Shampa Saha

#আমবুড়ো_পর্ব_২০
#শম্পা_সাহা

বউ এর চেহারা দেখে লোকজন যত না আমবুড়োর সমব্যথী হলো তার চেয়ে অনেক বেশি দুঃখ প্রকাশ করল শেফালী মামীর জন্য ।
-সত্যি বাবা শাকচুন্নির মত বউ,কে ঘরে তুলবে ?

কিন্তু পৃথিবীতে এখনও সব ভালো শেষ হয়ে যায়নি, এখনো সব মানুষের মন আলকাতরার মত কালো আর হেমলকের মত বিষাক্ত হয়ে যায়নি,এখনো শুভবুদ্ধি বেঁচে আছে সমাজের আনাচে-কানাচে !হয়তো সংখ্যাটা আগের চেয়ে অনেক কম কিন্তু একেবারেই নেই তা বলা যায় না এবং সেটাই আশার কথা।
-আরে বৌমা, এসব কোরো না। কি করছো? বয়স্হ ছেলে তাছাড়া বিয়ে যখন করে ফেলেছে
-থাক না ,থাক না।

নিতাইয়ের দাদুকে এগিয়ে আসতে দেখে আরো দুই একজন এগিয়ে এলো সান্তনা দেবার ভঙ্গিতে ।
-যাও যাও আমবুড়োর মা ,ছেলে বউ বরণ করে ঘরে তোল
কেউ কেউ ফুট কাটে
-এরকম করে কেউ এত বড় ছেলের গায়ে হাত তোলে?ছেলে যদি বউ নিয়ে চলে যায় !

তাইতো! এটাতো রাগের মাথায় মনে ছিলনা! -আগেরবার বউ পছন্দ করে দিয়েছিল সবাই মিলে তবে এবার তো বুড়ো নিজের পছন্দে বৌ এনেছে। নিশ্চয়ই লটরঘটর ছিল !না হলে কি আর ঢক করে বিয়ে করে বসে!

এখন যদি বলে ছেলে ঘরে তুলবো না তবে ছেলে যদি মা বাবা ছেড়ে বৌয়ের হাত ধরে হাঁটা দেয়!এতক্ষণে বিচার বুদ্ধি খোলে মামীর। হাতের ঝাঁটাটা ফেলে সঙ্গে সঙ্গে আঁচলে চোখ ঢাকে
– বুড়ো ,বুড়ো রে…শেষ বয়সে তুই কি দেখালি? তুই যদি বিয়ে করতে চাইতি তো, আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে দিতাম বাবা ।আমরা কি তোর পর?

মনে আগ্নেয়গিরির লাভা স্রোত , কিন্তু চোখে শ্রাবনের বারিধারা !মায়ের চোখের জল পাড়া-প্রতিবেশী মন ভিজিয়ে তুললো। আমবুড়োর মনে এতক্ষণ যেটুকু বিরূপ মনোভাব জন্মেছিল তা ধুয়ে মুছেএকেবারে সাফ্।

সত্যিই তো,ও কত বড় অন্যায় করে ফেলেছে!
– মা, মাগো, আমাকে মাফ করো মা ,তোমার পায়ে পড়ি

বেশ একটা যাত্রাপালার অন্তিম দৃশ্য অভিনীত হচ্ছে। ছেলের বউও বরের দেখাদেখি আশ্রয় নিল শাশুড়ির পদতলে ।অতঃপর দুঃখে কাতর মামীর হঠাৎই বুকটা ধরফর করতে লাগলো ।কোন রকমে শাড়িটা ছেড়ে পরিষ্কার শাড়ি পড়ে মামী বিছানা নিল।

দূর ! ঝাঁটা ধরেছে যে শাড়ি পরে তা পরে তো আর ঘরে ঢোকা যায় না! আমবুড়োর দ্বিতীয় বৌ।বাসন্তীর গৃহপ্রবেশ হল কোনো রকম বরণটরণ ছাড়াই।

কিছু উৎসাহী পাড়া-প্রতিবেশী বরণটা অন্তত করতে চেয়েছিল কিন্তু বাকিরা শেফালী মামীকে ভালই চেনে। তাই উৎসাহীদের গুড়ে বালি চাপা দিয়ে,সবাই হাঁটা দিল যার যার ঘরে ।তবে এই আশা নিয়ে ফিরলো যে এরপর বেশ কিছুদিন শাশুড়ি বৌমার রগরগে যাত্রাপালা দেখা যাবে।

এরপর একদিন লোকদেখানো অনুষ্ঠান, খাওয়া-দাওয়া হলো! তাতে জনা তিরিশেক লোকের নেমন্তন্ন ছিল ।

সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে বন্ধ ঘরে শান্তি মামা,মামীকে দিলেন আচ্ছা করে বকা! সেই জীবনে প্রথম বোধহয় শেফালী মামী নিজের কানকে কাজে লাগাচ্ছিল জিভকে বিশ্রাম দিয়ে।তা না হলে তো এযাবৎকাল
-ওলাউটো! মর!মর!
ওনার বিশ্বব্যাপী সবার জন্য ব্যবহৃত বক্তব্য! কিন্তু আজ আর মামীর মুখে কথা সরছিল না ।সত্যিই তো! কী ভুলটাই না করে ফেলছিল! একে গোঁয়ার গোবিন্দ মাথামোটা ছেলে! তায় আবার নিজে পছন্দ করে এক মরা কাঠ,কাল পেত্নীকে বউ করে এনেছে। যদি রাগের মাথায় বেরিয়ে যায়,তাহলে? সব ফুটুনি তখনই বের হয়ে যেত !তাই চুপসে যাওয়া বেলুনের মত মামী শুনতে লাগল শান্তি মামার বচন।
– কইতাছি, হ্যাঁগো হারুর মা, তোমার কি জীবনে বুদ্ধি হইবো না? এখন যদি আমাগো বুড়ো রাগ কইরা কোথাও চইল্যা যাইতো, তা হইলে ?

রাতের নিভৃত শলাপরামর্শে,স্বামী-স্ত্রী একেবারে নিজস্ব মনের দরজা হাট করে আলোচনা করতে লাগল। আজ জীবনে প্রথমবার শান্তি মামা কানের বদলে জিভকে কাজে লাগানোর সুযোগ পেয়েছে। আর কি ছাড়ে?

কিন্তু কদিন বাদে দেখা গেল আরেক মুশকিল! ছেলে তো আর কাজে যেতে চায়না! এমন কি বাড়ীর বাইরে পা পর্যন্ত রাখতে চায় না সহজে। সারাদিন বউয়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘর গোছাচ্ছে, বাসন মাজছে, রান্না ঘরে বউয়ের হাতে হাতে সবজি কেটে দিচ্ছে, জামাকাপড় ভাঁজ করছে। কান্ড দেখে পাড়ার লোক মুখ টিপে হাসে, নতুন বউ লজ্জায় ফিসফিস করে বলে
-কাজে যাও
কিন্তু কে শোনে কার কথা!
– তুমি না গেলে আমিও যাব না
-মানে?

মামী আড়িপেতে প্রতিদিনই শোনে ছেলে বৌয়ের কথা। শুনে মামীর রক্ত ফুটতে থাকে টগবগ করে!না,না, রসালাপ শোনার কোনো ইচ্ছেই মামীর নেই। কারণ ছেলের দৌড় মায়ের ভালই জানা।

– ছেলেটা বলদা! কিন্তু হাভাতে হাঘরে ভিখিরির মেয়েটা, আবাগির বেটি! মর!মর!ওলাউটো হোক!

শেফালী মামি অবলীলায় মনে মনে ছেলে আর ছেলের বউ কে গালাগাল দিতে থাকে! আর ছেলেকে বাজারে পাঠিয়ে ছেলের অবিবেচক কাজের শোধ তোলে সোচ্চারে ছেলের বৌকে গালিগালাজ শাপ-শাপান্ত করে।

ভুলে যায় যে আজ নিজে লোককে হাভাতে,হাঘরে বলছে ।একদিন নিজেদের অবস্থা এর চেয়ে খারাপ বই ভাল ছিল না।কিন্তু এ তো আজন্মকালের রীতি! মেয়েরা যেন তৈরিই হয়ে থাকে, বিশেষ করে ওইসব ঘরের মেয়েরা ,যারা জানে একটু বড় হলেই পরের ঘরে যেতে হবে, লাথি-ঝাঁটা খেতে হবে।তারাই পরম্পরাগত ভাবে এক নোংরা অভ্যাসকে টেনে নিয়ে যায় ঐতিহ্যের মত!

শাশুড়ি শেফালী মামী আর বৌমা বাসন্তীর মধ্যেও সম্পর্কটা গিয়ে দাঁড়ালো সেই একই জায়গায়, বিদ্বেষের ।সে বিদ্বেষের যে কি কারণ বা আদৌ কোনো কারণ আছে কিনা তা কেউ জানে না !এই ভাব, যেন ছেলের বউকে গাল দিতে হয় তাই দেওয়া।

বাসন্তী আসাতে ওকে দিয়েই রাজ্যের কাজ করানো যায় ।এমনকি বৌভাতের নামে যে জনা তিরিশেক নেমন্তন্ন ছিল তার রান্নাও ওই কালো, রোগা, অপুষ্টিতে ভোগা মেয়েটা করেছে প্রায় একা হাতেই।এবং ওদের বাপের বাড়ির কাউকে এক বারও খবর দেবার কথা কারো মনেই আসেনি।

আমবুড়োর না হয় সামাজিক বুদ্ধি নেই, তাই ওর কথা বাদ !কিন্তু ওর বাবা-মা? ওদের মাথায় যে কথাটা আসেনি তা নয়! বরং ইচ্ছে করে যেন ভুলে গেছে !আর বাসন্তী পারেনি মুখ ফুটে কথাটা বলতে।

আহারে ,ভাই বোনরা আসলে তাও তো দুটো ভালো মন্দ খেতে পেত! কিন্তু সে কথা মুখ ফুটে ওর মত মুখচোরা মেয়ে বলেনি ।মুখ খুলবে কি বরং এই অনধিকার অনুপ্রবেশ আর নিজের চেহারা নিয়ে ও যে সদাই সংকুচিত!

ক্রমশ…
©®

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *