Shampa Saha

#ফুলি_পর্ব_১৩
#শম্পা_সাহা

সৈকত যাবার মাস চারেক পর থেকেই আর বিথীকাকে দেখা গেল না।গোলগাল, মিষ্টি মুখের শান্তশিষ্ট মেয়েটা যেন উধাও হয়ে গেল সবার চোখের সামনে থেকে।স্কুল থেকে খবর পাঠানো হল,বন্ধু বান্ধবরা উঁকি ঝুঁকি মারলো কিন্তু না ,মেয়েটা যেন অদৃশ্য হয়ে গেল।শোনা গেল বিথীকা নাকি ভীষণ অসুস্থ।কি এমন অসুস্থ যে স্কুলে যায় না ,বাড়ির বাইরে বেরোয় না,বাড়ির জানালা ,ছাদ ,বাগান বা উঠোনেও দেখা যায় না।এমনকি সে বছরের ইলেভেনের বার্ষিক পরীক্ষাও দিতে দেখা গেল না ওকে।

সৈকত ছুটিতে এসেও বিথীকার দেখা পেলো না।বিথীকার খবর নিতে গেলে রীতিমতো দূরদূর করে তাড়া খেল ।সমরেশ বাবু পাড়াতে মেলামেশা না করলেও খোঁজ খবর ঠিকই রাখতেন।যেদিনই খবর পেলেন সৈকত বাড়ি এসেছে স্ত্রীকে সতর্ক করে দিলেন
-খবরদার বিথী যেন জানতে না পারে।

মাকেও সতর্ক করে দিলেন।ঠাকুমা নাতনিতে বড় ভাব যে।নাতনির শুকনো মুখ খানার দিকে আর তাকাতে পারেন না সমরেশ বাবুর মা।কোথায় দিদাই সেজেগুজে স্কুলে যাবে তা নয় সব কিছু ছেড়ে বাড়ি বসে।বসে আর কোথায়, সারাদিনই তো শুয়ে থাকে।দরজা জানালা খোলার খুব কড়াকড়ি।বিথীকার ঘরের জানালা একদম খোলা যাবে না।এমনকি ওর নিজের ও জানালার ধারে যাবার নিয়ম নেই।বাবা মা জানতে পারলে তুলকালাম বাঁধাবে।

বিথীকা নিজেও নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে জন মানস থেকে।কত স্বপ্ন ছিল,ডাক্তার হবে,গলায় স্টেথিস্কোপ ঝুলিয়ে হাসপাতালে যাবে,যেমন ওর খুড়তুতো দিদি যায়।কিন্তু কোথা থেকে যে কি হয়ে গেল?মরমে মরে থাকে বিথীকা।কারো সঙ্গে কথা বার্তা বলতেও ইচ্ছে করে না ,খাওয়া দাওয়া করতে ইচ্ছে করে না।শুধু শুয়ে থাকা আর গান শোনা,এই তো ওর কাজ।মাঝে মাঝেই বোবা আক্রোশে নিজের চুল টেনে ছেঁড়ে,দেওয়ালে মাথা ঠোকে,নিজের পেটে কিল মারে পাগলের মত।

আশেপাশের লোকজন দেখে বাড়িতে ডাক্তারের আসা যাওয়া লেগেই রয়েছে।কিন্তু কি হয়েছে বিথীকার তা যেন এক অমোঘ রহস্য।আর যা রহস্য তা বরাবরই কৌতূহলের উদ্রেক করে।বাড়ির উল্টোদিকে তপতীদের মুদিখানা দোকান।বিথীকা মাঝেসাঝে স্কুল থেকে ফেরার পথে চকলেট টকলেট কিনতো।তপতী বিথীকার বয়সী নয়,বছর খানেকের বড়ই হবে।তপতী একদিন সাহস করে সমরেশ বাবুকে জিজ্ঞাসা করে,
-কাকু বিথী কোথায় ,ওকে দেখি না যে
-কেন,তাতে তোমার কি?
-না মানে

সমরেশের মুখের ভাব দেখে আর তপতীর সাহস হয় না।সেদিন রবিবার।সবই বাজার করে এনেছিলেন সামনের মার্কেট থেকে।সাধারণত এই সব ছোটোখাটো দোকানে উনি আসেন না।কিন্তু হঠাৎই খেয়াল হল ইলিশের জন‍্য সর্ষে আনতে হবে।তাই অগত‍্যা!আর এসেই সেই বিশ্রী কৌতূহল।যা ওনার দুচক্ষের বিষ।এই জন‍্যেই উনি এ সব এলাকায় আসতে চাননি।মায়ের এক বেয়াক্বেলা শখ,খোলামেলা জায়গায় থাকবেন শেষ বয়সে।তাই তো মধ‍্য কলকাতার বাসা ছেড়ে এখানে উঠে আসা।না হলে তো ইচ্ছে ছিল ওখানেই একটা ফ্ল‍্যাট ট‍্যাট কিনে নেওয়া যাবে।যদিও তখনো এখনকার মত রমরমিয়ে ফ্ল‍্যাট কালচার গড়ে ওঠেনি তবু উচ্চ মধ‍্যবিত্ত বা সমরেশ বাবুদের মত লোকের জন‍্য ফ্ল‍্যাট তখন স্ট‍্যাটাস সিম্বল।

সৈকতকে আসতে দেখেই তাড়াতাড়ি ঘরের ভেতর উঠে যান সমরেশ।প্রতি রবিবার বিকেলের দিকে দোতলার ব‍্যালকনিতে বসে খবরের কাগজটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়াটা সমরেশের বহু দিনের অভ‍্যেস।সকালে বাজার হাটের মধ‍্যে ওই চোখ বুলানোই হয়।অন‍্যান‍্য দিন তাও কলেজে ক্লাস অফ থাকলে একটু আধটু পেপারে চোখ বোলানো যায় কিন্তু রবিবার দম ফেলার ফুরসত পাওয়া যায় না।তাই এ ওনার প্রতি রবিবারের নিত‍্য কর্ম।চা টা ও রমা এখানেই দিয়ে যান।কিন্তু সকালের তপতীর কথায় মেজাজটা একটু খিঁচড়ে রয়েছে তার উপর গলির মোড়ে লম্বা দোহারা চেহারার সৈকতকে দেখেই ঘরে ঢুকে দরজা দিলেন।

নিচে বেলের আওয়াজ শুনে বুঝলেন এ সৈকত না হয়ে যায় না।কিন্তু ওই ছেলেটির মুখ দেখতে ইচ্ছে করছে না।ওর জন‍্য আজ যে বিড়ম্বনার মধ‍্যে ওর পুরো পরিবার তাকেই নিজের বাড়ির দরজায় দেখে আর সহ‍্য হলো না।রমা দুপদাপ করে স্বামীকে নামতে দেখে দরজা খুলতে এগোলে সমরেশ যেন হুংকার দিয়ে ওঠে
-দাঁড়াও
গলার অতিরিক্ত গাম্ভীর্যে রীতিমতো চমকে ওঠেন রমা।হঠাৎ কি হল?তখন পর্যন্ত বাড়ির দরজায় সৈকত আসার খবর সমরেশ ছাড়া কেউই জানে না।সমরেশ দরজা খুলো যথা সম্ভব বিরক্তি প্রকাশ করা যায়,মুখেচোখে সেই ভাব সুষ্পষ্ট করে প্রশ্ন করেন
-কি ব‍্যাপার এখানে কেন?
-বিথীকা আছে?একটু ডেকে দিন না
-বিথী নেই
-কোথায় গেছে
-ওর মামার বাড়ি
-শুনলাম ও নাকি স্কুলেও যায় না
-সে খবরে তোমার দরকার কি?
-না মানে ওর সঙ্গে একটু দেখা করতাম

রমা বুঝতে পারেন সমরেশের মেজাজ চড়ছে।তাড়াতাড়ি এসে সামলে নেন
-ও নেই, ওর অসুখ করেছে,তাই মামার বাড়ি পাঠানো হয়েছে
-কি অসুখ?
-রমা তুমি ওকে এক্ষুনি এখান থেকে চলে যেতে বলো।না হলে কিন্তু
-প্লিজ তুমি যাও সৈকত
-কাকিমা, মামার বাড়ির ফোন নম্বরটা একটু দেবেন
-রমা..

চিৎকারের চোটে সমরেশের গলার স্বর ভেঙে যায় যেন।গলার স্বরে রাগ ,দুঃখ,ঘৃণা বিরক্তি যত রকম ঋণাত্মক অনুভব একটা মানুষের থাকতে পারে সব সব উপচে পড়ে সমরেশের গলায়।ব‍্যাকুল রমা সৈকতের হাত ধরে মিনতি করেন
-প্লিজ তুমি যাও ,তুমি যাও এখান থেকে।

হঠাৎ মধর‍্যরাতে এক প্রাইভেট গাড়ি এসে থামলো বিথীকাদের বাড়ির সামনে।গাড়িটা বিথীকার কাকার ।গাড়িতে চড়ে বসলো সমরেশ,রমা আর অসুস্থ রুগ্ন,ক্লান্ত, বিধ্বস্ত বিথীকা।চোখের নীচে জন্মের কালি,কন্ঠার হাড় বেড়োনো,ঠোঁট দুটো ফ‍্যাকাশে।যেন রক্তশূন্যতায় ভুগছে।বছর ষোলোর এক কিশোরী নয় যেন, যেন তার প্রেতচ্ছায়া।গাড়ি ছুটে চললো সমরেশে বড় শ‍্যালকের বাড়ি জব্বলপুর।যেখানে রমার প্রফেসর দাদা তার পরিবার নিয়ে থাকেন।

©®

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top