Prokash Chandra Roy

ভূতুড়ে টোকা (অণুগল্প)

প্রকাশ চন্দ্র রায়

এলাকায় সাহসী বলে বেশ সুনাম ছিল আমার।
সে সুনামটা ক্ষুন্ন হয়ে গেল সেদিন-যেদিন ভূতের ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সাইকেল থেকে উল্টে পড়লাম রাস্তা থেকে একদম নিচের নিচু জমিতে। সময়টা শীতকাল, বাসা থেকে মাইল তিনেক দূরে পারের-হাট নামক এক বাজারে আমার জুনিয়র এক ডাক্তারের চেম্বারে রোগী দেখতে যাই প্রতিদিন বিকালে আর ফিরে আসি রাত দশটার পরে। মাইল তিনেক রাস্তা ইট বিছানো হেরিংবন্ডের হলেও দুইমাথার দিকে মাইলখানেক করে প্রায় মসৃণ বা সমতল,কিন্তু মাঝখানটায় মাইলখানেক রাস্তা প্রায় চলার অযোগ্য,ভাঙ্গাচোরা, খানা-খন্দকে ভর্তি; আর ঠিক ঐ রাস্তাটুকুর দুইধারেই নাকি কথিত জ্বীন-পরী আর ভূত-পেত্নীদের বাস। একধারে বিরাট গোরস্থান,জঙ্গলাকীর্ণ অবস্থান সংলগ্ন ঘন বাঁশঝাড়, অন্যধারে হিন্দুদের মরা পোড়ানোর ঘাট-খাঁ খাঁ মহাশ্মশান। রাতে তো দূরের কথা,দিন-দুপুরেও সখ করে কেউ ও পথে পা বাড়ায় না। নিতান্ত গরজে পড়ে রাতে যেতে হলে অবশ্যই সঙ্গী-সাথীসহ হাতে আলো নিয়ে তবেই ও পথে যাতায়াত করে লোকজন। ভাগ্যের কি পরিহাস! পেটের ধান্ধা মেটাতে প্রায় প্রত্যহই ঐ পথে যাতায়াত করতে হয় আমাকে,তাও আবার একাই.বিকালে আর রাতে। দেশের উত্তরাঞ্চলে বাড়ী হওয়ায় প্রতিবছর প্রচন্ড শীত নামে এলাকায়,বলা যায় শীতের আবাদ হয় আমাদের অঞ্চলে। শীতের প্রকোপ হতে রক্ষা পেতে খুব কষ্ট করে একটা জ্যাকেট কিনেছিলাম সেবার। খুব পছন্দের জ্যাকেটটার বুকে চেইন টানা দুটো পকেট। চেইন এর মাথায় পাঁচটাকা মূল্যের কয়েন এর সমান আকৃতির বেশ ভারী স্টীলের তৈরী স্টার-লকেট। বুকে টানা-চেইনের ডগায়ও ঐরূপ ভারী স্টার লকেট,ডানবাহুতে মনোগ্রামযুক্ত আইডি কার্ড ঝুলানোর হুক, বামবাহুতেও পকেট এবং চেইনযুক্ত লকেট। পিঠে এ্যাপারেটাস ব্যাগ,সেখানেও ঐরূপ লকেটওয়ালা চেইন।
আজ শনিবার অমাবস্যা তিথি,শৈত্য প্রবাহ চলছে এলাকায়,ঘন কুয়শায় আচ্ছন্ন চারদিক, তাপমাত্রা নেমে গেছে ১০°ডিগ্রীর নীচে। জুতা-মোজা পরে হাতমোজাও পরে নিলাম হাতে,গায়ে চাপালাম নতুন কেনা সেই প্রিয় জ্যাকেটটা,উলেন মাফলার দিয়ে দু’কান বেঁধে জ্যাকেটের টুপিটা দিয়ে ঢাকলাম মাথা। মা
বলল,
– বাবা,আজকে শনিবার তাতে অমাবস্যার দিন,এত ঠান্ডায় চেম্বারে যেতে হবে না। আঁৎকে উঠে বললাম,
– বলো কি মা! এরকম প্রচন্ড ঠান্ডাতেই তো রোগীপত্তর হয় বেশি। বাধ্য হয়ে মা তখন রসুনের কয়েকটা কোঁয়া,কিছু সরিষা পুঁটলি বেঁধে,আমার জ্যাকেটের এ্যাপারেটাস ব্যাগে ভরে দিল। আমি অবাক হয়ে বললাম,
– এসব কেন দিলে মা? উত্তরে মা বলল,
– সরিষাদানা আর রসুনের কোঁয়া সাথে থাকলে ভূত-প্রেত কাছে ঘেঁষতে পারে না।
আরো বলল,
– গায়ে মাথায় যদি কিছু কেরোসিন ছিটাতে পারিস তো আরো ভাল হয়, কেরোসিনের গন্ধে তেনারা এক’শ হাত দূরে পালাবে ।
– ছি,ছি, মা! এসব কি বলছ তুমি? এ যুগের বিজ্ঞানের ছাত্র হয়ে ওগুলো একদম বিশ্বাস করি না আমি। মা তবুও ভরসা পেলো না আমার কথায়। জোর করে একটা তিন ব্যাটারী টর্চ লাইট হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
– এটা নিয়ে যা, কোনকিছু ঘটলে এটা জ্বালিয়ে দেখিস, আলোতেও ওরা ভয় পায়। কি আর করি,মায়ের আদেশ শিরোধার্য করে ছুটলাম পারের হাটের চেম্বারের দিকে।
রাতে ফেরার পথে শীত আর কুয়াশা বেড়ে গেল অনেকগুণ। দু’হাত সামনের কিছুকেও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে না,টর্চের আলোয় শুধু কুয়াশার মেঘ ছাড়া রাস্তার নিশানাও ভালমত চোখে পড়ছে না। অমাবস্যার রাত ভেবে একটু ভয় ভয় করলেও বিশেষ কেয়ার করলাম না। স্বাভাবিকের চেয়ে একটু জোরেই চালাচ্ছি সাইকেলটা। মাঝরাস্তায় আসতেই ধুক্ ধাক্ করে ঝাঁকুনি দিতে লাগলো সাইকেল,সেটা যে এ্যাবড়ো থ্যাবড়ো রাস্তার কারণে তা বেশ বুঝতে পারলাম,কিন্ত ঠিক শ্মশানের কাছে আসতেই কে যেন টক্ টক্ করে টোকা মারতে লাগলো আমার পিঠে! আশ্চর্য কান্ড! যত জোরে চালাচ্ছি ততই বেশি হচ্ছে টোকানোর শব্দ! ওরে বাবা! এখন বুঝতেছি বুকে এবং বামবাহুতেও টোকাচ্ছে তেনারা! নাহ্! আর তো অবহেলা করা ঠিক নয়। নামলাম সাইকেল থেকে, চারদিকে টর্চ মেরে দেখলাম,না তো! কেউ নেই! কিচ্ছু নেই ! আবার উঠলাম সাইকেলে,চালালাম আরো জোরে জোরে। টকাস টকাস থেকে ঠকাস ঠকাস করে বাড়তে লাগলো টোকানোর শব্দ-বুকে পিঠে বাহুতে। ঠক ঠক করে কাঁপতে লাগলো হাত পা,ভয়ে নাকি ঠান্ডাতে,ঠাওর করতে পারলাম না! তবে আর দু’তিন প্যাডেল মারতেই পড়ে গেলাম স্লিপ কেটে, রাস্তা থেকে একদম নীচের নীচু জমিতে,জমিটার পাশেই তো জঙ্গলাকীর্ণ গোরস্থান। আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়ালাম। এত ঠান্ডায়ও সর্বাঙ্গ ভিজে গেছে ঘামে। সাইকেলটা উঠিয়ে রাস্তায় স্ট্যান্ড করলাম, খুলে ফেলাম মাথার টুপি আর মাফলার,ফলে কিছুটা পরিস্কার হল মস্তিষ্কের আচ্ছন্ন ভাবটা। গায়ের ধূলো-বালি ঝাড়তে ঝাড়তেই চিনে ফেললাম তেনাদের! এ্যাবড়ো থ্যাবড়ো রাস্তায় সাইকেলের ঝাঁকনিতে এতক্ষণ টকাস টকাস করে নাচছিল আমার বুকের পিঠের আর বামবাহুর স্টার লকেটগুলো। ¤
* ২৬,০২,২০২০ বুধবার ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *