Rathindranath Ray

শিরোনাম  #তিন্নির কথা  #কলমে রথীন্দ্রনাথ রায়

সূর্য উঠছে ধীরে । একটা লাল থালার মতো । নীল সমুদ্রের বুকে কে যেন একমুঠো আবির ছড়িয়ে দিয়েছে । আকাশ আর সমুদ্রের মিলনস্থলে এক অদ্ভুত রঙিন রহস্য । জল ও আকাশের রঙে কোনও তফাৎ ই বোঝা যায় না আজ । বিষ্মিত দৃষ্টিতে সেদিকে চেয়ে থাকে রঞ্জন । সমুদ্রবক্ষে সূর্যোদয় বারবার বারবার, অনেকবারই দেখেছে সে । কিন্তু প্রত্যেকবারের সূর্যোদয়কে আগের তুলনায় রোমাঞ্চকর বলে মনে হয় । আর প্রত্যেকবারই এক অনাস্বাদিত আনন্দে ভরে ওঠে তার মন ।

দীঘা থেকে বেশ কিছুটা পশ্চিমে সমুদ্রতীরের এক অখ্যাত গ্রাম রেবতীপুর । কেন ‘রেবতীপুর ‘ তা নিয়ে অবশ্য মাথা ঘামায়নি সে । তবে শান্ত ও নিরিবিলি হওয়ার জন্য রেবতীপুরকে বেশ ভালো লেগেছে তার । গ্রামটিতে জেলেদেরই বাস বেশি । সমুদ্রে মাছ ধরাই তাদের প্রধান জীবিকা । তবে কেউ কেউ শাঁখ এবং ঝিনুক থেকে বিভিন্ন দ্রব্যাদি তৈরিতেও ব্যস্ত থাকে । তবে এদের সংখ্যা কম । আর এদেরই একজন হল তিন্নি । সমুদ্র প্রায় প্রতিবছরই ওদের ঘরবাড়ি ধুয়ে মুছে সাফ করে দেয় । আবার সেখানে ঘর তোলে তিন্নিরা । বাবা এবং মাকে নিয়ে তার সংসার । বাবা ছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক । এখন অবসরপ্রাপ্ত । পেনসনের টাকার জন্য হাপিত্যেশ করা ছাড়া কোনও কাজ নেই তাঁর । এইরকম এক সংসারের আদরের ডাকাবুকো মেয়ে তিন্নি । দীঘার সমুদ্রতীরে ঝিনুকের তৈরি একটা সুদৃশ্য কলমদানি কিনতে গিয়েই ওর সঙ্গে আলাপ রঞ্জনের । এমন অনেক হাড়ভাঙা খাটুনির মেয়েকে দেখেছে সে । তবু তিন্নি যেন অন্যরকম । সমুদ্রতীরের শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ তাকে ভাবায়না । সমুদ্রঘেঁষা রাস্তায় প্রতিদিন প্রায় দশ কিমি সাইকেল চালিয়ে দীঘায় যায় সে । উদ্দেশ্য পর্যটকদের কাছে ঝিনুক আর শাঁখের তৈরি জিনিসপত্র বিক্রি করা । নানারকমের পর্যটক দেখেছে সে । জিনিস কেনার ছলে অনেকেই পরখ করে দেখতে চায় তাকে । ধীবরসমাজে জন্মেও তাদের মতো হতে পারেনি সে । অনেক স্বপ্ন ছিল তার । লেখাপড়া শিখে ভালো কিছু একটা হওয়ার বা করার ইচ্ছে ছিল তার । কিন্তু তা আর হবার নয় । এখন চিন্তা কিভাবে বাবামাকে একটু সুখে রাখা যায় । কিন্তু তা নিয়েও প্রতিবেশীদের বাড়তি চিন্তা ও উৎসাহ লক্ষ্য করে সে ।

প্রায় একমাস হল রঞ্জন মাসির বাড়ি এসেছে । উদ্দেশ্য সমুদ্রতীরের জীবন সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন । প্রতিদিন সকালবেলায় সমুদ্রতীরে আসে । জেলেদের দিনপ্রতিদিনের জীবনকে কাছ থেকে দেখে । দেখতে দেখতে দুপুর হয় । তারপর ক্ষিধের টানে ঘরে ফেরে । আবার বিকেল হতেই বেরিয়ে পড়ে । বিকেলের অপসৃয়মান সূর্যের মায়াবী আলোয় সমুদ্রকে আরও বেশি রহস্যময় বলে মনে হয় । নীলসমুদ্রের গর্জন আর সামুদ্রিক পাখিদের কর্কশ চিৎকারে মুখর হয়ে থাকে তটভূমি । দেখতে দেখতে অন্ধকার নেমে আসে । পূব আকাশে চাঁদ ওঠে । সেই আলোয় সমুদ্র যেন অপরূপা হয়ে ওঠে । সেই রূপ দেখতে দেখতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে সে । সময়ের দিকেও খেয়াল থাকেনা । দীঘা থেকে ফেরার পথে প্রায় প্রতিদিনই এটা লক্ষ্য করেছে তিন্নি । কিন্তু কাছে গিয়ে ওর কথা জিজ্ঞাসা করার সময় হয়নি । যদি ও মনে করে মেয়েটা গায়ে পড়া স্বভাবের  ? কিন্তু সেদিন সাইকেলটাকে রাস্তার ওপর দাঁড় করিয়ে রেখে ওর পাশে গিয়ে দাঁড়াল সে ।

— মাফ করবেন । সমুদ্রতীর এসময় খুব বেশি নিরাপদ নয় ।

চমকে ওঠে রঞ্জন । আশা করেনি এই নির্জন সমুদ্রতীরে কোনও তরুণী এসে স্মরণ করিয়ে দেবে জায়গাটা নিরাপদ নয় । একটু ধাতস্থ হওয়ার পর আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে মেয়েটিকে । সেই কলমদানি বিক্রেতা । তারপর ঘড়িটা দেখে নিয়ে বলে, হ্যাঁ সন্ধ্যে হয়ে গেছে । বুঝতেই পারিনি । কিন্তু মেয়েদের পক্ষে তো আরও বেশি বিপজ্জনক ।

— আমার কাছে নয় । আমি আর পাঁচটা মেয়ের থেকে আলাদা । বেচাল দেখলে আমিই তাকে সাবাড় করে দেব ।

— তাই  ?

রঞ্জন ওকে আরও একবার দেখে নেয় । কঠোর পরিশ্রমের চিহ্ন ওর সারাদেহে । তবু তারই মাঝে নারীসুলভ কমনিয়তাও বর্তমান । আপাত রুক্ষতার আড়ালে যাকে ঢেকে রাখা যায়নি । ওর সঙ্গে চলতে থাকে সে । পিছনে সমুদ্রের গোঙানি । আর ঝাউবনের মধ্যে থেকে ভেসে আসে শিয়ালের খ্যাক খ্যাক চিৎকার সঙ্গে ঝিল্লির একটানা বেসুরো বিলাপ । তারই মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলে ওরা দুজন । চারদিকে এক প্রাকৃতিক রহস্যময়তা । রাস্তার ওপর উঠে আসে ওরা ।সাইকেল নিয়ে হাঁটতে থাকে তিন্নি ।পাশে হেঁটে চলে রঞ্জন । চাঁদের আলোয় ধোওয়া বালুকাময় তটভূমি । আর পাশে এক তরুণী । তার হৃদয় গুনগুনিয়ে উঠলেও কিছুই বলতে পারল না সে । সাইকেলে উঠে নিজের পথে চলে গেল তিন্নি । রঞ্জন দেখল চন্দ্রালোকিত বালুকাময় পথে ঝাউবনের মাঝ দিয়ে তিন্নির অদৃশ্য হওয়াকে ।

ইতিমধ্যে রঞ্জন রেবতীপুরের পথঘাট, সমুদ্রতীর এবং মানুষজন সম্পর্কে অনেকখানি অবগত হয়েছে । এখন সে জেলেদের সঙ্গে সমুদ্রে যায় । সারারাত নৌকোয় থেকে জেলেদের মাছধরা দেখে । তাদের জীবনযুদ্ধের গল্প শোনে । আর বিষণ্ণ হয় । একদিন রেবতীপুর ধীবরসমবায় সমিতির অফিসে গিয়েও হাজির হল সে । সমিতির সভাপতি অম্বিকাচরণ হালদার একটু বাড়তি খাতিরও করে । সে অবশ্য এতখানি আশা করেনি । এমনকি ওর বাড়িতে যাওয়ারও নিমণ্ত্রণ পায় । ধীবরদের কথা জানতে সে নিমণ্ত্রণ গ্রহনও করে ।

অম্বিকাচরণের বাড়ি এসে আশ্চর্য হয় সে । ধীবরসমিতির সভাপতি হলে কি হবে তার বাড়ির কোথাও আঁশটে গন্ধ পর্যন্ত নেই । অম্বিকাচরণের জীবিকা মাছধরা নয় । আর পাঁচজন ধীবরের মতো তার বাড়ির কোথাও অভাবের চিহ্ন নেই । সুন্দর সাজানো গোছানো এবং দামি আসবাবে ভর্তি তার ঘরগুলো । কিছুক্ষণ বসার পরেই সুন্দর একটি কাঁচের থালায় খাবার নিয়ে এল একটি মেয়ে । অম্বিকাচরণ বিনা ভূমিকাতেই বলল, এ আমার মেয়ে মালা । এবছরই বি এ পাশ করেছে । বুদ্ধিমতী ও বলতে পারো ।

রঞ্জন হাতদুটো তুলে নমস্কার করে ।

থালাটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখে প্রতানমষ্কার করে মালা ।  ( ক্রমশ  ) 01/07/21

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top