Shampa Saha

#ফুলি_পর্ব_৮
#শম্পা_সাহা

জেঠির জ্বর ,দোকান এবেলা আর খোলেনি।সন্ধ‍্যাবেলায় জেঠির কথা মত দোকান ভালো করে তালা মেরে দুধের ডেকচি নিয়ে ফুলি, সঙ্গে ভুলি।বেশি দূর রাস্তা নয় মাত্র কয়েক পা।বস্তির নোংরা রাস্তা জল পড়ে কাদা কাদা,পা টিপে টিপে চলতে হয়।গিয়ে জেঠিকে আর একটু চা করে দিতে হবে।সেজন্যই আরো দোকানে আসা।বাড়িতে তো আর ওসবের চল নেই,চা টা তো দোকানেই হয় দুবেলা।একটু আদা চা খেলে সর্দি জ্বরে বেশ ভালো লাগবে।একটু তেজপাতা গোলমরিচ ও দিয়ে দেবে।

একবার ফুলির জ্বরে শ্রীদেবীর মা করে দিয়েছিল,সর্দি নাকি সঙ্গে সঙ্গে সেরে যাবে।বেশি করে চিনি দিয়ে।বেশ লেগেছিল।ফুলি দোকান পার হয়ে দোকান আর সার দেওয়া ঘরগুলোর মাঝামাঝি।ঝমঝমে বৃষ্টি, কাঁধে কোন রকমে ছাতাটা ধরে সেফটিপিন লাগানো নীল হাওয়াইটা ,টেনে টেনে হাঁটতে হচ্ছে,যা চটির ফিতে! পা তুলতে গেলেই ছিঁড়বে ফটাস!তা হলেই খাও জেঠির ঝার।তাছাড়া সে বেচারিও পাবে কোথায়?বয়স বাড়ছে কিন্তু এখন আর বাসন্তীর দোকানই একমাত্র নয়,আশেপাশে আরে গোটা চারেক চায়ের দোকান ব‍্যাঙের ছাতার মত গজিয়েছে।তাই খরিদ্দার ও কমছে আস্তে আস্তে।

আজকাল আবার মদ খেয়ে আড্ডা দেবার চল,চায়ের দোকানে একটু সন্ধ‍্যা হলেই সব মাতালদের আড্ডা হয়,মুখ খিস্তি,পানের পিক ফেলা যেখানে সেখানে।কয়েকজন তো লুকিয়ে বোতল খুলে বসতে চায়।বাসন্তীর একেবারে মানা ওসবে।ওর দোকানে চা খাও,বিড়ি সিগ্ৰেট খাও,পান খাও,দোক্তা খাও কিন্তু মদ চলবে না।

-বেটাচ্ছেলের মদ খেলে কি আর হুঁশ থাকে?মদ খেলে দুনিয়া তখন রঙিন।মা বোনের বিচার থাকে না।

তাই ওসব বাসন্তী মোটেও তার দোকানে অ্যালাও করে না তাছাড়া দরকার অদরকারে ফুলি মাঝে মাঝে যায়।মেয়েমানুষের ওপর অত‍্যাচার বাসন্তী একদম পছন্দ করে না,তাই জুরান রত্নাকে যে বার মদ খেয়ে মেরে আলু করে দিয়েছিল,বাসন্তীই তো রত্নাকে থানায় নিয়ে যাচ্ছিল।অনেক কষ্টে বাসন্তীর হাত পা ধরে ছাড়ান পায় জুরান।

আর ওই মদ।মদ বাসন্তীর দু চক্ষের বিষ।ভোলা নিজেও মেয়ে মানুষের কষ্ট দেখতে পারতো না।তাইতো একবার মদের নেশায় ওই কান্ড ঘটিয়ে ফেলে তার গুনাহগার দিয়েছে আজীবন।

সেবার হোলিতে সব ইয়ার দোস্তদের নিমন্তন্ন বড়কার ঘরে।বড়কারা বিহারী।ওরা থাকে দারাপাড়া বস্তিতে।ওদের ওখানে গিয়ে ঠান্ডাই খেয়ে তার ওপরে মদের নেশায় ওদের মেয়েটাকে বাসন্তী ভেবে সারারাত আদর করে।পরদিন সকালে হুঁশ ফিরলে বহুৎ পা ধরে কেঁদেছিল ভোলা ,লছমির ও আর বাসন্তীর ও।

সেই থেকে লছমিও ভোলার বৌ হয়ে গেল।কিন্তু লছমির জন‍্য কোনোদিন বাসন্তীকে হেলাছেদ্দা করেনি ভোলা।দুজনকেই সমান ভালোবেসেছে।এমনকি যখন জানতে পারলো লছমির বাচ্চা হবে তারপর আর বাসন্তী কে মা হতেও বলেনি।বলতো -বাসন্তী তুই তো মাই।লছমির ছেলে মন্টুর তো তুই ও মা।ও তো তোরও সন্তান,পেটের না হোক।

বাসন্তীর বড় ঘেণ্ণা নিজের ওপর,ভোলাকে আগে সন্তান না দিতে পারার জন‍্য,ভোলার ওপর ,ওর ভালোবাসার ভাগ লছমিকে দেবার জন‍্য,পুরুষ মানুষের ওপর ,যারা নেশার ঘোরের দোহাই দিয়ে বাসন্তী আর লছমিতে ফারাক করতে পারে না আর ঘেণ্ণা ওই মদের ওপর।ওই হতচ্ছাড়াই তো বাসন্তীর সব কেড়েছে।

কিন্তু বাসন্তী পারেনি ভোলাকে ছাড়তে,পারেনি লছমির ছেলের মা হয়ে উঠতে।ভোলার লোম ভর্তি চওড়া বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে বুক ভারী হয়ে এসেছে,চোখ ভিজে গেছে অজান্তেই।পুরুষ মানুষ এত বেইমান হয়!নেশার ঘোরে চিনতে কি সত‍্যিই পারে না কে বাসন্তী আর কে লছমি ! নাকি?দীর্ঘশ্বাস চুপিসারে ঘুরে বেড়ায় বাসন্তীর মনের আনাচে কানাচে।

মা হতে পারেনি বলে লছমি এত তাড়াতাড়ি ওর নিজের জায়গাটা কায়েম করতে পারলো।
-ধুর ছাই!ঝ‍্যাঁটা মারো মা হ ওয়ার মুখে।ঘেন্না! ঘেণ্ণা!আমি কারো মা হতে চাই না!কক্ষনো না!
বাসন্তী কখনো কারো মা হবে না প্রতিজ্ঞা করে।

তাড়াতাড়ি পা চালায় ফুলি।গলিতে ঢুকবার মুখে তাড়ায়
-ভুলি যাঃ।চালের তলায় যাঃ।আমি এখন ঘরে যাবো।গলিতে ঢোকবার মুখটা বেশ অন্ধকর।হঠাৎ একটা হাত জোরে খাবল মারে ফুলির বুকে।
-মা গো
চিৎকার করে মাটিতে বসে পরে ফুলি।হাতের দুধ ভর্তি ডেকচি উল্টে দুধ লম্বা লাইন দিয়ে কালোর মধ্যে সাদা দাগ কেটে এগোতে থাকে।যেন এই গলির ,এই বস্তির,নোংরা মানুষের মনের যতকিছু বিকৃত সব ধুতে ধুতে চলেছে।পবিত্র,স্বচ্ছতোয়া গঙ্গার মত।

ঘটনার আকস্মিকতায় চমকে ওঠে ফুলি,ছাতা কাঁধ থেকে নিচে পরে,একটা ডাঁটি দেওয়ালে লেগে তুবড়ে গেছে।থরথর করে কাঁপছে ফুলি
একি?কেন?কে করল? আর ওর সঙ্গেই বা কেন?
হাউমাউ করে উবু হয়ে দুই হাঁটুতে বুক চেপে কাঁদছে ফুলি।আশেপাশে ভিড় করে লোকে শুনছে -কে যেন ফুলির বুক চিপে দিয়েছে।

কেউ অবাক হচ্ছে,কেউ মুখ টিপে হাসছে,কেউ রসদ পাচ্ছে আগামী কদিনের কলতলার আলোচনার, কেউ কেউ ভেবে রাখছে কাল চায়ের দোকানে এ নিয়ে একটা ছোটখাটো গবেষণা না করলেই নয়
-ফুলির বুকে কে হাত দিয়ে গেল!

হায়রে মানুষ, বলা ভালো মানুষের মত দেখতে দুপেয়ে জীব তোমাদের কারো চোখে পড়লো না ওখানে এক বছর পনেরর কিশোরী অনাথ মেয়ে জীবনের প্রথম চরম শারীরিক ও মানসিক হেনস্থার শিকার হল।কেউ ওর মনের ক্ষত মোছবার চেষ্টা করলে না।কেউ কেউ তো সেই সৌভাগ্যবান হাতখানাকে ঈর্ষাও করল।সবাই সবটা সাজালো নিজের মত করে,ফুলিকে একেবারেই ব্রাত‍্য করেই চালালো ফুলির আলোচনা,ফুলির চরিত্রের পোস্ট মর্টেম।

©®

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top