Shampa Saha

#ফুলি_পর্ব_১৬
#শম্পা_সাহা

বাসন্তী কোনোদিন ফুলিকে সন্তানের জায়গা দেয়নি।ভোলার দেওয়া যন্ত্রনা, লছমির মা হয়ে ভোলার মনের অধিকার দখল করা সব বাসন্তী কে মা হতে দেয়নি মনে মনে।তাই ও ফুলির পালিকা হয়েই রয়ে গেছে।কিন্তু তা বলে ফুলিকে রক্ষা করতে কখনো পেছপা হয়নি।কারণ হয়তো নারীসুলভ কোমল সুকুমার প্রবৃত্তি অথবা হয়তো মা হিসাবে নিজেকে স্বীকার না করেই আসলে মাই হয়েছিল মনের অবচেতনে।

মা তো আসলে কোনো জৈবিক সম্পর্ক নয়,জন্মদিলেই যদি মা হওয়া যেত তাহলে তো সব প্রাণীরাই সেই মাতৃগরিমায় গর্বিত, তাহলে কেন কুকুর নিজের মৃত শাবক ভক্ষণ করে,আর কেনই বা মা পেঙ্গুইন সন্তান জন্ম দিয়েই ছেড়ে দেয় তার পুরুষ সঙ্গীর জিম্মায়!

মা কেউ হয় না স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে,মা হয়ে উঠতে হয়।মা যেন একটা পদ,মা দেন এক রাজস্বত্বের অধিকার যা সবাই পায় না।তাই বাসন্তী ফুলির জৈবিক মা না হয়েও ওর মনে সেই সম্মানের জায়গাটা ওরই।কারণ ফুলির জন্ম রহস্য আজ ওর অজানা নয়।এজন‍্য ওর বায়োলজিক‍্যাল বাবা মা সম্পর্কে ঘৃণা থাকলেও এই আপাত দজ্জাল, নিষ্ঠুর, হৃদয়হীনা বাসন্তীই ওর মনের সবটুকু জুড়ে।

ওই বস্তির ঘর এখন ফুলি পাকা করেছে।ওপরেও একটা ঘর তুলেছে,সামনে একটু বারান্দা মতন।ঘরে যতটুকু সুব‍্যবস্থা করা যায় ওর যশোদা মায়ের জন‍্য তাতে কোনো ত্রুটি রাখেনি।এমনকি পাশের পাড়ায় একটা বড় দোকান ঘরও ভাড়ায় নিয়েছে।যেখানে ওর হোম ডেলিভারির ব‍্যবস্থাটা সুন্দর ভাবে করা যায়।

ওর নিজের জীবন ওর নিজের কাছেই স্বপ্ন মনে হয়।পাড়ার পুরুষরূপী হিংসুকের দল প্রথমে ওকে চেষ্টা করেছিল নানা ভাবে অপদস্থ করতে।একজন মেয়ে,তাও আবার কুড়িয়ে পাওয়া ,সে কিনা ছাপিয়ে যাবে এলাকার সব পুরুষদের।না !এতটা ঔদার্য‍্য এখনো এদেশে আশা করা যায় না।ফলে দোকানে ভাঙচুর চলেছে,মদ খেয়ে হুল্লোড়, চাঁদার জুলুম।আবার যাদের স্ত্রীরা মারধোর আর খাবে না ,ফুলির তৃপ্তি হোটেলে খেটে খাবে,তাদের বাড়িতে আটকানোর চেষ্টা।এমনকি “রেপ করে ফেলে দেব” নামক এক অতি অবশ‍্যম্ভাবী হুমকি যা শুধু পুরুষের একচেটিয়া অধিকার তাও উড়ে এসেছে।

একদিন পথ চলতি পাশ থেকে উড়ে আসা এ মন্তব্যে ফুলি সরাসরি সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।ভর সন্ধ্যা বেলা,গলির মোড়ে বেঞ্চ পেতে যে ছেলে ছোকরারা আড্ডা দেয় তাদেরই একজনের শ্রীমুখ নিঃসৃত বাণী।ফুলি সামনে দাঁড়িয়ে বুকের ওড়না খুলে ফেলে একটানে
-নে,রেপ কর!কে আগে করবি ,আয়!আয় জানোয়ারের দল।আয়!

না ,কেউ সেদিন রেপ করতে আসেনি।চিৎকার চ‍্যাঁচামেচিতে লোক জমেছে, সবাই গল্প শুনেছে ,বড় ইচ্ছে করলেও সোচ্চারে বা আড়ালে রেপ বা ধর্ষনকে সমর্থন করেনি কেউই।যতই তারা ফুলির শ্রীবৃদ্ধিতে ঈর্ষান্বিত হোক,যতই তারা চাক ফুলির ক্ষতি হোক,যতই চাক দোকান ব‍্যবসা সব যেন ওর লাটে ওঠে।কিন্তু সে যাত্রা ওই বীর পুঙ্গবের দল আর এগোতে সাহস দেখায়নি।

সেরিডেবি বুদ্ধি দিয়েছিল
-একবার থানায় জানালে হয় না
-তুই থাম ছুঁড়ি!থানা!ওরাই আগে ওর সর্বনাশ করে দেবে।এদের তো তুই তাও ভয় দেখাতে পারবি ,ওদের ঠেকাবি কি দিয়ে?
না ,ওসব ধাষ্টামোতে বাসন্তীর ঘোর আপত্তি।আসলে সেরিডেবি ছেলেমানুষ।ভোলার সঙ্গে ঘর করতে করতে এইসব পুলিশ, রাজনীতি এসব বাসন্তীর হাতের তালুর মতোই চেনা।

তবে ফুলি কিন্তু জানে ,একটা মোক্ষম কামড় আসবে।কারণ আর কিছুই না ,যার মাথা নীচু করে থাকার কথা, অনাথা ,অসহায় অবলা ,সে যদি মাথা উঁচু করতে চায় সে কথা সমাজ এত সহজে মেনে নেবে কেন?সমাজ তো বাঁধা গতে চলবে।তার পান থেকে চুন খসলেই তখন গেল গেল রব!ফুলি মাঝে মাঝে ভাবে,মানুষের জন‍্য সমাজ না সমাজের জন‍্য মানুষ?

হ‍্যাঁ ফুলি এভাবে ভাবতে পারে।সেরিডেবির মাষ্টার ওকে যে অভাবনীয় অমূল্য সম্পদের পরিচয় দিয়েছিল তাকে কাজে লাগিয়ে ও পড়েছে।না ইস্কুলে পড়ার সৌভাগ্য হয়নি ওর।কিন্তু বই পড়েছে প্রচুর।সেরিডেবির মাষ্টার ওকে এনে দিয়েছে নানান মহাপুরুষের জীবনি,নানান বই বাংলা ভাষার।ও পড়েছে তসলিমা নাসরিন, ও পড়েছে বাণী বসু,ও পড়েছে সুচিত্রা ভট্টাচার্য, নবনীতা দেবসেন।এমনকি ঝুম্পা লাহিড়ীর বাংলা অনুবাদ, আবদুল কালামের জীবনি।পড়েছে আর স্বপ্ন দেখেছে।পড়েছে বিবেকানন্দ।”যদি জন্মেছ তো একটা দাগ রেখে যাও”!

হোক না ওর জন্ম শরীরী ক্ষুন্নবৃত্তির জন্য, না থাক ওর সার্টিফিকেট এর শিক্ষা কিন্তু ও যে দাগ রেখে যেতে চায়,ও যে লড়াকু,ও যে রক্তবীজ।শেষ থেকে শুরু ক‍রতে ও জানে,জানে মরে যাওয়াটা অবশ‍্যম্ভাবী, তার আগে একবার বাঁচবার চেষ্টা কেন নয়?

পাড়ার পাশের মদের ঠেক বন্ধ হলো,এলাকার সব মেয়েরা যাদের এত দিনের পরিচয় ছিল “মেয়েছেলে”, পুরুষের লাথিঝাঁটা, খিস্তি খামারিই ছিল যাদের উপহার আর রাতে স্বামীর খিদে মেটানো তারাও বাঁচতে শিখলো।একজোট হয়ে তৃপ্তি হোটেলে কাজে লেগে গেল।অন লাইন ব‍্যবসার যাবতীয় প‍্যাঁচপয়জার শিখে ফুলি অনলাইন হোম ডেলিভারী চালু করলো আর শিয়ালদহের স্টেশনের কাছে নিল একটা দোকান।কাঁচে ঢাকা ,এ সি।ওর কেক শেখা বিদ‍্যে কাজে লাগিয়ে খুলে গেল “ফুলিজ “.কথায় বলে,”ঈশ্বর যখন দেন,তখন দুহাত ভরে দেন”!ফুলির জীবনে এ কথাটা যেন ভীষন ভাবে সত‍্যি।

এলাকার ছেলেমেয়েদের জন‍্য বিনা খরচে সারা বছরের বই,খাতা।তৃপ্তি হোটেল বা ফুলিজের খাবার পৌঁছনোর জন‍্য এলাকায় যে সব বেকার পুরুষেরা জটলা করে সারাদিন চায়ের দোকানে রাজা ঊজির মারতো তারা কাজ পেল,এমনকি বছরে দুবার নিজের খরচে ডাক্তার এনে বস্তির সবার স্বাস্থ‍্যপরীক্ষার ব‍্যবস্থাও ফুলির যেন নিজের দায়িত্ব।আর রাজনৈতিক মহল?মোটা চাঁদা যে সব দলেরই পাওনা।তাই ও দিকেও নিশ্চিন্ত!

তা বলে যদি ভেবে থাকেন,লোকে ওকে মহান ভেবে খুব ভক্তিশ্রদ্ধা করে তাহলে এখনো মানব চরিত্র চিনতে আপনার বাকি আছে
-মেয়েছেলের বাড়
-বারফুট্টাই
-দেখানেপনা
এসবই ওর জন‍্য বাছা বিশেষণ।আবার এরাই ফুলির সব রকম দাতব‍্যতে সবার আগে গিয়ে লাইনে দাঁড়ায়।ফুলির সব জানা কারণ এ জগতেই তো ওর বড় হয়েছে।এই এলাকার মানুষের মনের গলিখুঁজি ,পুঁতিগন্ধময় কোণের খবর ও যে জানে ভালোমত।

ও বিখ‍্যাত হতে চায় না,বড় হতে চায় না,সংসার পাততে চায় না,মা হতে চায় না।ও শুধু ছুটে চলতে চায় এক ব‍্যস্ততা থেকে অন‍্য ব‍্যস্ততায় ,এক কাজ থেকে অন‍্য কাজে,এক ব‍্যবসা থেকে অন‍্য ব‍্যবসায়।এই ছুটে চলা,এই অস্থিরতাতেই যেন ওর আনন্দ।ওর।ভেতরে কি যেন আছে যা ওকে ছুটিয়ে নিয়ে বেড়ায় কলুর বলদের মত,যার হাত থেকে ওর নিস্তার নেই কোনোমতেই।

©®

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top