Somnath Chatterjee

ব‍্যানার্জীদার মর্নিং ওয়াক
“””””””””””””””””””””””””””
সেদিন অফিস যাবার জন্য ব‍্যানার্জীদা তৈরি হচ্ছেন। হঠাৎ লক্ষ করলেন পেটটা বেশ উঁচুর দিকে উঠছে।ট্রাউজারের বোতামটা আটকাতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বেশ অস্বস্তি লাগছিল নিজেকে দেখতে। ভুঁড়ি হলে পুরো লুকের বারোটা বাজবে। মাথার চুল পাতলা হলেও তারা এখনো আছে। মধ্য বয়সে এর মধ্যেই অনেকের টাক পড়ে যায়। ব‍্যানার্জীদার সে অবস্থা হয়নি। তবে উঠতি ভুঁড়িকে নিয়ে বেশ চিন্তিত তিনি।

ব‍্যানার্জীদা মানে সুধাংশু ব‍্যানার্জী একজন টেক্সটাইল ইঞ্জিনীয়ার। কর্মসূত্রে আমেদাবাদে থাকেন স্ত্রী শিখা ও এক পুত্র কৌশিককে নিয়ে। সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে ক্লাস সেভেনের ছাত্র কৌশিক। ব‍্যানার্জীদা একটি নামকরা টেক্সটাইল কোম্পানির মার্কেটিং হেড। বেশ সচ্ছল পরিবার। নিজের গাড়ি আছে। স্ত্রীও স্থানীয় একটি ইংরেজী মাধ্যম স্কুলের টিচার। আমেদাবাদের বেঙ্গলী ক্লাবে নিয়মিত যাতায়াত। উচ্চ মার্গীয় সোসাইটিতে বেশ পরিচিত মুখ। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সামনের সারিতে থাকেন। এ হেন ব‍্যানার্জীদা ভুঁড়ি নিয়ে বেশ চিহ্নিত। মহিলা মহলে একটু যেন শেয়ারের ভ‍্যালু পড়ে যাবার মতো। স্ত্রী অনেক দিন ধরেই বলছে ভোর বেলা উঠে কাঁকারিয়া লেকের চারপাশে দুতিন রাউন্ড হাঁটতে। আমেদাবাদের মনিনগরে উনি যেখানে থাকেন ওখান থেকে দশ বারো মিনিটের হাঁটা পথে যাওয়া যায় কাঁকারিয়া লেক। খুব সুন্দর বিরাট লেক। লেকের মাঝখানে একটা দ্বীপের মতো একটা বাগান। নাম নাগিনাওয়াড়ি। পৌঁছনোর জন্য সরু রাস্তা আছে। চরিদিকে গাছগাছালি। বেশ মনোরম পরিবেশ। পুরো লেকটা একবার হেঁটে ঘুরে আসতে প্রায় ৪৫মিনিট লেগে যায়। আড়াই কিলোমিটার কম কথা নয়। কয়েকজন বন্ধুও হাঁটার পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু মুশকিল হলো ব‍্যানার্জীদার ভোরে ঘুম ভাঙেনা। আর বেলা আটটার সময় হাঁটতে গেলে সবাই হাসবে। যদিও আমেদাবাদে সকাল একটু দেরিতেই হয়। পুরো সকাল হতে হতে প্রায় সাতটা বেজে যায়। যে লোক জীবনে কখনো কোনো শারীরিক কসরৎ করেনি তার কাছে ভোরে উঠে হাঁটতে যাওয়া কত যে সমস্যার শুধুমাত্র সেই জানে। গাড়ি ছাড়া যে লোক এক পা হাঁটেনা সে যাবে মর্নিং ওয়াক করতে। পরিচিত কেউ দেখলে কি জবাব দেবেন। ভুঁড়ি কমানোর জন্য হাঁটতে যাচ্ছেন !

ঠিক করলেন নাহ্ কালথেকেই শুরু করবেন। ভুঁড়িকে আর প্রশ্রয় দেওয়া ঠিক হবেনা। পরেরদিন সকাল সকাল উঠে পায়ে স্নিকার, গায়ে টি সার্ট আর ট্রাউজার পরে দুগ্গা দুগ্গা বলে আপার্টমেন্ট থেকে পায় হেঁটে কাঁকারিয়া লেকের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। একবার ভাবলেন গাড়িটা নিয়ে যাবেন তারপরে ভাবলেন মাত্রতো দশ মিনিটের হাঁটাপথ, হেঁটেই চলে যাবেন। চারিদিকে নজর রাখছেন কেউ পরিচিত লোক না দেখে। গুনে গুনে পন্ঞ্চাশ পা গেছেন কি যাননি একবারে গা ঘেঁসে গাড়ির হর্ন। মিত্তিরবাবু একগাল হেসে বলে উঠলেন “গুড মর্নিং, ব‍্যানার্জী দা” এত সকাল সকাল কোথায় চললেন ? তাও আবার পায়ে হেঁটে। উফফ কি আপদ, যে ভয় পাচ্ছিলেন ঠিক সেটাই হলো।মিত্তিরবাবু যদি বুঝতে পারেন সারা আমেদাবাদে বলে বেড়াবেন। উনি খবর তৈরি করেন। কি জবাব দেওয়া যায় এই ভাবতে ভাবতেই বলে উঠলেন “গুড মর্নিং মিত্রদা, এই সামনেই যাব , কাঁকারিয়া লেকের কাছে এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করবো। আসলে ও কলকাতা থেকে এসেছে কাজে। বলেছিলাম লেকটার কথা। এই আরকি। মিত্তিরবাবু শুনে মনে হয় বিশ্বাস করলেন। পরক্ষণেই বলে উঠলেন “গাড়ি থাকতে হেঁটে কেন ?”
– না, মানে গাড়িটা সার্ভিসের জন্য দিয়েছি।
– ও তাই বলুন। আমি তাই ভাবছি গাড়ি থাকতে ব‍্যানার্জীদা হাঁটছে কেন। বাঁ দিকের দরজাটা খুলে দিয়ে বললেন, ” নিন উঠে পড়ুন। আপনাকে ড্রপ করে দি। ওই পথেই যাব। ব‍্যানার্জীদাকে প্রায় একপ্রকার গাড়ির ভিতরেই টেনে নিলেন। দুচারটে কথা বলতে বলতেই কাঁকারিয়া লেকের কাছে গাড়িটা থামালেন। – নিন দেখুন আপনার কলকাতার বন্ধু কোথায় দাঁড়িয়ে আছে। আমি এগোলাম। পরে কথা হবে এই বলে মিত্তিরবাবু গাড়ি নিয়ে চলে গেলেন। ব‍্যানার্জীদা খানিকটা এদিক ওদিক তাকিয়ে ভাবলেন যাক আপদ গেছে। এবার লেকটার ধার দিয়ে হাঁটা শুরু করা যাক। ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছে। গরমকালের ভোরের এই হাওয়া শরীর জুড়িয়ে দেয়। বেলার দিকে এই মনোরম আবহাওয়া পৌঁছে যাবে ৪৩-৪৪ডিগ্রী সেলসিয়াস। লু বইবে। দেখলেন বেশ কিছু লোকজন হাঁটাহাঁটি করছে। কেউ জগিং করছে। কিছু পেটমোটা ধুমসো ঘি খাওয়া চেহারার লোকজন আছে আবার ছিপছিপেও আছে। তবে গুজরাতিরা সাধারণত ওত মোটা হয়না। ধুমসো গুলো মনেহয় মাড়োয়াড়ি। সামনে ডাব বিক্রি করছে। মিত্তিরবাবু কে সামাল দিতে গিয়ে জল তেষ্টা পেয়ে গেছে। একটা ডাব কিনে স্ট্র দিয়ে দু চুমুখ দিয়েছেন সবে।
– আরে ব‍্যানার্জী সাব, আপ কাঁকারিয়া কা পাস, সুভাহ সুভাহ।
কি জ্বালা ! শর্মাজি। ওনাদের বড় ক্লায়েন্ট। নিউ ক্লথ মার্কেটের বড় ব‍্যবসায়ী। মাড়োয়াড়ি। খুব ভাল ব‍্যবহার। চোঁ চোঁ করে ডাবের জলটা শেষ করে পয়সা মেটাতে মেটাতে বললেন
–এয়সা হ‍্যায় শর্মাজি, ম‍্যায় কাঁকারিয়া মে আয়ে থে।
– ওতো সমঝ গয়া ব‍্যানার্জী সাব। হেল্থ কে লিয়ে বহুত আচ্ছা হ‍্যায়। পয়দল আয়ে হোঙ্গে, চলিয়ে আপকো ঘর ছোড় দেতা হুঁ গাড়িমে। ম‍্যায় আপকা ঘর পহেচানতা হুঁ। মেরা ঘর যানেকা রাস্তা ওহি হ‍্যায় । কিছু বলবার আগেই গাড়িতে তুলে নিলেন ইতস্তত অবস্থায় ব‍্যানার্জীদাকে। যতই হোক বড় ক্লায়েন্ট। যেতে যেতে দুএকটা বড় ডিলের কথা হতেও পারে। গাড়ি থেকে নেমে বাই করলেন ব‍্যানার্জীদা। শর্মাজি হাত নেড়ে বললেন
– সামকো চার বাজে অফিস মে আইয়ে। যো যো নয়া ডিজাইন আয়া উসকা স‍্যাম্পেল লে কর আইয়েগা জরুর। বাই।
ব‍্যানার্জীদা পেটে হাত বোলাতে বোলাতে ডোরবেল বাজালেন। শিখা স্কুলে যাবার জন্য তৈরি হচ্ছে।
–কি গো এত তাড়াতাড়ি চলে এলে। হাঁটলে, না দৌড়লে ? একটু ঘেমেও যাওনি। এভাবে তোমার ভুঁড়ি জীবনেও কমবেনা।

– কি বলছো কি, আমার তো বেশ হালকা হালকা লাগছে প্রথম দিনই। দাও দিকি এক কাপ চা খাই। ভোর বেলাটা এত সুন্দর হয় আজ না উঠলে জানতেই পারতাম না।

©️সোমনাথ চ‍্যাটার্জী

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top