Shapla Barua

স্মৃতির অতলে
ডুবে থাকা
এক টুকরো ভালোবাসা
(শেষাংশ)
শাপলা বড়ুয়া

দাদু প্রাইমারী স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। সুশৃঙ্খল জীবন যাপনের মধ্যে থাকতে পছন্দ করতেন। অনিয়ম একদমই সইতে পারতেন না, ভীষণ কড়া মেজাজের মানুষ ছিলেন বলেই হয়তো স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে মা-মাসিদের মধ্যে তড়িঘড়ি পড়ে যেতো।

ভেতরের পাকঘরের সাথে লাগোয়া মাটির নিকানো খাবার ঘরটিতে দিদিমা খুব যত্ন করে এক একটি পদে সাজিয়ে তুলতেন দাদুর জন্য রাখা ছোট ছোট বাটিগুলো। ধোঁয়া ওঠা দুধ সাদা আতপ চাল ভাতের সুঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়তো চারপাশে। কুচো মাছের চচ্চড়ি, শুটকির ঝাল, ফলি মাছে কাঁজি, পেলন ডাল, সীমের বিচির খাইস্যা, টমেটোর খাট্টা, প্রতিটি পদই দাদু বেশ আয়েশের সঙ্গে একটু একটু করে চেখে দেখতেন।

আমি কাঠের দরজার পেছনে দাঁড়িয়ে লোভাতুর দৃষ্টিতে দেখে যেতাম দাদুর এই মুখোরোচক খাবারের দৃশ্য! যদিও তাঁর খাওয়া শেষে, চিমনি বিছিয়ে দিয়ে আমাদের ছোটদের খাবারের আয়োজন শুরু হয়ে যেতো। কিন্তু দাদুর পরিপাটি খাবারের এই দৃশ্য আমার কাছে বেশ উপভোগ্যের বিষয় ছিলো।

কর্ণফুলীর বুক চিরে শত শত বছর আগে যে চর জেগেছিলো, তাকেই জড়িয়ে ছিলো এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের হাজারো সুখ-দুঃখ ও আনন্দ-বেদনা। সেই সাথে এখানকার প্রাণীকূলকেও জুগিয়েছে বেঁচে থাকার রসদ। চরের ওপর দিয়ে যে হাওয়া বয়ে যেতো তারই ছোঁয়া পেয়ে তরতর করে মাথা তুলে দাঁড়াতো খেসারি,মটর,কলাইয়ের মতো যত তৃণগুল্ম। আর এই সবুজ কচি কাচা ঘাস খেয়ে নধরকান্তি হতো এখানকার গরু,ছাগল,মোষেরা।

কত কত পথ বেয়ে যেতে হতো আমাদের এই চরে। সোজাসাপ্টা পথও যে ছিলো না তা কিন্তু নয়! তবে এ পথ আমার জন্য ছিলো বড়ই কঠিন। হা হয়ে থাকা বিরাটাকৃতির গভীর খাদ ডিঙিনোর পর ছিলো খাল, এরপর সেই খাল পাড়ি দিয়ে ফুট কাদা ভেঙ্গে এ গাছ ও গাছের মাথা কিংবা শক্ত খুঁটি ধরে ধীরে ধীরে চরের বুকে উঠে আসতে হতো আমাদের। আর এই হা হয়ে থাকা খাদ ডিঙানোর জন্য শোয়ানো থাকতো প্রকাণ্ড এক মোটা গাছের গুঁড়ি। কিন্তু গুঁড়িটির কাছাকাছি গেলেই আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে অসাড় হয়ে যেতে‌ চাইতো।

মনে হতো এই বুঝি আমার একরত্তি শরীরকে গিলেই হাপিস করে দিবে খাদটি! কিন্তু চরে যাবার লোভ আমি কিছুতেই হাতছাড়া করতে চাইতাম না। কখনো হামাগুঁড়ি দিয়ে, কখনোবা এর ওর হাত ধরে রূঢ় পথ পাড়ি দেওয়ার ঝুঁকি নিতেই হতো আমাকে। আমার এই নাকাল অবস্থা দেখে, হাসতে হাসতে ছোট মাসির পেটে খিল লেগে যেতো রীতিমতো! ” কিভাবে পাড় হচ্ছে, দেখো! তোর জন্য আমরা সবাই আটকে আছি। এই সামান্য একটা পথ পাড়ি দিতে, কতটা সময় পার করে দিলি তুই। তোর চরে যাবার কি দরকার, এ্যা!” কোমরে হাত দুটো রেখে গজরাতে থাকতো ও।

এখানকার যাপিত জীবনের সঙ্গে ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে থাকতো চর। যেজন্য জোয়ার ও ভাটার সময়সূচিকে মাথায় রেখে অতিবাহিত হতো এ জনপদের বাসিন্দাদের প্রতিদিনকার দিনলিপি। প্রকৃতিও হাজির হতো ভিন্ন ভিন্ন রূপ নিয়ে। যার খানিকটা ছাপ পড়তো এ অঞ্চলের প্রাণীকূলের মধ্যেও। আর এদিকে খালের পাশ ঘেঁষে বিচ্ছিন্নভাবে ছড়ানো ছিটানো কেওড়ার ডালগুলো ফলের ভারে আরো নুয়ে পড়তে চাইতো যেনো।

এর মধ্যে হয়তো চ্যাং মাছের মতো দেখতে কোন মাছ খানাখন্দের খুপড়ি থেকে বেরিয়েই নিজেকে শূন্যে ছুঁড়ে দিতো আবার ঝুপুস করে কাদামাটির গর্তে ঢুকে পড়তো। লুকিয়ে পড়া সেই মাছকে খুঁজতে গিয়ে গলদঘর্ম অবস্থা হয়ে যেতো আমাদের সঙ্গে আসা মামাদের কুকুরটিরও। গোঁ গোঁ করতে করতে ছুটে যেতো একবার এদিকে, কখনোবা অন্য আরেকদিকে। কিন্তু সেই মাছের দেখা না পেয়ে হাল ছেড়ে দিয়ে মুখের ভেতর থেকে লম্ব জিহ্বাটা বের হয়ে আসতো আর হাঁপাতে হাঁপাতে ব্যর্থ মনোরথে ফিরে আসতো কুকুরটি।

জোয়ার শুরু হয়েছে কী অমনি পাল্টে যেতো খালের পরিস্থিতি। ছোট মামা তৎক্ষণাৎ গরুর পিঠে চড়িয়ে দিতেন আমাদের। আর গরুর পিঠে উঠিয়ে দিলেই ভয়ে কুঁকড়ে যেতাম আমি! মনে হতো এই বুঝি আমাকে পানিতে ছুঁড়ে ফেলে অন্য কোথাও ছুট দিলো গরুটি ! শেষমেশ একগাদা ভয় আর আতংক নিয়ে একগলা পানি নির্বিঘ্নে পার হয়ে যেতাম আমি ও আমরা। এত ঝক্কি ঝামেলা সইয়েও গরু,বাছুর, কুকুর ও আমাদের নিয়ে চরের উদ্দশ্যে রওনা দিতে মোটেও দ্বিধা করতেন না ছোট মামা।

আহা! এই তো দিগন্ত বিস্তৃত কাঙ্খিত সেই চর,যার প্রতিটি ছত্রে ছত্রে লুকিয়ে থাকতো হাজারো রোমাঞ্চকর অনুভূতি ও গল্পকথা। যে গল্পের বীজ লুকিয়ে ছিলো কর্ণফুলীর হাওয়ায় দুলতে থাকা সেই নরম সরু শীমের ডগায় কিংবা দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসা কোন সাম্পান কিংবা দূরের কোন চরের বুক থেকে ভেসে আসা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক কোন গানের মাঝে! এর মাঝে হয়তো দু’য়েকটি সাম্পান কেঁ কোঁ আওয়াজে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিয়েই আবার আমাদের পাশ ঘেঁষে চলে যেতো। হয়তো কোন এক সাম্পান থেকে ভেসে আসতো মাইজভাণ্ডারির গান।

কিন্তু এই চর কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে, আমি এর হদিস খুঁজে পেতাম না কখনোই। ছোট মাসি বলতো, “ঐ যে সারি সারি সবুজ গাছ দেখতে পাচ্ছিস‌ না! দেখে মনে হচ্ছে এরা একে অপরের সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে আর সবুজ একটা রেখা তৈরি করেছে! সেখানে গিয়েই শেষ হয়েছে আমাদের চর।’
আমিও তখন বোঝার চেষ্টা করতাম, এ তো সবুজ রেখা‌ নয়! এ যেন আবছা ধূসর কোন উঁচু নিচু সবুজ টিলা, যেখানে আকাশ ছুঁয়েছে টিলাটিকে। আমি মনে মনে ধরে নিতাম, ওখানেই বোধ হয় চরের শেষ ঠিকানা।

This Post Has 2 Comments

  1. Taimur Khan

    ঘরোয়া এসব কাহিনির মধ্যে ডুবে গেলাম। অনবদ্য রোমন্থন সহজ ও সাবলীল ভাষা প্রয়োগ যা আমাদের গ্রামজীবনের সেই দিনগুলিকে ফিরিয়ে দিলে। শাপলা বড়ুয়া সহজ আবেদন নিয়ে যে প্রবহমান জীবন রচনা করে চলেছেন তা সত্যিই অতুলনীয়।

    1. Shapla barua

      অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে। ভালো থাকুন সবসময়।

Leave a Reply