কান টানলে আজও আসে মাথা’ই! – তন্ময় সিংহ রায়

Pulling your ears still comes to your head! - Tanmay Singh Roy

উনি নিজেও জানতেন না যে , শরীরটার বয়েস হলেও , তরতাজা যুবক মনুষ্যত্বের সু-উজ্বল এই নিদর্শন’ই সযত্নে ওনার হাত ধরে ধীরে ধীরে একদিন ঠিক পৌঁছে দেবে ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ অসামরিক ‘পদ্মশ্রী’-এর মতন সম্মাননাতে।
মানবিকতার উর্ধ্বে এ ঘটনা আজ তো রীতিমতন বিরল , তাই স্বভাবতই হৃদয়ে রেখাপাতের সংখ্যাটাও হয়ে দাঁড়ায় যথেষ্ট বেশি।
দীর্ঘ ৪০ টি বছর ‘রামনগর উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়’-এ শিক্ষকতার পর ২০০৪-এ অবসর গ্রহণ করেও , পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রামের রামনগরের বাসিন্দা ৭৮ বছরের মাষ্টারমশাই সুজিত চট্টোপাধ্যায় , ১৮ টি বছর অনায়াসে কাঁধে তুলে বহন করে আসছেন গ্রামের নবম থেকে তৃতীয় বর্ষের (গ্র‍্যাজুয়েশন) হতদরিদ্র , দুঃস্থ ও অসহায় ছেলেমেয়েদের যথাসাধ্য শিক্ষাদানের মতন গুরুদায়িত্ব!
শুধু কি তাই?
ছাত্রের পর ছাত্র পড়িয়েই চলেছেন তিনি প্রায় সকাল থেকে , আর ওনার পাঠশালায় মোট ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা তো প্রায় ৩০০ মতন।
আর গুরুদক্ষিণা হিসেবে তিনি নিতেন বাৎসরিক ২ টাকা ও ৪ টি চকলেট।
আত্মসুখের চেয়েও মনুষ্যত্বের দৈর্ঘ্য যাঁদের বড় , তাঁদের শুধু ইচ্ছাশক্তির জোরেই হয়ে যায় অসাধ্য সাধন , আর বারেবারেই তা প্রমাণিত।
লকডাউনে কর্মহীন হয়ে পড়া প্রায় ২৫০ পরিবারের হাতে মোট ৪ দফায় এই মাষ্টারমশাই তুলে দিয়েছেন ৭৫ হাজার টাকার নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী।
গ্রামের ৭-৮ জন থ্যালাসেমিয়া রোগীর যথাসাধ্য শুশ্রূষার পিছনেও আছেন এই সুজিতবাবুই , আর বছরে একটি বার হলেও তাঁদের হাতে তিনি তুলে দেন ৫ হাজার করে টাকা এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র , আর এই সমস্ত
কর্মকাণ্ডটাই চলে ওনার পেনশনের টাকায়।

সেদিন সোমবার অর্থাৎ , ২৫ শে জানুয়ারি ২০২১ , বিকেল পৌনে ৫ টা থেকে ৫ টার মধ্যে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে হঠাৎই ফোন আসে সুজিতবাবুর ভাইপো উৎসব চট্টোপাধ্যায়ের মোবাইলে।
চাওয়া হয় সুজিত চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের সাথে সরাসরি ফোনে কথা বলার জন্যে।
ফোনটা পেতেই তাঁকে প্রশ্ন করা হল ,
‘হ্যালো! , আমি কি সুজিত চট্টোপাধ্যায় বাবুর সাথে কথা বলছি?’
‘হ্যাঁ আমি সুজিতবাবুই বলছি।’
‘এবারের পদ্মশ্রী প্রাপক তালিকায় আপনার নামটি নির্বাচিত হয়েছে এবং আগামী মার্চের শেষের দিকে দিল্লিতে এসে আপনাকে সেটি সংগ্রহ করতে হবে , ব্যবস্থা সব আমরাই করে দেবো।’
উড়ন্ত এক ফোনের অপর প্রান্ত থেকে হঠাৎ এ হেন ওজনের সুসংবাদ প্রথমে বিশ্বাস করতেই কেমন যেন লাগছিল মাষ্টারমশাইয়ের!
মেয়েকে এমনকি অস্ফুটে তো বলেই ফেললেন যে , ‘এখন এ বিষয়ে কাউকে কিছুই দরকার নেই বলার।’
এরপর শুভাকাঙ্ক্ষীদের একের পর এক ফোনে বিষয়টি অবশেষে এসে দাঁড়ায় বিশ্বাসযোগ্যতার দোড়গোড়ায়।

বলাবাহুল্য , শিক্ষকতাতেও আজ আর নেই সেই পূর্বের স্বচ্ছতা , এ যেন আজ ক্রমশই হয়ে উঠছে শুধু কর্তব্যের মাধ্যমে এক পেশা , যেখানে দায়িত্বের জীর্ণ-শীর্ণকায় শরীরটা উঠছে প্রকট হয়ে!
শুধু পশ্চিমবঙ্গের ২৩ টা জেলায় সমস্ত সরকারী স্কুলে যদি উদাহরণস্বরূপ ধরা যায় যে , সর্বমোট শিক্ষক-শিক্ষিকার সংখ্যাটা ৫০০০ , তো সেখানে যেন বর্তমানে টেলিস্কোপ বসিয়ে দেখতে হবে যে প্রকৃত দায়িত্ববান বা দায়িত্ববতী
শিক্ষক-শিক্ষিকা ঠিক কতজন?
সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের ছেলে-মেয়েদের গুরুদায়িত্ব ওনারা বহন করে চলেছেন যেভাবে , তা কি যথার্থই?
রাজ্যের সরকারী স্কুলের পড়াশোনার মান যদি থেকে থাকে ঠিকই , তবে সেই স্কুলগুলিতে শিক্ষকতা করা সিংহভাগের ছেলে-মেয়েরা কেন
হুড়মুড়িয়ে ভর্তি হয় প্রাইভেট স্কুলে , ও এত বেসরকারি স্কুল কেনই বা উঠছে ব্যাঙের ছাতার মতন গজিয়ে?
গরীব মানুষের ছেলেমেয়েগুলোর তো সাধ্যি নেই এসব স্কুলে পড়ানোর , সেখানে অর্থাভাবে তো তাঁদের প্রবেশাধিকার কঠোরভাবে আবার নিষিদ্ধ!
আর নেই তাঁদের পাঁঁচবেলার আপেল , মাখন আর হরলিক্স!
এরা পাকস্থলীর আর্তনাদকে থামায় মিড-ডে-মিল-এ।
শ্রদ্ধা জানাই এই পদক্ষেপকে , নেই মামার চেয়ে , কানা মামা যে অনেক ভালো।
তবে উপায়?
তাহলে দিনের পর দিন এভাবেই কি গড়িয়ে চলবে এই সিস্টেমের চাকা?

Leave a Comment

Your email address will not be published.