Shampa Saha

#ফুলি_পর্ব_১০
#শম্পা_সাহা

বিথীকা বড় ভালো মেয়ে।বাবা কলেজে ম‍্যাথসের প্রফেসর,মা ভূগোলের দিদিমণি।তখনো কলকাতা এতটা ছড়িয়ে ছিটিয়ে প্রসার লাভ করেনি। চব্বিশ পরগনাই ছিল বরং বেশি ছড়ানো।এলাকা গুলো তখনো শহরতলি।

সমরেশ বাবু বাড়ি করলেন শহরতলিতে।ছোট দোতলা বাড়ি,সামনে বাগান।বাড়িতে মাত্র চারজন,তারা স্বামী স্ত্রী, একমাত্র মেয়ে বিথীকা আর বৃদ্ধা মা।মায়ের বেশ বয়স হয়েছে।প্রপার কলকাতার চেয়ে এই এলাকাই মায়ের জন‍্য ভালো।রমা দেবী তাই কাছাকাছি স্কুলে চলে এলেন লোকজন ধরে।তখনো এস এস সি চালু হয়নি, তাই ব‍্যপারগুলো এত দীর্ঘতর ছিল না।সমরেশ বাবুর কলেজ মাত্র মিনিট চল্লিশেক বাসে।তা কলেজে আর সাইন্সে ক্লাসের তেমন চাপ কোথায়? ওটুকু বাস জার্নি অনায়াসে করা যায়

বরং বাড়ি ফিরে ফ্রেশ আবহাওয়া,সকালে তাজা বাতাস,আশেপাশের চাষীদের তাজা সবজি,মাছ।আহ।তাই ওখানে গড়ে তুললেন তাদের শান্তির নীড়, শান্তি নিবাস!তবে অসুবিধা একটাই,মেয়ের জন‍্য ভালো স্কুল পাওয়া গেল না ‌একটা স্কুল,কো-এড। তাও সমাজের সব স্তরের ছেলেমেয়েরাই পড়ে।না পাওয়া গেল তেমন বন্ধুবান্ধব।যদিও তারা দুজনে মিলেই মেয়ের পড়াশোনাটা দেখাতেন,প্রাইভেট পড়ার দরকার ছিল না।কিন্তু বাচ্চা মেয়ে মিশবে কার সঙ্গে?চারিপাশে বেশির ভাগই নিম্নবিত্ত পরিবার আর যারা আছে তারা ওই ব‍্যবসা করে উঠতি বড়লোক।হাতে হঠাৎ পয়সা হয়ে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ কিন্তু শিক্ষা দিক্ষা কালচার বলে কিছু নেই।

পূজোতে মদ খেয়ে উদ্দাম নাচ,যখন তখন বক্স বাজিয়ে ফিস্টি আর চাঁদার জুলুম।রাস্তা ঘাটে মেয়েদের দেখে টোনটিটকারি তো হরদম চলছে।মাঝে মাঝে সমরেশ বাবুর বড় খারাপ লাগে।নিজের মায়ের শান্তির জন‍্য মেয়ের ভবিষ্যৎ এর সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করলেন না তো?রমার স্কুলও তো কাছে।তবে দুজনেই চাকরি করার ফলে বিথীকা বড্ড একা ,বড্ড একা।

গোলগাল সুন্দর টকটকে রঙের বিথীকা মা বাবার চোখের মণি।আদুরে মেয়ে যেন আধখোলা চোখে পৃথিবী দেখে।ওর চোখে বাবা মায়ের ভালোবাসা আর ঠাকুমার স্নেড়ের মায়া কাজল মাখানো।বাবা মা ঠাকুমা ওকে ঘিরে রাখে সর্বক্ষণ।গান,নাচ,আঁকা আর পড়াশোনা।এ ছাড়া ও চেনে না কিছু।

আগে তবু যেখানে থাকতো কিছু বন্ধু ছিল।বাবার অফিস কলিগ পরিমল কাকুর মেয়ে পরিনীতা ওর বেস্ট ফ্রেন্ড।কিন্তু ওটা তো ভাড়ার বাড়ি তাই এখানে উঠে আসা।

একা ফাঁকা বাড়িতে মন মরা হয়ে ঘুরে বেড়ায় ও।কথা বলার কেউ নেই ,খেলার কেউ নেই।সারাদিন নিজের সঙ্গেই নিজেকে কথা বলতে হয়।ধুর,ভালো লাগে?ঠাম্মি তো বসেছে সেই জপের মালা নিয়ে।বিথীকার ঠাকুমা ছেলে বৌ বেড়িয়ে গেলে স্নান পুজো সেরে বসেন জপে।ওদিকে বিথীকা স্কুল না থাকলে একা একাই ঘুরে বেড়ায় এ ঘর সে ঘর।আর এই স্কুল টাতে ওর যেতেও ইচ্ছে করে না।ছেলেমেয়েগুলো কেমন নোংরা নো‍ংরা।

কখনো বড় মেয়েপুতুলটার চুল আঁচড়ে দিচ্ছে,কখনো বায়না -ঠাম্মা খেতে দাও ,
কখনো আবার হারমোনিয়াম নিয়ে গান।একা একা দুপুরগুলো যে কি বাজে কি বলবো?কাটতেই চায় না যেন।মা যে কেন এত দেরি করে?বাবাও কলেজ থেকে ফিরতে ফিরতে সেই ছটা ।এতক্ষণ কি করবে বিথীকা?

-দিদাই,ও দিদাই শোনো।
-কি ঠাম্মু
-আসো,আমি মাথায় এট্টু হাত বুলিয়ে দিই সোনা
-না না
-এ ভাবে ছাদে ঘুরে বেড়াও কেন?আসো তোমাকে মাথায় হাত বুলিয়ে দিই।দেখবে তোমার ভালো লাগবে
-তারচেয়ে একটা গল্প বল না ,সেই ব‍্যাঙ্গমা ব‍্যাঙ্গমীর
-আচ্ছা,তাই হবে।আসো

প্রায় দুপুরে বিথীকার গল্প জমে ঠাকুমার সঙ্গে।যখন যখন গল্প শুনতে শুনতে চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে,ব‍্যাঙ্গমা ব‍্যাঙ্গমীরা তাদের ঝাঁকড়া গাছের ডালে বসে রাজপুত্রের ভবিষ্যৎ বলে দেয়,বিথীকা দেখতে পায় হাতে খোলা তলোয়ার, ঘোড়া ছুটিয়ে ছুটে আসছে রাজপুত্র।কি সুন্দর ঝলমলে জামা ,কি সুন্দর মুকুট!কিন্তু মুখটা,মুখটা দেখা যায় না কেন?মুখটা ঝাপসা কেন,উঃ!ধোঁয়া ধোঁয়া যে।ধুর মুখ যে বিথীকা দেখতে পায় না কিছুতেই!

স্কুলে যায় না মাসের অর্ধেক দিন।মানুষ জনের সঙ্গে মিশতে স্বাভাবিক নয়,তবে পড়াশোনায় ভীষণ ভীষণ ভাল বিথীকা।আর তাই অর্ধেক হাজিরাতেও বরাবর ফার্স্ট।সেই প্রাইমারি থেকেই।এই ক্লাস সিক্স অবধি বিথীকা কে কোনো সাবজেক্টেই কেউ টপকাতে পারেনি।সবাই ভাবে ও বোধহয় খুব পড়ে।খুব বেশি বন্ধু নেই, যে দুয়েকজনের সঙ্গে কথা তারা জানে

-ধুর,মোটেও না।আমার পড়তে ভালোই লাগে না।
-বারে!তা হলে ফার্স্ট হস যে বড়
-ও তো একা একা থাকতে ভালো লাগে না তাই পড়ি।আর পড়তে পড়তে ভালো লেগে যায় তাই আরো পড়ি
-বাব্বা!বড় লোকেদের বড় বড় ব‍্যাপার।ঠোঁট উল্টায় সহপাঠীরা।যাদের বেশিরভাগই সমাজের খেটে খাওয়া ঘর থেকে উঠে এসেছে।

©®

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top