Shampa Saha

#ফুলি_পর্ব_৯
#শম্পা_সাহা

এই বার প্রথম যেন ফুলির জগৎ বাসন্তীর চায়ের দোকান,পড়াশোনা শেখা,মানুষ হয়ে ওটা এ সবের মধ‍্যে থেকে নড়ে গেল,সরে গেল।পনেরো বছরের বস্তির মেয়ে ফুলি।যেখানে ছেলেমেয়েরা ছোট থেকেই তাদের বাবা মায়ের ঘনিষ্ঠতা কখনো সখনো দেখে,অনুভব করে তারচেয়ে অনেক বেশি।আর যতই রাখঢাক থাকুক,মুরগীর খুপড়ির মত উপচে পড়া দারিদ্র আর উপচে পড়া অগুনতি পেটের ফা‍ঁকে শরীর সারা দেয় আরেক শরীরের খিদে মেটাতে।সেখানে অত রাখঢাকের চেষ্টাও কেউ করে না তেমন আর করলেও তার কার্যকারীতা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

তাই এখানকার ছেলেমেয়েরা আদিম খিদেটাকেও জেনে যায় খুব ছোট্ট থাকতে।খেলার ছলে বর বৌ সাজতে সাজতে অনেক নিষিদ্ধ স্বাদ ও তারা পেয়ে বসে শৈশবের দোর গোড়াতেই।খেলা মানে যে গর্হিত অন‍্যায় অন্তত তাদের ওই বয়সে তা বোঝবার আগেই অভ‍্যস্ত হয়ে পড়ে নিষিদ্ধ আনন্দে।

এছাড়া ও আছে পাড়াতুতো দাদা,জেঠু কাকুদের একটু ফুচকা,বা চকলেটের বিনিময়ে ফুর্তি।নিষিদ্ধ ফুর্তি!কিন্তু তা কেউ না জানলে ততক্ষন সব চলে।তাই হারাধন খুড়ো অবলীয়া নাকে পোটা কার্তিকের প‍্যান্ট খুলে নিষিদ্ধ আনন্দ ভোগ করে।শেষে হাতে দশটা টাকা গুঁজে বলে
-কাউকে বলিসনি যেন।কাল আবার আসিস

রতন কাকা মুন্নী কে একটা চকলেট চুষতে দিয়ে কোলে বসিয়ে শুষে খায় ওর শৈশব।মুন্নী ও কাউকে বলে না।একটু ব‍্যথা ব‍্যথা লাগে তবে চকলেটটা খেতে বেশ।এভাবেই ওদের শৈশব ওদের অজান্তেই কালিমা লিপ্ত হয়।কে তার খবর রাখে?এদেশের গরীব বড় লোক ছেলে মেয়ে সকলেই কম বেশ এ অভিজ্ঞতার শিকার।

পরে ওরা হয়তো এ নিয়ে হাসাহাসি করে।এমনকি কে কত বেশি টাকা পেল আর তা দিয়ে চাউমিন খাবে না রোল তার ও জোর আলোচনা চলে।আর একটু বড় হলে ধীরে ধীরে সরে যায় অন‍্য আঁধারে।ভালো মন্দের ভাবনা যে ওরা ভাবতেই শেখেনি।মাতাল বাবা,রুগ্ন মা,বা লোকের বাড়ি কাজ করে হাড়মাস কালো করা নারী শরীরের খাবলাখাবলি প্রতিনিয়ত দেখে ওরা উচিৎ অনুচৎ ভালোমন্দ ভাবতেই শেখেনা।

হ‍্যাঁ,যদি কেউ হাতে নাতে ধরা পড়ে তাহলে গল্পটা অন‍্যরকম দাঁড়ায়।চিৎকার করে লোকজন ডেকে মেরেধরে সে এক হৈহৈরৈরৈ ব‍্যাপার।ভাবখানা এই সবাই ধোয়া তুলসী পাতা।যে তিরিশ বছরের মদন রোজ ন বছরের বুঁচকিকে নিংড়ায় সেও এসে হাতের সুখ করে নেয় এই সুযোগে।এ ছাড়া যারা।যারা সন্দেহ করতে পারতো তাদের ও দেখিয়ে দেওয়া হল সে এগুলো একদম পছন্দ করে না।আর বাচ্চারা?ওদের শৈশব তো শৈশবই ছিল না কখনো।ওরা তো শুধু বেঁচে থাকতে জানে।কোনো রকমে খাওয়া পড়া মলত‍্যাগ রমণের মাধ‍্যমে বেঁচে থাকতে।

কিন্তু ফুলির ওসব দেখা হয়নি, জানা হয়নি।বাসন্তীর একাকী জীবন দাপিয়ে কাটলেও তাতে কোনো আঁচড় কাটতে দেয়নি কাউকে।তাই ফুলির ও সম্পর্কে জ্ঞান খুবই সীমিত।আর খেলাধুলা।জেঠির দোকান সামলে সে সে সুযোগ পেলে তো!যদিও আজকাল বল্টুর হাবভাব আলাদা রকম,মদন কা তাকায় সোজা বুক ভেদ করে ,যেন ওড়নার আড়ালে ওর মাংসপিন্ডও দেখতে পাচ্ছে।কুঁজো হয়ে পালায় ফুলি।জেঠি সতর্ক করে
-এই ছুঁড়ি খবদ্দার ব‍্যাটাচ্ছেলের ধার মারাবি না।ওরা বিষ বিষ বিষ!

কিন্তু ফুলির অজানা সারল‍্য,বাসন্তীর শত সতর্কতা, এত আড়াল আবডালই বোধহয় নরমাংস খেকোদের কাছে ফুলিকে করে তোলে লোভনীয়।তাই তো বাচ্চা মেয়েটা আজ চরম হেনস্থার শিকার।

কিন্তু ও তো ফুলি।সহজে মিইয়ে যাবার মেয়ে নয়।মিইয়ে গিয়েই বা লাভ কি।
-ওলাউঠো গুলো তাল করে এইচে।জানে আজ আমি পড়েচি।ওমনি।দেখলি রে হতচ্ছাড়ি, দেখলি?জেঠি না থাকলে তোরে তো শ‍্যাল কুকুরে ছিঁড়ে খাবে।

নাকি নাকি গলায়,সর্দি বোজা স্বরে বাসন্তী চেঁচায়।ফুলি ভাতে ভাত চড়ায়।না হলে জেঠি খাবে কি?কেরোসিন স্টোভের সামনে পিঁড়ে পেতে উবু হয়ে বসে।হাঁড়িতে ভাত ফুটছে টগবগ টগবগ।ফুলি এক দৃষ্টে তাকিয়ে ওই জ্বলন্ত লেলিহান আগুনের শিখার দিকে।বাঁদিকের বুকটা বেশ টনটন করছে।ফুলি কাঁদে না,গালাগাল দেয় না,চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত ঘষে তাকিয়ে থাকে জ্বলন্ত আগুনের দিকে।হাঁড়িতে ভাত তখন ফুটেই চলেছে,ফুটেই চলেছে।

©®

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top