Sarifa Khatun

একেই কি বলে সভ্যতা?

কিছু কিছু মানুষ বড়োই অদ্ভূত| এরা নিজেই জানে না আসলে কি চাই| কখনো যে মানুষটার সৌন্দর্যের প্রেমে পাগল হয়ে যায়, আবার তারই সৌন্দর্য সামান্য ফিকে হলে তাকে অপমান করতে ছাড়ে না| মানুষ হয়েও বলতে বাধ্য হচ্ছি কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানুষের ব্যবহার শুধু মানব জাতিরই নয় সমগ্র প্রানীকূলের কলঙ্ক| আমরা যেসব বিখ্যাত মানুষদের চিনি আমরা কি কেবল তাদের সৌন্দর্যকে সম্মান করি নাকি তাদের নাম ও ট্যালেন্টকে সম্মান করি|

বাস্তবে আমরা মানুষের ট্যালেন্টকে ব্যবহার করি কিন্তু সৌন্দর্য দিয়ে বিচার করি|

আমাদের পৃথিবীতে অসংখ্য মানুষ আছে যারা নিজের নিজের ট্যালেন্টের জন্য আমাদের কাছে পরিচিত| এখনি কয়েকজন বিখ্যাত লেখকের ছবি দেখালে চিনতেই পারবে না ৮০ শতাংশ মানুষ, কারণ ওই সব ব্যক্তিগুলোকে আমরা মুখের সৌন্দর্য নয় ওনাদের আমরা চিনি মনের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলার মাধ্যমে| ওনাদের চেহারার সৌন্দর্য আমাদের দেখার দরকার পড়ে না|

 

অথচ আমাদের বর্তমান সমাজে যারা নিজেদের বিভিন্ন ট্যালেন্ট দিয়ে, সিনেমার অভিনয়ের মধ্য দিয়ে আমাদের মুগ্ধ করে রেখেছে, সেই সব মানুষগুলোকেও আমরা কতই না ভালবাসি, তাই না? আচ্ছা শুধু কি সৌন্দর্যের জন্যই আমরা তাদের ভালবাসি? তাদের ট্যালেন্টের কি কোনো দামই নেই?

 

সম্প্রতি এক বাংলা সিরিয়ালের নায়িকা শ্রুতি দাসের গায়ের রং কালো নিয়ে এবং বাংলা সিনেমার নায়িকা শুভশ্রী গাঙ্গুলির মোটা হয়ে যাওয়া শরীর নিয়ে স্যোসাল মিডিয়াই খুবই আলোচিত হয়েছে| এতদিন কি শুধুমাত্র শুভশ্রীর শরীরটাই মন কেড়েছিল? শুভশ্রীর অভিনয়ের প্রতি কি কোনো ভালোবাসা ছিল না?

আমাদের সবার পরিচিত জনপ্রিয় হিরো রজনীকান্ত, নানা পাটেকার কি আমাদের কাছে সৌন্দর্যের বিনিময়ে মন কেড়েছে? বর্তমানে আমাদের সবার প্রিয় গায়িকা আবার আমাদের সকলের অনুপ্রেরণা বললেও ভুল হবে না নেহা কক্কর কি সৌন্দর্যের জন্য মন কেড়েছে?

একচুয়েলি আমরা মানুষেরা বড়োই অদ্ভূত, আমরা নিজেদের যোগ্যতা দেখিনা অথচ অন্যদের নিয়ে কটাক্ষ করতে আমাদের বাঁধে না| এটাই কি আমাদের সভ্য সমাজ? সমাজের দোষ দেওয়াটা ভুল হবে এই আমাদের মানুষের পরিচয়?

কি পায় আমরা অন্যের সৌন্দর্য নিয়ে চর্চা করে? আমাদের মনটাই আসলে সবথেকে কুৎসিত| তাই বোধ হয় এরকম কুৎসিত ভাবনা জন্মায়|

 

Lizzie Velasquez নামটা কি শুনেছেন? আমি খুব ভালো করেই বলে দিতে পারি আমরা যারা সবসময় অন্যের সৌন্দর্য নিয়ে আলোচনা করি তাদের মধ্যে ৮৫শতাংশ মানুষ এই নাম টা শোনে নি|

এখনি অর্ধেক মানুষ নামটা পড়ে বুঝতেই পারবে না যে এটাও একজনের নাম|

জানেন কি নামটা কিসের জন্য পরিচিতি লাভ করেছে? “The ugliest girl in the world” হ্যাঁ ঠিকই পড়লেন “বিশ্বের সবথেকে কুৎসিততম মেয়ে”

 

বিশ্বের সবথেকে কুৎসিত মেয়েটাও আমাদের মনে জায়গা করে নিয়েছে| আমেরিকার অস্টিন শহরের মেয়ে তাঁর নাম লিজি ভেলাসকুয়েজ । বাকি মেয়েদের থেকে তাঁর জীবনটা বেশ আলাদা। লিজির শরীরে নেই কোনও অ্যাডিপোজ টিস্যু। ফলে শরীরে কোনও পেশী তৈরি হয়নি তাঁর। তাঁর একটি চোখ পুরোপুরি ঝাপসা। ওজন মাত্র ২৭কেজি| বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একবিংশ শতকের এই আধুনিক সভ্যতা তাঁর পরিচয় দেয় বিশ্বের কুৎসিততম মেয়ে। এমনকি অনেক মানুষ লিজিকে আত্মহত্যা কিংবা লোকচক্ষুর আড়াল হয়ে থাকার পরামর্শও দেন। কিন্তু তারপরও বিরল রোগে আক্রান্ত এই অদম্য নারীর জীবনীশক্তিকে কোনওভাবেই দমানো যায়নি। চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয় সেটা প্রমান করে দিয়েছে লিজি।

 

২০১০ সালে বিশ্বের এই কুৎসিততম মেয়েটি লেখেন তাঁর আত্মজীবনী ‘লিজি বিউটিফুল’। তারপর ২০১২-তে তাঁরই লেখা ‘বি বিউটিফুল, বি ইউ’ গোটা পৃথিবীর মন জয় করে ফেলে। শেষ পর্যন্ত মেয়েটি একজন লেখিকা হয়ে ওঠে এবং স্ব-সাহায্য সম্পর্কে তিনটি বই লিখেছিল। ২০১৪ সালে প্রকাশিত সর্বশেষ বইটিকে “সাহসী হৃদয়। Lizzy Velasquez গল্প, “এবং ২০১৫ সালে একটি ডকুমেন্টারি একই নামের সাথে প্রকাশিত হয়।বইয়ের শুরুতে লিজি লিখেছিলেন, চেহারা নয়, মানুষকে মূল্যায়ন করতে হবে অর্জিত গুণ দিয়ে।

 

গুন্ডা মোকাবেলা করার জন্য সরকারী প্রোগ্রামে লিজি অংশগ্রহণ করে, এবং বিভিন্ন ইভেন্টে, তার বক্তৃতাগুলি উপস্থিত ব্যক্তিদের দ্বারা খুব অনুপ্রাণিত হয়।

 

বর্তমান সভ্যতা আমাদের প্রতিনিয়ত গ্ল্যামারস্ হওয়ার মন্ত্র দেয়। তাই ফেয়ারনেস ক্রিমের পিছনে ছুটে চলি| সেখানেই লিজির মতো মেয়েরাই আমাদের অনুপ্রেরণা দেন। রূপ নয়, মনের সৌন্দর্যই আসল। মুখের সৌন্দর্য নয়, আমাদের কর্মই পারে আমাদের সর্বাঙ্গসুন্দর করতে।

https://www.facebook.com/storyandarticle/posts/270488651545110

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top