Shampa Saha

#আমবুড়ো_পর্ব_১৫
#শম্পা_সাহা

বাসন্তী মেয়েটা বড়ই নরম। কথা এত আস্তে বলে যে কাছে দাঁড়িয়েও ভালো শুনতে পাওয়া যায় না। দেখতেও ভালো না, দাঁত উচু ,নাক মোটা,গায়ের রং চাপা।চাপা মানে বেশ চাপা,কালোই বলা চলে। কিন্তু চোখ গুলো বেশ বড় বড় পুকুরের মত। -একেবারে কন্ট্রোলের পুকুরের মতো ! না,না দিঘির পুকুরের মতো বড়!
এসব ভাবে আমবুড়ো।

আসলে ওদের অবিনাশ চৌধুরী লেনের থেকে তেঁতুলতলা মানে কলকাতার ভাড়া বাড়ির কাছাকাছি পুকুর বলতে ওই দুটোই। ছোটটার সামনে রেশন কন্ট্রোল ,তার থেকে কন্ট্রোলের পুকুর নাম। আর তারই একটু দূরে একটা বড় দীঘি, যার নাম লোকের মুখে মুখে দিঘির পুকুর ।এর চেয়ে বড় জলাশয় ও আর দেখেনি। তাই ওই মেয়েটির চোখের গভীরতা দেখে ওর দিঘীর পুকুরের কথাটাই মনে পড়ল ।

মেয়েটা আমবুড়ো কেন কারো সাথেই কথা বলত না! চুপচাপ কাজ করতো মাথা নিচু করে ।দুপুরে একটা কালো হলদে ময়লা প্লাস্টিকের ভেতর থেকে রুটি আর একটু তরকারি বের করে খেয়ে, টিউবয়েল থেকে আঁজলা ভরে জল খেত। তারপর আবার কাজে।বেশিরভাগ দিনই রাতে করা বাসি রুটি আর একটু আলুভর্তা বা গুড়,চিনি বা ওই জাতীয় কিছু।

জামা, কাপড়, চেহারা,আচার-আচরণে দারিদ্র্যের ছাপ স্পষ্ট! তাই যেন সবসময় মাথা নিচু, ভীতুর মত দৃষ্টি! এমনকি আমবুড়ো যে আমবুড়ো ,যাকে সবাই তুই তোকারি করতে অভ্যস্ত ,কারখানা ঝাঁট দেয় যে ছেলে ছোকরাগুলো তারাও পর্যন্ত ওকে তুই-তোকারি করে, তাকে পর্যন্ত মেয়েটা আপনি বলতো! আমবুড়ো বেচারা তোতলা, তবু দুচারবার ওই আপনি শুনে লজ্জা পেয়ে বলেছে,
-তু….তু… তুমি আমাকে তুমি বলবে
কিন্তু মেয়েটা কি জানি কি বুঝেছে ?ঝট করে সরে গেছে ওর সামনে থেকে ।আমবুড়ো মনে মনে হাসে, -যাক বাবা শেষ পর্যন্ত কেউ তো আমাকে বেশ সম্মান করে !

বাসন্তী খুব ভালো মেয়ে ।দুই ভাই দুই বোন ওর ছোট ।বাবা মাতাল,মা লোকের বাড়ি কাজে আসে সকাল সাড়ে পাঁচটার ট্রেনে।মেজ বোনের ওপর সংসার ফেলে বাসন্তীও মায়ের সঙ্গী। নইলে সাতজনের সংসার, বাবার নেশার পয়সা উঠবে কোথা থেকে? ওর যেন মনে হয় সারা পৃথিবীর কাছেই ও দোষ করে বসে আছে। বড় মেয়ে হওয়ার দৌলতে, সংসারের যাবতীয় ঝক্কিতে মায়ের সঙ্গী হবার দৌলতে, ক্লান্ত পরিশ্রান্ত মাকে বাবার বেঁহুশ কিল, চড় ,থাপ্পর থেকে বাঁচাতে বাঁচাতে কবে যেন ও অনেক অনেক ছোট হয়ে গেছে।

ট্রেনে যখন আসে, মর্নিং কলেজে আসা ওর বয়সী সতেরো আঠারোর মেয়েদের দিকে ও কখনো তাকায় না ,লজ্জা পায়। যদি কেউ কিছু বলে বসে! ও বুঝে গেছে, গরিব মানুষদের সবাই সব কিছু বলতে পারে! সবাই যখন তখন অপমান করতে পারে !গলা উঁচু করে দাবড়ি দিতে পারে । ভিড়ে ওর হাওয়াই চটি পরা পা ইচ্ছে করলেই মাড়িয়ে যেতে পারে ।
-উঃ
বললে শুনতে হয়,
-এত ন্যাকা হলে ট্রেনে কেন গাড়িতে যেতে পারিস?

তাই সোজাসুজি না তাকিয়ে আড়চোখে দেখে। ওদের গাল,ওদের মুখ ,ওদের চুল ,ওদের পোশাক, ওদের জুতো, এমনকি পায়ের পাতা, হাতের নখ, ঠোঁটের চামড়া সবই যেন বাসন্তী কে বারবার বুঝিয়ে দেয়,
– তোরা আর আমরা আলাদা !তোরা ছোট আমরা বড়
এই ভাবনা বাসন্তীকে আরো মেরে ফেলে।আরো ছোট করে ফেলে !ওর আড়চোখের দৃষ্টিও নিচু হয়ে আসে। ওরা যে গরিব, গরিবদের অনেক কিছু সহ্য করতে হয়।

সেদিন ওদের মালিক হঠাৎই বলে
– কিরে সুজিত আজ আমাদের খাওয়াবি না?
-কেন শায়ের?
– তোর ব্যাংকে এক লাখ টাকা, পুরোপুরি এক লাখ!
-এক লাখ টাকা? এক লাখ?
ও যেন বিশ্বাস করতে পারে না। যদিও ওর মালিক যেখানে যেখানে বলে,ও সই করে দেয়।আর মাসের সব মাইনেই এত বছর ধরে ব‍্যাংকে রেখে আসে কিন্তু সেটা যে একলাখ হতে পারে ওর ধারণাই ছিল না ।ও ঘুরেফিরে অন্তত বার সাতেক জিজ্ঞাসা করে -ও শায়ের
-কি রে ?
-এক লাখ?
সবাই তো অবাক!
-আরে হ‍্যাঁ বাবা!সত্যি সত্যিই এক লাখ রে গাধা! আজ থেকে তুই লাখ টাকার মালিক ।

ব্যাংকের বইটা ওর সামনে মেলে ধরে মালিক অসিত সাহা ।
-এই দেখ এটা ওয়ান মানে এক, আর এই দেখ কটা শূন্য ।পাঁচটা হয়।
– কিন্তু এখানে যে দুটো শূণ‍্য?
– হ্যাঁ আরো পাঁচশো আটাত্তর টাকা আছে ।তাই।আচ্ছা তুই এক কাজ কর আজ বইটা বাড়ি নিয়ে যা। কাল বাড়িতে দেখিয়ে এনে দিস ।না হলে তোর কাছেও রাখতে পারিস।

ও সেদিন সন্ধ্যেতে রিকশা বন্ধ রেখে বাড়ি ছোটে। ওর দাদা ,কিছুটা হলেও পড়াশোনা জানে ।সে যখন ওকে সত্যি বলল ,আনন্দে আমবুড়োর নাচতে ইচ্ছে করে ।বেশ কিছুক্ষন একা একা হেসে নেয়।আজ মামা-মামীও খুব খুশি। যদি ওরা সবাই একটু বুঝেছে লাখ টাকার গল্প ,কিন্তু হারু শিক্ষিত ,যতক্ষণ ও না বলে ততক্ষণ তো মালিকের কথাটা ইয়ার্কি বলেই মনে হচ্ছিল।না আঁচালে বিশ্বাস আছে?

আনন্দে আমবুড়ো ওই রাতেই ছোটে সুভাষ গ্রাম স্টেশনে।ও যে লাখপতি হতে পারে ,তা কি ভ‍্যান টানার সময়, রিকশা চালাতে চালাতে বা কাঁধে করে রেলিং বইবার সময় ভেবেছিল?

স্টেশন থেকে ছশো খাসির মাংস কিনে এনে বাবাকে জমিয়ে রাঁধতে বলে ।
– বাবা বাবা একটু বেশি করে জ্বাল দিয়ে ঝোল করো,লাল ঝোল
বলতে গিয়ে জিভ থেকে এক ফোঁটা লাল টপ করে মাটিতে গড়ায়।শেফালী মামী আনন্দে হেসে, নিজের পায়ের একজিমা চুলকে চুলকে তার আঁশ গুলো ঝেড়ে ফেলতে ফেলতে বলে
-ধুর আবলদা !
কিন্তু এতে যে কতখানি সন্তোষ লুকিয়ে, তা একমাত্র সন্তানের সাফল্যে আনন্দিত মায়ের মুখ দেখেই আন্দাজ করা যায়।

পরদিন কারখানার সবাই চেপে ধরে
-এই বুড়ো আজকে খাওয়াবি না? লাখপতি হয়েছিস, না খাওয়ালে ছাড়বো না।
অসিত বাবু বোঝেন কাজটা ভালো করেননি। এখন এই বোকা ছেলেটার বেশ কিছু টাকা খসবে। কারখানের বদমাইশ ছেলেছোকরারা আমবুড়োকে এইবার বিরক্ত করবে।

অবশ্য যতটা ভাবা যায় ও ঠিক ততটা বোকাও নয়। এতে ওর কোন চালাকিও অবশ্য নেই। আগের দিনের সব টাকা বাড়িতে রেখে মাত্র দশটা টাকা পকেটে নিয়ে ও বেরিয়ে আসে ।রোজকার ওর এই কাজ।পুরো টাকাটাই ওর বাবা রেখে দেয় এবং বাবার কাছ থেকে জমানো টাকার থেকে বরাদ্দ দশ টাকাই পকেটে থাকে।বাবাই বাকি টাকা থেকে নিজের বাজার-টাজার করে ।

ট্রেন এর মান্থলি তো আছেই। আর রিক্সা টানা তো সেই সন্ধ্যেবেলা ।তাই ওর পকেটে সকাল থেকে দশটা টাকাই পড়ে থাকে ।কিন্তু কেউ যদি কারোর মাথা মোড়ানোর সুযোগ পায় ছাড়বে কেন?

ক্রমশ…..

©®

Leave a Comment

Your email address will not be published.