Shampa Saha

#ফুলি_পর্ব_১৭
#শম্পা_সাহা

না,সৈকত বিথীকার মত সংসারী হতে পারেনি, পারেনি সব ভুলে যেতে।সেই এক সন্ধ‍্যা বেলার স্মৃতি, সেই কিশোর বয়সের আসন্ন বিরহ কল্পনা করে যে আকুলতা সেই আকুলতায় একে অপরকে পান করার যে তৃষ্ণা, একে অপরে ডুবে যাওয়ার যে ইচ্ছা,একে অপরে অবগাহনের যে সুখ,যে তৃপ্তি, প্রথম সদ‍্য পার করা কৈশোর আর আগত যৌবনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যে অমৃতের স্বাদ সেই ক্ষ‍্যাপা,দাপুটে, নির্ভিক, প্রানচঞ্চল সৈকত পেয়েছিল সে স্বাদ তো সৈকত কখনো ভোলেইনি যে ওকে নতুন করে মনে করতে হবে।সেই স্পর্শ, সেই নরম ওষ্ঠাধর,সেই লাজুক,ভীরু,কাতর ,ভেজা চোখ বিথী,সৈকতের বিথী যে, নিজেকে খোদাই করে দিয়েছে।সে তো বালির চরে লেখা নয় যে হঠাৎ ঢেউ এসে তাকে মুছে দেবে সহজে।এ তো ভাস্কর্য।এ যে মোছা যায় না মোটে।সৈকত রয়ে গেল একাই।সৈনিকের জীবন শেষে তার গন্তব‍্য হবে মাউন্ট আবু।যেখানে এক আশ্রমে আর্তের সেবায় কাটিয়ে দেবে বাকি জীবন।

না যা ভাবা যায় তা সব সময় যে সবাই হতে দেয় এমন নয়।সৈকতের বাড়ির থেকে বিয়ের জন‍্য রীতিমতো চাপ দেওয়া শুরু হল
-আমার মরা মুখ দেখবি
সৈকতের মায়ের এ হেন কড়া দিব‍্যিতে সৈকতের সোজা জবাব
-মরবে তো একদিন সবাই।তা তুমি না হয় আগেই মরলে
-ওই মেয়ে নিজে তো সুখী হল।তুই কেন এভাবে কষ্ট পাবি
-সবার সুখ যে এক নয় মা
-কিন্তু ও তো বিয়ে করেছে
-সেটা ওর খুশি
-তুই কিসের আশায় আছিস
-আমি কিছুর আশায় নেই।সবাই তো এক ভাবে ভালোবাসে না।ও তখন আমাকে ভালো বাসতো ,এখন বাসে না ।তাবলে কি আমিও আর ওকে ভালোবাসবো না?আমার ভালোবাসা কি ওর মুখাপেক্ষী?
-এ সব সিনেমায় মানায়
-ধরে নাও আমার জীবন থেকেই না হয় আরেকটা সিনেমা হল

রাগে গজগজ করেন সৈকতের মা।
-বয়স হলেও যে মানুষ গোঁয়ারতুমি তে একই রকম রয়ে যায় তা কে জানতো?এতখানি বয়স হলো ,তবু যদি বোধবুদ্ধি হয়!সবই আমার পোড়া কপাল!ছেলের এই স্বেচ্ছাবৈরাগ‍্যে নিজেকে দোষী করা ছাড়া আর কিই বা করার ছিল সৈকতের মায়ের!

সৈকত গোঁয়ার, সৈকত একগুঁয়ে, সৈকত যা ভালো বোঝে নিজে তাই করে,নিজের মতামত ভাবনাচিন্তার কাছে অন‍্যের ভাবনার কোনো মূল‍্য নেই।এ ভুল না ঠিক তা নিয়ে হয়তো অনেকে অনেক বিচার বিবেচনা করবে কিন্তু মানব চরিত্র কি আর জ‍্যামিতিক রেখা যে সব একেবারে খাপেখাপ মাপেমাপ হবে!সবাই কি আর সব কিছু যুক্তি বুদ্ধি দিয়ে বিচার করে?কিছু কিছু পাগল এখনো পৃথিবীতে আছে যারা মস্তিষ্ক নয় হৃদয় দিয়েই মাপে পৃথিবীকে,হৃদয় দিয়েই বিচার করে।সৈকত একজন সেই ধাঁচের মানুষ।যুদ্ধক্ষেত্রে সে দুর্দম সৈনিক কিন্তু প্রেমের সামনে শিশুর মত অসহায়, অবোধ! যার কাঙ্খিত বস্তুটি ছাড়া কিছুতেই মন ওঠে না।

এত বাস্তববাদী সৈকত,এত বুদ্ধিমান সৈকত এত লড়াকু সৈকত স্পপ্ন দেখে পর জন্মের।এ জন্মে না হোক পরের জন্মে ও নিশ্চয়ই বিথীকে ,ওর করে পাবে।তখন না হয় এসব ভুল বোঝাবুঝি মিটে যাবে।জানি এ কথা বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে হাস‍্যকর।তবু কেউ কেউ তো থাকেই যারা সব সময় স্রোতের বিপরীতে চলতে ভালোবাসে।
-ভালোবাসা একবারই হয়।
এ যে সৈকতের বিশ্বাস।ওই একগুঁয়ে ছেলের বিশ্বাস টলাবে কে?

সৈকত বিথীকাকে দোষ দেয় না।বিথীকার দোষ ধরতেই তো ও শেখেনি।তাছাড়া বিথীকা যে সে সময় যে ওই অবস্থার মধ‍্যে দিয়ে যাচ্ছে তা যেমন সৈকত জানতো না তেমনি বিথীকা ও জানতো না যে সৈকত চাকরি পাবার পর,ট্রেনিং এর পরের প্রথম ছুটিতে ওর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল।বিথীকা সৈকত কে ভুল বুঝেছে।এক ষোলো সতেরোর মেয়ে হঠাৎ গর্ভবতী, যার জন‍্য ওর সমগ্ৰ জীবন উল্টোধারায় বইতে শুরু করেছিল,যেখান থেকে বেরোনো সহজ ছিল না তার দায় একা বইতে বইতে সৈকতের প্রতি হয়তো অকারণ এক ঘৃণা এসে জড়ো হয়েছিল ওর মনে
-কৈ সৈকত তো এলো না?
-আমি যে এত কষ্ট পাচ্ছি কই সৈকতকে তো পেতে হচ্ছে না!

আবেগ অভিমান অভিযোগ বড় বিষম বস্তু।সব সময় মন যে যুক্তি বুঝতে চায় না ,তর্কের প্রতিটা বক্তব‍্য যে সবাই মেনে নেবে এমন ও নয়।আর সবার ভাবনা যে এ ই খাতে বইবে এ ভেবে নেওয়ার ও কোনো কারণ নেই।বিশাল এ পৃথিবীতে বিচিত্র মানুষের মন বিচিত্র তাদের গতিপ্রকৃতি।

তাই যে কারণ বিথীকা সৈকতকে দোষী করলো ,সেই একই কারণে সৈকত বসে রইল আজীবন ।সৈকতের মত মানুষদের জন‍্যই বোধহয় পৃথিবী এত যান্ত্রিক হয়েও সুকুমার প্রবৃত্তিগুলি আজ ও মরে যায়নি, মানুষ আজও প্রেমে পরে ,বেহিসেবি ঘর বাঁধে,ভালোবাসে,ভালোবেসে কষ্ট পায়।

©®

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top