Shampa Saha

#আমবুড়ো_পর্ব_৯
#শম্পা_সাহা

ধীরে ধীরে বুড়ি লক্ষ্মী সবার বিয়ে হয়ে গেল। শেফালী মামীর মূল উদ্দেশ্য ছিল ঘাড় থেকে নামানো। যদি বিয়ে না দিয়ে মেয়েদের আজীবন বাড়িতে রাখা যেত তাতে অবশ্য মামীরই ভালো,বেশ রোজগার হতো! কিন্তু ওই আট ফুট বাই আট ফুটের ঘরে ছজনে কষ্ট হয়! তাছাড়া সমাজ আছে, পাড়ার লোক কি বলবে? তারপর আবার ভয়,
-অজাত কুজাত বা অন্য ধর্মের ছেলে ছোকড়ার সঙ্গে যদি পালায়?
-গরিব হতে পারি কিন্তু সম্মান তো আছে!

এই ভাবনা নিয়ে সতেরোর বুড়ির বিয়ে হয়ে গেল সাঁইত্রিশের কানাইয়ের সঙ্গে। বাড়ি মেদিনীপুর না কোথায়? এখানে কার একটা বাড়িতে বাজার-টাজার করে, ফাইফরমাশ খাটে।

বিয়ে ঠিক হয়ে গেল এক কথায়। কারণ লোকজন বলতে শুরু করেছে
-কিগো বুড়ির বিয়ে দেবে না? বয়স তো হলো!

তার ওপরে আবার বুড়ির মাথার চুল বেশ পাতলা! মাথায় তেল দিলে সাদা চামড়া দেখা যায় স্পষ্ট। তাই চুল রুক্ষ করেই রাখে।” ভিট কপালি, দাঁত উচু” এখন এই বয়সের “ধকে” যদি বাজারে চলে যায় তো সেই মঙ্গল! এ বয়সটা চলে গেলে সেটাও তো থাকবেনা আর।

কারখানাতে কাজই বা কতদিন করবে? যত বদমাইশ ছোকরাদের আড্ডা !

শেফালী মামী বিকেলে জল তুলে, ঘর বারান্দা মুছে, পরিষ্কার বারান্দায় বসে
মশা মারতে মারতে আর পায়ের একজিমা চুলকাতে চুলকাতে এ নিয়ে আশাদির মা, বেবিদির মা, পেয়ারি মাসী, সন্তোষী এদের সঙ্গে আলোচনা করে।

বেবিদির মায়ের বদান‍্যতায় এই জামাই খুঁজে পাওয়া গেছে ।হোক বয়সে বড়,বিয়ে তো হচ্ছে! এক শুভলগ্নে বাড়ির সামনে ম‍্যারাপ বেঁধে, ছোট একটা ত্রিপল টাঙিয়ে, বুড়ির আইবুড়ি নাম ঘুচলো।

একটা তো গেল, আর বাকি লক্ষ্মী! এই গলার কাঁটাটা না নামলে তো আর সোনারপুরের জমিতে বাড়ি করা যাচ্ছে না?এদিকে খাটের তলায় লোহার তালা দেওয়া ট্রাংকে যে টাকাটা জমেছে এই ঝামেলা মেটাতে তারও কতটা খরচ হবে, তা মামা মামীর কেউই আন্দাজ করতে পারছে না ।যদিও আমবুড়োর এখানে কোনো বক্তব্য বা ভূমিকা নেই। কারণ ও যে আবলদা।

একজন আক্ষরিক অর্থে ঘাড় থেকে নেমে গেলে দ্বিতীয়জন লক্ষ‍্য।লক্ষ্মী, সে যদিও তখনও সবুজ স্কার্ট-ব্লাউস ওদের বাসায় “এসকাট বেলাউজ” পরে গ্লাস ফ্যাক্টরিতে যায় ।গ্লাস ফ্যাক্টরি মানে যেখানে মেশিনের হাতলে চাপ দিয়ে কাগজের গ্লাস তৈরি হয়।

লক্ষ্মীর বেশ লম্বা চুল, ছোটখাটো চেহারা। কিন্তু ওই যে যাকে বলে বয়সের চটক্। তাতে আকৃষ্ট হয়ে ফুলের চারিধারে যেমন মৌমাছি ঘুরে বেড়ায় বা পচা খাবারে মাছির ভ্যান ভ্যান !তেমনি ওই কারখানার এবং পাড়ার অনেকেরই নেক নজর পড়ল ওর ওপর ।টিপের পাতা, নেলপালিশ, দু- টাকার ফুচকা, একটা নারকেল আইসক্রিম দিয়ে অনেকেই তাদের মনের অবস্থা জাহির করতে লাগলো।আর বুদ্ধিমতী লক্ষ্মী সবার কাছ থেকেই সবটা উপহার হিসেবে নিয়ে
-না বাবা না, বাবা মা বকবে! দাদা মারবে !
এসব বলে এড়িয়ে যেতে লাগল রোজ।
ভাবখানা এই
– তোমাকে জীবন দিয়ে ভালবাসি, কিন্তু পারছিনা পারিপার্শ্বিকের জন্য!

আসলে গরিব মানুষ এভাবেই তো বাঁচতে শেখে, নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে শিখে যায়।যে বাচ্চা মেয়েটা দুপাশে আড়াআড়ি বাঁধা বাঁশের মাঝে দড়িতে, হাতে আর একটা বাঁশ নিয়ে হেঁটে যায় ,তার কাছে যেমন ব্যালেন্সটা ঠিক রাখা জরুরি ,তেমনি গরিব হতদরিদ্র মানুষগুলো ঠিক এভাবেই ব্যালেন্সের খেলা খেলতে খেলতে, যেন দারিদ্র‍্য, না পাওয়া, অভাবকেও ফাঁকি দিতে শিখে যায়! সব বড়লোকেদের প্রাপ্য জিনিসের ভাগ নিজেরাও জোগাড় করে নেয়, ভাগ্যকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে!

আসলে ওদের বাড়ির একেবারে গেটের কাছে যে ঘর তাদের ছোট মেয়ে ননীদি। দেখতে অপূর্ব সুন্দরী! শোনা যায় ওদের বাবা-মা বাংলাদেশ থেকে এসে এখানে আস্তানা গারে। ওদের সবার চেহারা দেখে সহজেই বোঝা যায় বনেদিয়ানার ছাপ স্পষ্ট! তারা যখন সব হারিয়ে এক কাপড়ে চলে আসতে বাধ্য হয়েছে, সেখানে আসার সময় নিজেদের মান-মর্যাদা, আত্মসম্মান, পারিবারিক ঐতিহ্য, লজ্জা সব কিছু একেবারেই ছেড়ে এসেছে।

তাই ননীদি তার সৌন্দর্য বিকিরণ করে নেলপালিশ, ওড়নাটা, পায়ের চুটকি, রূপোর মল সহজেই তার গুণমুগ্ধদের থেকে জোগাড় করত। এবং দিদির বর মানে সরকারি চাকরি করা জামাইবাবুর থেকে, যার সঙ্গে দিদির বিয়ে শুধুমাত্র রূপের জোরে হয় তার সঙ্গে একটু বেশি অন্তরঙ্গতা দেখিয়ে শ‍্যালিকার চেয়ে একটু বেশিই সুবিধা আদায় করত।

গুণমুগ্ধ বা জামাই বাবু , কেউ যদি মুখ ছাড়িয়ে একটু নিচে নামতে চাইতো , সঙ্গে সঙ্গে
-দাদা বকবে
-দাদা দেখে ফেলেছে
বলে পাঁকাল মাছের মতো পিছলে যেত ।

লক্ষ্মীও সেটা শিখে নিলো খুব সুন্দর করে। তাই ওর উপহার জমতে থাকলেও বিপদে পড়ার সম্ভাবনা প্রায় ছিল না বললেই চলে।

যেহেতু লক্ষ্মীই বাড়ি তৈরীর পথে একমাত্র বাধা বলে সবাই মনে করলো,বিশেষ করে বড়দা হারু, যার নাম হারাধন। তখন লক্ষ্মীর জন্য সুপাত্রের খোঁজ শুরু হলো আর চট করে পাওয়াও গেল। বুড়ির বিয়ের দুবছর যেতে না যেতেই আবার বিয়ের তোরজোড়। মেয়ে তখন প্রায় সতেরো আর জামাই বছর উনচল্লিশের খোকন ।

হোক একটু বেশি বয়স কিন্তু বড় জামাই এর মতন বাড়ি ভাড়ায় থাকে না বা কারো বাড়ি কাজ করে না। রীতিমত পাতা চাকরি,কারখানায়! আবার “পেজা” মানে পেজার ও আছে !যেদিন মেয়ে দেখতে এসেছিল সেদিন বিপ্ বিপ্ করে বাজছিল।

সবাই মিলে দল বেঁধে দিয়ে দিলো আরো একটা বলি, থুড়ি বিয়ে। লক্ষ্মী ওর লম্বা চুল ,মোহমুগ্ধদের দেওয়া উপহার আর অপ্রাপ্ত যৌবন ও অনেকখানি ভয় নিয়ে চলে গেল শ্বশুরবাড়ি ।

এই খোকনের আবার নিজের বাড়ি সন্তোষপুর! সবাই বলাবলি করতে লাগল
– লক্ষ্মীর কি ভালো কপাল?
– কি সুন্দর বর পেয়েছে! হোকনা বয়স বেশি!নিজের “পেজা” আছে !আবার নিজের বাড়ি!

লক্ষ্মী বারো ঘর এক উঠোন এর হাতে গোনা ভাগ্যবতীদের একজন হয়ে গেল ।কেউ জানলো না একটা ষোলো সতেরো বছরের কিশোরীর কিভাবে একজন ঊণচল্লিশ বছরের পুরুষ কে মেনে নেবে শরীরে ও মনে!

ক্রমশ….

©®

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top