Shampa Saha

#ফুলি_পর্ব_৭
#শম্পা_সাহা

ধীরে সকলের অজান্তেই ফুলি তিলতিল করে তার মনের ইচ্ছে কে লালন করতে থাকে।না জেঠি জানে না!জানবে কি করে ওর যা পড়াশোনা জেঠি ঘুম থেকে ওঠার আগে আর দুপুরে চান করতে খেতে আসার ফাঁকে ফাঁকে আর বিকেলে যখন মাঝে মাঝে শ্রীদেবীর মাষ্টারের কাছে যাবার সুযোগ পায়।

ও নিজেও জানে,স্কুলে যাওয়া,পাশ দেওয়া এসব ওর হবে না কোনো কালেই তবু বইয়ের এক একটা শব্দ বানান করে যখন ওর পড়ার আর দরকার হয় না,এক বারেই ও পড়ে ফেলে গোটা একটা শব্দ,গড়গড় করে পড়তে পারে গোটা একটা লাইন,ইংরেজিতে নিজের নাম লিখতে পারে,একটা দুটো করে ইংরেজি শব্দ,পোষ্টারের ইংরেজি লেখা পড়ে বুঝতে পারে বা জেঠির দোকানে পাঁচ জন খরিদ্দারের পয়সা একবারে নেবার সময়ই মুখে মুখে যোগ করে ফেলে,একটা ডিম পাঁউরুটি,তিনটে চা,ছটা বিস্কুট আর দুটো ডিমসেদ্ধর দাম কত তার জন‍্য আর জেঠিকে জিজ্ঞাসা করতে হয় না ,ফুলি শিহরিত হয়,তৃপ্ত হয়।আত্মতৃপ্তির মত আর কোনো বৃহৎ সুখ ফুলির ঝুলিতেই নেই!

বাসন্তীর অবশ‍্য সেদিকে হুঁশ নেই।অত মাথা ঘামালে তার চলে না।একা মেয়ে মানুষ ব‍্যবসা চালানো যে কত দুষ্কর সে যে করে সে জানে!নেহাৎ ভোলার রোয়াব আর বাসন্তীর মারকাটারি স্বভাব।না হলে ওকেও যে ফুলিকে নিয়ে হাড়কাটা গলিতে গিয়ে উঠতে হত তা ওর ভালোই জানা।

তবে আজকাল বাসন্তী বেশ সতর্ক।ফুলি সোমত্ত হচ্ছে,আশেপাশের ব‍্যাটাচ্ছেলেদের নজর যাচ্ছে বদলে।নিজের পেটের না হোক মেয়েমানুষ তো!বাসন্তী খুব ভালো জানে এই বয়সী মেয়ে মানুষ মানে এসব বস্তিতে ভাগাড়!শকুন মাথার উপর ভনভন করতেই থাকে।

শুধু কি তাই?এই মেয়েগুলো পর্যন্ত বুকের কলি ফুটলো কি না ফুটলো জুটে গেল গান গাইতে।ওই তো সেরিডেবি, সেদিন দেখি বল্টার সঙ্গে মাখনের ঘরের পিছনে।আর বল্টার হাত ব‍্যস্ত।ছুড়ি মজায় হেসে গলে পড়ছে যেন!
-মর ছুঁড়ি মর!শরীলের জ্বালা যে বড় জ্বালা।এত তাড়াতাড়ি ধরলে বুজতে দেরি লাগবেনে।
গজগজ করে বাসন্তী।

শরীরের জ্বালা তো তার নিজের ও কম নয়।ভোলা যখন মরে তখন বাসন্তী কত আর হবে ,মধ‍্য যৌবন না হলেও বিগতাও নয়।সেই থেকে রাতে একা।কত প্রলোভন, কত ভয়।রাত বিরেতে জানালায় টোকা!
-কে রে শুয়োরের বাচ্চা?
আঁশবটি হাত দাঁড়িয়েছে বাসন্তী।সে সাধারণ নারী,যার সব রকম খিদে আছে কিন্তু লোভী নয়।ভোলা যে নিজের শরীরের জ্বালা অন‍্য জায়গায় মেটাতো,এক বাসন্তী তে তার মন ভরতো না তা বাসন্তী ভালোই জানতো।এমনকি সেখানেই যে ভোলার রক্তের টান তাও তার অজানা ছিল না।তাই তো ওর কোল খালিই রইলো।কিন্তু বাসন্তী যে বড় ভালো বাসতো ওই চওড়া বুকের সাজোয়ান ব‍্যাটাচ্ছেলে ভোলাকে।তাই তো বিধবা হয়ে অবধি কাউকে ধারেকাছে আসতে দেয়নি।প্রবলা হয়েও স্বামীর সোহাগ ভাগ হয়ে যেতে দেখেও ফুঁসে ওঠেনি‌। ভালোবাসা যে ভালোবাসার মানুষটার কাছে নিজেকে বড় দুর্বল করে দেয়!

সন্ধ‍্যা বেলা আজকাল আর ফুলি দোকানে যায় না।এই শীতে ওর পনেরো পার হবে।ওই খুঁদকুড়ো গেয়েও গায়ে গতরে হয়েছে বেশ।তাই ভয়।কোনো নোংরা হাত যদি ছুঁয়ে ফেলে ওকে।তাই আজকাল ফুলি আর বারান্দায় নয় মেঝেতে শোয়, ঘরের মেঝেতে।যদিও বাসন্তী জানে ও বারান্দায় শুলেও কারো সাহস নেই ফুলির দিকে হাত বাড়ায় তবু ব‍্যাটাচ্ছেলের কি ভরসা?

সন্ধ্যা বেলায় ফুলি ঘরদোর তকতক করে,রাতের রুটি ,একটা ভাজা, শেষ করে।দোকান বন্ধ করে জেঠি রাজ‍্যের বাসন নিয়ে আসে।বিকেল বিকেল ফুলি জল তুলে রাখে রাস্তার মিউনিসিপ্যালিটির কল থেকে।সেই তোলা জলে সব সেরে নেয়।দুবেলা দোকানে উনুন ওই ধরায় ,দোকান ঝাঁটপাট ও দেয় তবে সর্বক্ষণ থাকে আর না।সব কাজ সেরে অপেক্ষা করে জেঠির সিগন‍্যালের‌।

চা ,ডিমসেদ্ধ চাপিয়ে,খরিদ্দার কে ওর হাতে প্রথম চা দিয়ে বউনি করিয়ে জেঠি তবে ছাড়ে।
-এই বাড়ি যা।রাস্তায় আবার যেন কারো সাথে লটঘট করতে বোসো না।

রোজ সকাল বিকাল দুবেলা বাসন্তীর এই সতর্কবাণী।এখন ওর মানে ফুলি ভালোই বোঝে।কিছু বলে না কোনোদিন।ফুলি ছোট থেকেই জানে,ফুলি অনাথ,ফুলি নাজায়েজ তাই ওর জায়েজ বাবা মাই যখন তাকে ফেলে রেখে গেছে কুড়ুনি করে তখন তার আর কার উপর রাগ আর ঝালই বা কার ওপর?

তবে মাঝে মাঝেই ফুলির বড় অভিমান হয় এক বোবা অভিমান।কার উপর?সেই না দেখা বাবা মায়ের উপর,যাদের জন‍্য ফুলি আজ বই পড়তে পারে না,মানুষ হতে পারে না,যাদের জন‍্য কোনো প্রতিবাদ করলেই সবাই তার জন্ম ইতিহাস টেনে নোংরা বলতে দুবার ভাবেনা।আজ যে ফুলির কাছে ওর জন্ম রহস্য পরিষ্কার।আজ যে ও নাজায়েজ মানেটা বেশ ভালো মতই জানে।তাই আজকাল কাজের ফাঁকে ফুলি যখন পড়তে বসে ,মাঝে মাঝেই অন‍্যমনস্ক হয়ে যায়,কান্না পায়,গলার কাছটা ব‍্যথা করে ওর।আগে জেঠির ওপর রাগ হত।এখন হয় না ,হয় কৃতজ্ঞতা আর রাগ ? রাগ হয় সেই অদেখা মানুষ গুলোর ওপর যাদের জন‍্য আজ ফুলি নাজায়েজ যাদের জন‍্য আজ ফুলির জন্মের ঠিক নেই!

©®

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top