Shampa Saha

#ফুলি_পর্ব_১৫
#শম্পা_সাহা

বাসন্তীর বয়স হয়েছে।তেমন ভাবে আর দোকানে সময় দিতে পারে না।এদিকে ফুলিকে দোকানে পাঠাতেও মন চায় না।সে ঘটনার পর বাসন্তী পই পই করে ফুলিকে সমঝেছে,ভয় পেতে,নিজেকে আড়াল করতে।কিন্তু ফুলি।নাঃ।সে এত নরম মনের মেয়ে তো নয়।কারণ সে বুঝেছে জঙ্গলের রাজত্বে থাকতে গেলে দাঁত নখ অবশ‍্যই দরকারি।

তার কি দোষ ছিল যে অকারণ নোংরা হাত তাকে ছুঁয়ে গেল?তার কি দোষ ছিল যে জন্মের পর তার ঠিকানা হল ডাস্টবিন, কেন সেই এতবড়ো বস্তিতে একমাত্র নাজায়েজ?ফুলি শুধু ঘেন্না করতে শিখেছে বাবা মা শব্দ দুটোকে।বাসন্তী ওর মা নয়,সে হতেও চায় না কিন্তু ফুলি ,ফুলির কাছে তো মা শব্দটা উচ্চারণ হলেই ওই থপথপে মোটা চেহারা ফর্সা চকচকে কপালে টেনে খোপা বাঁধা পান মশলা খাওয়া মুখটাই মনে পড়ে।মা খুব বাজে, মা খুব খারাপ, মায়েরা খুব খুব খুব কষ্ট দেয়!আগুন চোখে দাঁতে দাঁত চিপে ফুলির লড়াই এই সমাজের বিরুদ্ধে, নোংরা হাতের বিরুদ্ধে, সব পুরুষ মানুষের বিরুদ্ধে সব বাবার বিরুদ্ধে সব মায়েদের বিরুদ্ধে!

একদিন ফুলি নাক ফাটালো বল্টুর।না বল্টু কোনো অসভ্যতা করেনি।শুধু বলেছিল
-ফুলি একটু দাঁড়া
ফুলির তখন ডিমের ট্রে নিয়ে দোকানে যাবার সময়।সেই ঘটনার পর থেকে ফুলি যেন বদলে গেছে আমূল।কোথায় সেই মুখচোরা,লাজুক শান্তশিষ্ট কিশোরী?এ শান্তশিষ্ট বটে তবে লাজুক নয়।এখন ও আর কারো তাকানো দেখে চোখ সরিয়ে নেয় না বরং ঠান্ডা দৃষ্টিতে সাপের মত তাকিয়ে থাকে শিকারির দিকে ।যে শিকারি ওর ফ্রকের আড়াল ভেদ করে বুকের মাংসপিন্ড দেখতে চায়,যে শিকারি পাশ থেকে যাবার অছিলায় ছুঁয়ে যেতে চায় ওর নরম শরীর, যে নোংরা হাত লুঙ্গির ফাঁক থেকে যেন অনবধানে এমন ভাবে ওকে গোপনাঙ্গ দেখিয়ে বিকৃত তৃপ্তি পেতে চায়,ও স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সেই নোংরা চোখের দিকে।যেন চোখ দিয়েই গিলে ফেলবে সব।কেন ছোঁবে ওরা চোখ দিয়ে,হাত দিয়ে,নোংরা স্পর্শ দিয়ে,ইচ্ছের বিরুদ্ধে, নানা অছিলায় নারী শরীর?কেন ?কেন?কেন?কে অধিকার দিয়েছে ওদের?কে?

চারিপাশের শরীরী খেলা যা এতদিন ওর চোখ দেখতে পায়নি, সেদিনকার ঘটনা যেন এক ঝটকায় উন্মুক্ত করলো এই নোংরা পৃথিবীর পঙ্কিল,ঘন কালো দিক।না ফুলি ভেঙে পড়লো না ,লুকিয়ে পড়লো না ,বরং লড়াইয়ের জন‍্য প্রস্তুত।ও বাসন্তী হবে না ,ও সেরিডেবি হবে না।যে পনেরো পার করতে না করতেই নাকে পোটা কার্তিকের দাদাকে বিয়ে করে এখন রোগা টিংটিঙে শরীর আর ধামার মত পেট নিয়ে শ্বশুর ঘর করে।বাসন মাজে ,কাপড় কাচে।,জল তোলে ,ভাত খায় ,লাথি ঝাঁটাও।

বল্টু ওর সঙ্গে বেশ ভালোবাসা ভালোবাসা খেলে ছেড়ে গেছে।শেষে এই কার্তিকের দাদা।কবে নাকি কার্তিক ও দাঁত বসিয়ে ছিল সেরিডেবির ওপর।উঃ!মা গো!এও হয়?এই তো সেদিন সবাই বন্ধু হয়ে রুমাল চোর খেলতো,কানামাছি খেলতো,চু কিৎ কিৎ খেলতো,কবে এরা সব মেয়েছেলে ব‍্যটাছেলে হয়ে গেল?কবে এরা খেলনাবাটি নিয়ে খেলতে খেলতে শরীর নিয়ে খেলতে লেগে গেল?

আশেপাশের বদল হয়েছে অনেক আগেই শুধু ফুলি বোঝেনি।বাসন্তীর কড়া শাসনের আড়ালে ও ছিল নিষ্পাপ, সুকোমল।কিন্তু এক সন্ধ‍্যা ওকে দাঁড় করালো বাস্তবের মুখোমুখোমুখি।সেই সন্ধ‍্যা ওর চোখের সামনে তুলে ধরলো এক নির্মম বাস্তব আদিম গন্ধ ওয়ালা।

ডিম নিয়ে সবে দু পা এগিয়েছে,হঠাৎ বল্টু ওর রাস্তা আটকে দাঁড়ায়, সেই গলি ,সেই সন্ধ‍্যা বেলা আজ শুধু বৃষ্টি হচ্ছে না।ফুলিকে দা‍ঁড়াতে বলায় ও বিরক্ত
-এই সর।জেঠি বকবে?
-একটা কথা শোন
-না আমার সময় নেই
-শোন না
-না শুনবো না
তেড়িয়া হয়ে জবাব দেয় ফুলি।বল্টু প্রথমে একটু ভ‍্যাবাচ‍্যাকা খায়।ফুলির মনোজগতের পরিবর্তন বল্টুর জানার কথা নয়।
-বাবা,একটু দাঁড়ালে কি হয়
-আমার ছেলেদের সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে না।সর
বল্টু কে বাঁ হাতে ধাক্কা দিয়ে এগিয়ে যেতেই বল্টুর পৌরুষে ঘা লাগে।পৌরুষে যে কার কখনো কেন কিভাবে ঘা লাগে সে কে বলতে পারে?
-ও কথা ভালোলাগবে কেন।বুকে হাত দিলে ভালো লাগবে

হঠাৎ যেন বাজ পড়লো।ফুলি ঠান্ডা মাথায় ডিমের ট্রে টা নামিয়ে রাখলো বেবিদিদের বারান্দায়।তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে সজোরে এক ঘুষি বল্টুর নাক বরাবর।গলির একপাশে ঘর অন‍্য পাশে দেয়াল।দেয়ালে মাথা ঠুকে গেল ভয়ংকর শব্দ করে।বল্টু নাক সুরসুর করাতে তাড়াতাড়ি নাকে হাত দিয়ে দেখে বাঁদিকের নাক বেয়ে গরম রক্ত গড়াচ্ছে ফোঁটায় ফোঁটায়।

ফুলি ফিরেও থাকালো না।ধীরে সুস্থে ডিমের ট্রেটা হাতে নিয়ে এগোলো দোকানের দিকে যেন কিছুই হয়নি।

না বল্টু এ বিষয়ে কাউকে কিছু বলেনি।কারণ সেটা আর যাই হোক ওর জন‍্য সম্মানের নয় মোটেও।বন্ধুদের বললে একেবারে মান ইজ্জৎ চলে যাবে।মেয়েছেলের হাতে মার খেয়েছে,তাও আবার ফুলির হাতে।ওই তো লিকলিকে হাত পা।কিন্তু কেউ খবর রাখেনি যে ওই লিকলিকে হাত পায়ের মধ‍্যে মনের জোর তৈরি হয়েছে যা বজ্রের মত।

ধীরে ধীরে দোকানের যাবতীয় দায়িত্ব ফুলি নিজের কাঁধেই তুলে নিল।কিছু কিছু করে পয়সা জমিয়ে দোকানটাকে পাকাও করেছে।আর কয়েকটা চেয়ার টেবিল এনে একটা পাতি চায়ের দোকান কে ভদ্র সভ‍্য করার চেষ্টা।এখন আর এটা শুধু চায়ের দোকান, ডিম সেদ্ধ বা বিড়ির দোকান নয়।এখন আর ওসব নয়।চা আছে তবে সকালে ডিম ,পাঁউরুটির সঙ্গে ঘুগনি ,কচুরি আলুরদম।দুপুরে মাছ ভাত ,আর বিকেলে রোল ,চাউমিন।সঙ্গে চা।কটা মেয়েও রেখেছে।যারা এসব কাজে ওকে হেল্প করে।

সেরিডেবিও বাচ্চা নিয়ে বাপের বাড়ি।আর ও কারো মার খাবে না।ও এখন ফুলির দোকানে দুপুরে রাঁধে,জেঠি হিসেব দেখে,আর বাজার হাট সব ফুলি নিজে হাতে করে।কে বলবে এ এক সময় চায়ের দোকান ছিল?একেবারে পাক্কা হোটেল ।আবার একটা নাম ও দিয়েছে ফুলি, তৃপ্তি হোটেল।যেখানে খেয়ে সবার তৃপ্তি।

ফুলির স্বপ্ন আরো বড়।একটা হোম ডেলিভারী খুলবে,কাছাকাছি অফিস গুলোতে দুপুরে খাবার, ছোট ছোট অনুষ্ঠানে যেমন জন্মদিন, বিবাহ বার্ষিকী যেখানে জনা পঞ্চাশেক নেমন্তন্ন সেখানে খাবার সাপ্লাই।সেজন‍্য রান্নার কোর্স ও করেছে।আর ইচ্ছে কেক তৈরিটাও শিখে নেবে।ফুলির স্বপ্ন যে অনেক অনেক অনেক বড়।তার জন‍্য লোকজন ও চাই।ওর একটাই শর্ত কোন ছেলে ওর কাছে কাজ করতে পারবে না।ফলে কাজ করাটা বেশ সমস্যার কিন্তু ফুলির দৃঢ় বিশ্বাস ও পারবেই।

©®

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top