছে কত
বিচিত্রদিকে। ধীরে ধীরে জীবনানন্দের হাত
ছেড়ে অনন‍্য এখন এক মাল্টিন‍্যাশনাল
কোম্পানর চিফ এক্সিকিউটিভ। অনিন্দিতা
এখনো ডুবে আছে রবীন্দ্র-সাগরে। ভাবতে
ভাবতেই রকিং চেয়ারের হাতলে  দোল খেতে খেতে কখন যেন সূর্যটা ঝপ করে ঐ দূর আকাশের ওপারে!!
অনিন্দিতা তাড়াতাড়ি  উঠে এসে অনন‍্যর ঘরে ঢোকে। অন্ধকার। ঐ অন্ধকার
পেরিয়ে ধীরে ধীরে অনন‍্যর কপালে হাত রাখে–“কেন এমন করছ অনন্য?” হঠাৎই অনন‍্য চিৎকার করে অনিন্দিতার হাত থেকে
গীতবিতান ছুঁড়ে ফেলে দেয়। বলে ” আমি জানি তুমি আমাকে ভালোবাসো না শুধু
রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসো।” অনিন্দিতার
সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠল। তার দেবতা মেঝেয় লুটোচ্ছে। সত‍্যিই তো এই পাঠভবানী সেই  কোন ছোটোবেলায় রবীন্দ্রনাথকে তার  মন প্রাণ দিয়ে বসে আছে! তা বলে অনন‍্যর সঙ্গে তাঁর প্রতিযোগিতা!! অন‍্য সময় হলে…….নিজেকে সামলে বলে -“এই ব‍্যাপার! তোমার জন‍্য যে আমি মরতেও পারি অরণ‍্য। চলো ছাদে যাই, চাঁদ দেখে আসি। দেখবে চাঁদের প্রতিবিম্ব পানাপুকুরময়।”
এক ছাদ জ‍্যোস্নায় অনন‍্যের হাতের
ওপর অনিন্দিতার হাত।  অনিন্দিতা বলে “আমার খুব ইচ্ছে ওই চাঁদটাকে একবার জড়িয়ে ধরি। তা কি সম্ভব অনন‍্য! শুধু  দূর  থেকে অনুভব করা ছাড়া। রবীন্দ্রনাথ আমার রক্তে, অশ্রুতে। উনি ওই চাঁদটার মতো আমার-তোমার জীবনে আলো ছড়ান…..ওঁকে ছাড়া আমার  জীবন অসম্পূর্ণ, যেমন তোমাকে ছাড়াও আমি এক মুহূর্ত বাঁচবো না….এই কথাটা তুমি  আমাকে আগে বলনি কেন? একবার শোনাবে প্লিজ তোমার প্রিয় জীবনানন্দ—–
আমাদের দেখা হোক সুস্থ শহরে….'”
হঠাৎই অনন‍্য অনিন্দিতাকে জড়িয়ে ধরে।  বলে –“তুমি প্রথম —-চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে ……”
ওদের রোজনামচায় বেঁচে থাক
দু’এক টুকরো জীবনানন্দ
দু’এক কলি রবীন্দ্রনাথ।💖

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *