SIDDHESWAR HATUI

ভীতি কেন হয়
-সিদ্ধেশ্বর হাটুই,

একজন মানুষ জন্মগ্রহণের সাথে সাথে মনের মধ্যে ভয় নিয়ে জন্ম গ্রহণ করেননা। ধিরে ধিরে মানুষ যখন শৈশবকাল কাটিয়ে বুঝতে শেখে, তারপর থেকে তার ভালো লাগা, খারাপ লাগার ব্যাপার গুলো সে অনুধাবন করতে শেখে। অবশ্য আমাদের সমাজ সংস্কৃতিও এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। আমরা যখন শৈশব অবস্থায় অবস্থান করি তখন আমাদের প্রতিবেশী ও বাড়ির গুরুজনেরা আমদের বেয়াদবি আচরণের কারণে বিভিন্ন ধরনের ভয় দেখানোর চেষ্টা করে থাকেন। যেমন বাঘ,হাতি, কুকুর, উড়োজাহাজ ও ভূতের ভয় আরো অনেককিছু। যাহাতে আমরা ধৃষ্টতা না করে থাকি। যা আমাদের মনের বাক্সে ঢুকে যায়, পরবর্তী সময়ে অনেকের মধ্যে এগুলো ভয়ের সঞ্চার ঘটাতে সাহায্য করে।

সবচেয়ে বড় বিষয় হল -এই ভীতির কথা সবসময় মানুষ ব্যক্ত করতে পারেননা কারো নিকট। যে ভয় পায় তার মনের মধ্যে এটাও চলে আসে , ব্যক্ত করলে পাছে লোকে হাসাহাসি করে। এই জন্য তাকে অব্যক্ত বেদনাগুলো ভোগ করতে হয়। মানুষ বর্তমানে খুব ব্যস্ত, আর এই ব্যস্ততা মানুষকে নিঃসঙ্গ করে তুলছে। তাই আমরা কেউ কারো কথা শুনতে চাইনা, কারো পাশে থাকার চেষ্টাও করিনা। এ যুগে মানুষ বড় অসহায় এবং একা হয়ে পড়েছে। যে সমস্ত মানুষ ভীতি বা ফোবিয়াগ্রস্থ , বলতে পারেন এক ধরনের মনোরোগে আক্রান্ত তাদের কেউ সাহায্য করার প্রয়োজন মনে করেন না বরং তার কাজকর্ম দেখে কেউ কেউ উপহাস করেন , যার ফলে তার মনের যন্ত্রনা আরো বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

বর্তমানে সম্পূর্ণ বিশ্বে ফোবিয়া অর্থাৎ ভীতি রোগে আক্রান্ত বহু মনুষ। মানুষ দেখে শেখে, তাই আমাদের পরিবেশে যে সমস্ত ঘটনা ঘটে চলেছে সেগুলোর মধ্যে অনেক খারাপ বা ভীতির সঞ্চার করে এমন ঘটনাও ঘটছে। কিছু কিছু মানুষ সেই ঘটনাগুলো ভুলতে পারেননা। আবার অনেকে এটাও ভাবেন যে , এভাবে ওর এই নির্মম ঘটনাটা ঘটেছে তাই আমাকে আর ঐ পথে যাওয়া চলবেনা।

যেমন –কনো একটি গ্রামে কেউ জলাতঙ্ক রোগে মারা গেলেন, আবার কেউ জঙ্গল গিয়ে সাপের কামড়ে মারা গেলন, কিম্বা মাঠে গিয়ে প্রচন্ড ঝড়-বৃষ্টির কারণে বজ্রপাতে চারজন মারা গেছেন। এছাড়াও আরো অনেক কারণে মানুষ মারা যায়। অনেক মানুষ আছেন এসব ঘটনা শোনে-দেখে আবার ভুলেও যায়। আবার এমন মানুষও আছেন যারা এই সমস্ত ঘটনা গুলো ভুলতে পারেননা, তারা চেষ্টা করেন কিভাবে এসবের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করা যায়। তাই তারা অস্বাভাবিক আচরন করতে শুরু করেন। যার যে প্রাণীকে ভয় লাগে বা বস্তুকে ভয় পান , তারা সেগুলো থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেন।

ভীতি বা ফোবিয়া কিন্তু খুব সহজ ব্যাপার নয়। অনেক সময় ভীতিগ্রস্থ মানুষের জীবন কেড়ে নিতে পারে। এমন মানুষও আছেন যারা রক্ত দেখলে ভয় পান, তারা যদি কনো আকস্মিক বিপদের মধ্যে পড়েন হার্টফেল করে মারাও যেতে পারেন। অনেকে আবার বেশি লোকজনের নিকট যেতে চাননা, যদি লোকের শরীরে থাকা জীবাণু তার শরীরে প্রবেশ করে যায় তার ভয়ে। তাই হয়তো ঐ ধরনের মানুষদের স্থিরীকৃত স্থানের মধ্যেই থাকতে হয় বা বাড়িতেই থাকতে হয়। অনেকেই জীবনকে এতো বেশি ভালোবাসেন তারা মনে মনে ভাবেন মরে যাবোনাতো ! তারা মরতে চাননা, তাই সমস্ত কিছুই মেপে মেপে করে থাকেন। এটাও বেড়ে বেড়ে একসময় মনোরোগে স্থানপায়। তাই যারা ভীতি রোগে আক্রান্ত তাদের অতিশীঘ্র স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে।

সাধারণত ভয় দু’শ্রেণীর হয়ে থাকে। কারণজাত এবং কারণহীন। অনেক ভয় প্রকৃত ও বাস্তব কারণ থেকে জন্মায়। যে সমস্ত ঘটনা গুলো সত্যি ভয় পাওর’ই , তাই বলে সকলেই ভয় পাননা, কেউ কেউ সাময়িক ভয় পেলেও পরে ভুলে যান। কিন্তু কিছু মানুষ তা পারেননা।

আবার অনেক ভয় মিথ্যা বা অবাস্তব কোন ধারণা বা বিশ্বাস থেকে সৃষ্ট হয়ে থাকে। এগুলোকে অবাস্তব ভয় বা ফোবিয়া বলে। তারা লোকের গল্প শুনে হোক বা কনো অলৌকিক ঘটনা দেখে ভীত হন। এ যেন তাদের জীবনে এক অভিশাপ।

ফোবিয়া বা অস্বাভাবিক ভীতি এক ধরনের মনোরোগ। এ বিষয়ে বিশ্বের অনেক বিশেষজ্ঞ তাদের মতামত দিয়েছেন। ভালো না লাগা থেকে যে ধরনের ভীতি হতে পারে, তার জন্য যেমন-ডঃ অনুত্তমা বন্দ্যোপাধ্যায়, মনোবিদ –বলেছেন—

“মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় আমি এই বিষয়টিকে অন্যভাবে প্রত্যক্ষ করেছি। আমরা যখন দেখি কোনও মানুষ বলছেন, তিনি বিবাহে যেতে চাইছেন না, তাঁকে আমি ‘কমিটমেন্ট ফোবিক’ বলে দাগিয়ে দেওয়ায় বিশ্বাস করি না। ‘কমিটমেন্ট ফোবিক’ শব্দটিকে আমরা অনেকসময় লঘুভাবে প্রয়োগ করি। একজন ব্যক্তির মানসিক পরিস্থিতি, জীবনের ইতিহাস, অভিরুচি তাঁর সম্পর্কের সিদ্ধান্তকে নির্ধারণ করে। কেন একজন মানুষ সম্পর্কে আবদ্ধ হতে চাইছেন না, তিনি আসলে কীসে আবদ্ধ হতে চাইছেন না, তাঁর কোথায় বাধা, এটা আমাদের আগে বুঝতে হবে। তাঁর অনীহা সম্পর্কে নাকি সম্পর্কের প্রাতিষ্ঠানিক চুক্তিতে, দেখতে হবে। অনেকসময় দেখা যায়, কোনও ব্যক্তির বিবাহ প্রতিষ্ঠানটির প্রতি অনীহা আছে। কিন্তু তাঁর যৌথতায় বা সহবাসে আপত্তি নাই-ই থাকতে পারে। আবার এ-ও হতে পারে কেউ হয়তো নতুন করে কোনও সম্পর্কের দায়িত্ব নিতে চাইছেন না, কারণ তার উপর ইতিমধ্যেই অনেকের দায়িত্ব আছে। একটা সম্পর্কে থাকাকালীন অন্য কারও প্রতি আকৃষ্ট হলে কী হবে—শুধুমাত্র এই চিন্তায় কেউ সম্পর্কের কমিটমেন্টে ঢোকেন না, এমনটা না-ও হতে পারে। আমরা এখন ওপেন রিলেশনশিপ, পলিঅ্যামোরাস সম্পর্কে এক্সপোজ়ড। সুতরাং কারও যদি মনে হয় একজনের সঙ্গে সম্পর্কে থাকার সময় অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্কে যাবেন, সেটা নিয়ে পার্টনারের সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলতে পারেন। আমাদের শহরে এমন অনেক কাপল আছেন, যাঁরা ওপেন রিলেশনশিপে আছেন। কমিটমেন্টকে তাঁরা অন্যভাবে সজ্ঞায়িত করেছেন। কমিটমেন্টের সংজ্ঞা কার কাছে কী, সেই মানুষটি কতখানি ঘনিষ্ঠতায়, কতটা অন্তরঙ্গতায়, কতটা যৌথতায় যাবেন—এই বিষয়গুলি নির্ভর করে তাঁর চাওয়া না-চাওয়ার উপর। তাঁর সঙ্গে যিনি সম্পর্কে যাবেন, তিনি বুঝে নেবেন অন্য মানুষটির কমিটমেন্টের সংজ্ঞায় তিনি স্বচ্ছন্দ কি না। যদি কোনও মানুষের মনে হয় ‘আমি একা থাকতে ভালবাসি’, তাঁকে ‘কমিটমেন্ট ফোবিক’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। তাঁর জীবনেও অন্য সম্পর্কের কমিটমেন্ট থাকতে পারে। সব কমিটমেন্টকেই শুধু রোম্যান্স বা যৌনতা দিয়েই দেখতে হবে কেন?”

আবার ডঃ সুর্বণ গোস্বামী, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ-বলেছেন—-“এটা সম্পূর্ণ মনের ব্যাপার। অনেকগুলো বিষয় থেকে এমনটা হতে পারে। সাইকোলজিতে ‘অ্যাটাচমেন্ট থিওরি’ বলে একটি বিষয় আছে। একদম ছোটতে কেয়ারগিভারদের (মা, বাবা কিংবা তাঁদের সমবয়সীরা) সঙ্গে তাঁর কেমন সম্পর্ক ছিল, বড় বয়সে প্রভাব ফেলে ভীষণ রকম। সেই সম্পর্কের উপরই নির্ভর করে পরবর্তীকালে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর তাঁর সম্পর্ক কীরকম হবে। যে সন্তান বাবা-মাকে খুব একটা পায়নি কিংবা বাবা-মা দু’জনেই কাজে ব্যস্ত থেকেছেন, তাদের ছটফটানি অনেকখানি বেশি হয়। বারবার মনে হয়, কারও সঙ্গে সম্পর্কে বেশি জড়িয়ে পড়লে কষ্ট পেতে হবে। অন্য কারও ক্ষেত্রে পূর্ব সম্পর্কের তিক্ত অভিজ্ঞতাও একটা বিষয় হয়ে উঠতে পারে। কারও ক্ষেত্রে হয় ট্রমা কিংবা আতঙ্ক। ছোটবেলার যৌন হেনস্থা। সেই ট্রমা থেকেও অনেকে সম্পর্কে জড়াতে চান না। ভয় পান। আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়েন। সুতরাং, এক-একজনের ক্ষেত্রে বিষয়টা এক-একরকম হতে পারে। ব্যক্তির আমিত্বের বিষয়টা এখন খুবই কমন জায়গা নিয়ে নিয়েছে। সম্পর্কে গেলে ব্যক্তির স্বাধীনতা চলে যাবে, অনেকের মনেই এই বিষয়টি জায়গা পেতে শুরু করেছে। এখনকার সমাজে পরিবারতন্ত্রের সংজ্ঞা পালটাচ্ছে। স্বাধীনতা পাওয়ার ক্ষেত্রে অনেকখানি এক্সপোজ়ার বেড়েছে। তবে ছেলেরা না মেয়েরা, কারা কমিটমেন্টে কুণ্ঠাবোধ করেন বেশি, এর কোনও পরিসংখ্যান নেই। তবে এই ফোবিয়া থেকে বেরনোর উপায় আছে। কাউন্সেলিং করা যেতে পারে। ছোট-ছোট কমিটমেন্ট দিয়ে বিষয়টা শুরু করা যেতে পারে।“

ফোবিয়া বা ভীতি একশোর বেশি ধরনের কারণে হয়ে থাকতে পারে। যেমন-

Achluophobia : আঁধারের ভয়, Acrophobia : উচ্চতার ভয়, Ailurophobia : বিড়ালের ভয়, Amaxophobia : গাড়িতে চড়ার ভয়, Ambulophobia : হাঁটার ভয়, Antlophobia : বন্যার ভয়, Aphenphosmphobia : স্পর্শ করার ভয়, Apiphobia : মৌমাছির ভয়, Arsonphobia : আগুনের ভয়, Astraphobia/Astrapophobia : বাজ এবং বজ্রপাতের ভয়, Atychiphobia : ব্যর্থতার ভয়, Autophobia : একা হওয়ার ভয়, Bacteriophobia : ব্যাকটেরিয়ার ভয়,Bathmophobia : সিঁড়ি অথবা খাড়া ঢালের ভয়, Caligynephobia : সুন্দর মহিলার ভয়, Catagelophobia : পরিহাসের ভয়, Chrematophobia : টাকার ভয়, Cynophobia : কুকুরের ভয়, Entomophobia : পতঙ্গের ভয়, Hematophobia : রক্তের ভয়, Iatrophobia : ডাক্তারের ভয়, Necrophobia: মৃত্যূ / মৃত জিনিষের ভয়, Phasmophobia: ভূতের ভয় ইত্যাদি।

যাই হোক সঠিক চিকিৎসা এবং আত্মীয় স্বজনের ভালোবাসা, এবং যে ভীতির শিকার তাকে সঠিক পরামর্শ দেওয়া ও তার সাথে থাকলে রোগ নিরাময়ের আশা রাখতে পারেন। অনেকেই এই রোগ থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন। সকলেই সকলের পাশে থাকুন ভীত মানুষদের সাহায্য করুণ। ফোবিয়া বা ভীতি কনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। তারাও ভালো কাজ করতে পারে, ভীতিগ্রস্থ মানে পাগল নয়, এটা আমাদের সকলের মনে রাখা প্রয়োজন।

Leave a Reply