Shampa Saha

#ফুলি_পর্ব_৬
#শম্পা_সাহা

এক অসম লড়াই,এক আকাশ কুসুম কল্পনা, এক অভাবনীয় প্রতিযোগিতায় নামল ফুলি।যে সম্ভাবনার কথা কখনো ফুলি কেন এই খালপাড় বস্তির অনেকেই কল্পনা করতে পারে না,আপাত দৃষ্টিতে যা ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্নের মতোই মনে হয় সেই স্বপ্নের জাল ধীরে ধীরে বুনতে থাকে মা বাবার পরিচয় হীন এক বারো তেরো বছরের সদ‍্য কিশোরী ফুলটুসি দলুই।

ফুলি পড়ে,ফুলি পড়াশোনা করে।লুকিয়ে চুরিয়ে,জেঠি ঘুম থেকে ওঠার আগে,যখন খবরের কাগজ দেবে বলে পাশের ঘরের দেবুদা তার ভাঙা লজঝড় সাইকেল নিয়ে কাগজ আনতে শেয়ালদা স্টেশনে যায়,চুপিচুপি ফুলিও উঠে পড়ে।দাঁত মুখ ধোয়া পরে,আগে বই খুলে বসে।প্রথমে বই গুলোকে বুক ভরে আদর ,যেন ওরাই ওর পরম আপনার জন।তার পর হাতের লেখা মকসো,আর সেরিডেবির মাষ্টারের দেওয়া কাজ।

দোকানে যাবার সময় এক ফাঁকে ওর হাতে দিয়ে যাবে খাতাখানা।আর সন্ধ‍্যাবেলা মাষ্টার ওটা দেখে দেবে নতুন কাজ।তবে সবই খুব গোপনে।কাক পক্ষীতেও যেন টের না পায়।কারণ জেঠির কাছে যেমন
-এসব পড়াশুনো টরাশুনো ফুটুনি!
তেমনি সেরিডেবির বাবার কাছে
-আমি পয়সা দিয়ে মাষ্টার রাখবো আর ও পড়বে ওটি হবে না।

অর্থাৎ শিক্ষা মহৎ গুণ বলে আমরা যতই প্রকাশ‍্যে প্রশংসা করি,স্বার্থপরতার উর্ধ্বে উঠতে কেউই পারি না।তাই ফোকটে মেয়ের মাষ্টারের কাছে ফুলির এই একটু আধটু পড়াশোনাটাও সেরিডেবির বাবার অসহ‍্য ছিল।যদিও ওর মা রত্নার বড় মায়া
-আহা,বেচারি মা বাপ ছাড়া ,অনাথ।তিন কুলে কেউ নেই।মুখখানাও কেমন মায়া মায়া!
-তোমার বড়লোকী বন্ধ কর তো।আমি পয়সা দিয়ে মরবো আর উনি পড়বেন।অতই যদি পড়ার ইচ্ছে,তো পেয়ারের জেঠিকে বললেই পারিস।চায়ের দোকানে তো জলের পয়সা সব।কিছু খসলে আর মরে যাবে না
-কি যে বল?দেখো না ,কেমন খাটায় ।সেই কচি অবস্থা থেকেই হাড় মাসি কালিয়ে খাটায়
-তোর অত দরদ কিসে রে?

সেরিডেবির মা,আটা মাখতে মাখতে চমকে ওঠে।বুঝে পায় না,ফুলি একটু আধটু দেখলে কি এমন ক্ষতি।এতো খাবার নয় যে ফুরিয়ে যাবে।কিন্তু সেরিডেবির বাপ জুরান জ্বলছ অন্য জ্বালায়!মাষ্টার বলে,ফুলি পড়লে ফার্স্ট হতে পারতো।আর শ্রীদেবী মোটামুটি।এইটাই জুরানের অসহ‍্য!

কিন্তু রত্নার মায়ের মমত্ব মাখা মন এত নিচ হতে পারে না।সবথেকে বড় কথা, ওইটুকুনি মেয়ে,মা বাপ কেউ নেই কিন্তু তাও কি ভালো।একটা খারাপ কথা বলেনা,কোনো দুষ্টুমি নেই, এমনকি হাতে করে কিছু দিলেও খায়না।আর চেহারা খানা!অত লাথি ঝাঁটা খেয়েও যেন সরল,মন কাড়া।আর তাদের নিজেদের বাচ্চা গুলো।কেমন কালোকোলো।যতই শেখাও পড়াও সেই ঝগড়া, গালাগাল, ওই বছর বারোর বল্টা মানে বল্টু এই ওর মেয়ের ই বয়সী কিন্তু বিড়ি ধরছে সেই কবে!রত্না জানেনা নাকি।এমনকি কোন খারাপ কথা শুনলে ফুলি মুখ নিচুকরে সরে যায় কিন্তু তার নিজের মেয়ে শ্রীদেবী, হা করে সব গিলবে।

-দেখো ও নিশ্চয়ই কোনো ভদ্দর লোকের মেয়ে
-হ‍্যাঁ… ভদ্দরলোক না ছাই।তাহলে আর এই কিত্তি করে মেয়ে ফেলে রেখে যায়?
-তা বটে
দীর্ঘশ্বাস পড়ে রত্নার।এ যুক্তি সে কাটবে কোন যুক্তিতে?সদ‍্য হওয়া বাচ্চাকে নিশ্চয়ই বৈধ বাচ্চা হলে কোন মা ফেলে রেখে যায় না!তাহলে…তাহলে যা দাঁড়ায়, ফুলি যতই সুন্দর হোক, যতই ভদ্রসভ‍্য হোক,যতই পড়াশোনা ভিলোবাসুক তার বংশপরিচয় যে মোটেও ভালো না তাই তার সঙ্গে নিজের মেয়ের মেলামেশা যে ঠিক না এটা জুরান রত্নাকে বোঝাতে পারে।

যতই তারা খালপাড় বস্তিতে থাকুক তাদের সন্তানের জন্মে শুধুই আদিম পাশবিক চাহিদা নয় সামাজিক স্বীকৃতি ও আছে।কিন্তু ফুলি তো ফুলি!যার জন্ম ই হয়েছে শুধুমাত্র শারীরিক চাহিদা মেটানোর ফাঁকে।যাকে কেউ চায় না।তাই ফুলির অজানা জন্ম ইতিহাস তাকে ব্রাত‍্য করে তোলে এই খালপাড় বস্তির সামাজিক তুল‍্যমুল‍্যতায় ও।

©®

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top