ধারাবাহিক প্রবন্ধ : কবিতার রূপকল্প: সৌম্য ঘোষ

 অধ্যাপক সৌম্য ঘোষ

               কাজী নজরুল ইসলামের আবির্ভাব যেন তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা “ধূমকেতু”র নামের মতোই আকস্মিক। সচ্ছল হিন্দু মধ্যবিত্তই যেখানে বাংলা কাব্যের স্রষ্টা , সেখানে নজরুল উঠে এলেন দরিদ্র মুসলিম পরিবার থেকে । পাননি নিয়মিত শিক্ষা । দু’বছরের সৈনিক জীবনের যে অভিজ্ঞতা তিনি অর্জন করেছিলেন, তেমন অভিজ্ঞতা বাঙালি কবিদের জীবনে জোটে না । উদ্দাম ভাবাবেগ অদম্য প্রাণশক্তি নিয়ে বাংলার কাব্য প্রাঙ্গণে তাঁর আবির্ভাব  । তিনি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন বলা হয় বটে, কিন্তু তাঁর উদ্দাম স্বতঃস্ফূর্ততা কোন প্রভাবকে মেনে নেয়নি । তিনি আপনাকে ছাড়া কাউকে কুর্নিশ করেননি। তাঁর কাব্যে দৃঢ়তা আছে, বলিষ্ঠতা আছে । কিন্তু তাঁর সেই কবিতার অদম্য আবেগকে তিনি সুবিন্যস্ত করতে পারেননি ।
                    কোন সাম্প্রদায়িক ভাবনা এই কবিকে স্পর্শ করতে পারেনি । তিনি কবিতায় শপথ করেছেন,’যেদিন উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশকে মুখরিত করবে না, সেই দিন তিনি শান্ত হবেন।’ সমাজ-রাজনীতি সচেতন ছিলেন বলেই অনেক সমসাময়িক প্রসঙ্গ নিয়ে তিনি কবিতা লিখেছেন । কলাকৈবল্যবাদে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না । বলেছেন ,
 “বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই নবী'”।
আর সেই কারণেই তিনি এত লোকপ্রিয় হয়েছিলেন।
তাঁর এক হাতে যেমন কবির ‘রণতূর্য ,তেমনি অন্য হাতে ছিল বাঁশের বাঁশরী ।’ প্রেমের কবিতায় তিনি
” বিহ্বল যৌবনের রূপাঙকনে ব্যগ্ৰ । “
প্রেমের অতৃপ্ত পিপাসা তাঁর কবিতায় বারেবারে পাই ।
                    “কস্তুরী হরিণসম
আমারই নাভির গন্ধ খুঁজে ফেরে; গন্ধ-অন্ধ মন মৃগসম
                    আপনারই ভালোবাসা
আপনি পিইয়া চাহে মিটাইতে আপনার আশা!”
                   তাঁর গজল গান গুলিকে চমৎকার প্রেমের কবিতা বলে আস্বাদন করা চলে । কবিতায় বিশুদ্ধতার সমর্থক বুদ্ধদেব বসুর মতে, নজরুলের নির্বাচিত গানের মালা মহাকাল কন্ঠে ধারণ করে ধন্য হবে ।
             বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং আধুনিক বাংলা গানের জগতে ‘বুলবুল’ নামে খ্যাত। রবীন্দ্রনাথের অনুকরণমুক্ত কবিতা রচনায় তাঁর অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ব্যতিক্রমধর্মী কবিতার জন্যই ‘ত্রিশোত্তর আধুনিক কবিতা’র সৃষ্টি সহজতর হয়েছিল বলে মনে করা হয়। নজরুল সাহিত্যকর্ম এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে অবিভক্ত বাংলায় পরাধীনতা, সাম্প্রদায়িকতা, সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, মৌলবাদ এবং দেশি-বিদেশি শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন। এ কারণে ইংরেজ সরকার তাঁর কয়েকটি গ্রন্থ ও পত্রিকা নিষিদ্ধ করে এবং তাঁকে কারাদন্ডে দন্ডিত করে। নজরুলও আদালতে লিখিত রাজবন্দীর জবানবন্দী দিয়ে এবং প্রায় চল্লিশ দিন একটানা  অনশন করে ইংরেজ সরকারের জেল-জুলুমের প্রতিবাদ জানিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন এবং এর সমর্থনে নোবেল বিজয়ী  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে গ্রন্থ উৎসর্গ করে শ্রদ্ধা জানান ।         নজরুলের কবিতায় উচ্চারিত প্রযুক্ত শব্দ বরাবরইসাম্যের, দারিদ্র্যের,উৎপীড়নের এবং দলিত ও ব্রাত্যজনের পক্ষে ।কবির অাপোষহীন অবস্থান নিশ্চিত করে।তাই সাম্যবাদী কবির কণ্ঠে নির্দ্বিধতায় শব্দিত হয়:
” গাহি সাম্যের গান–
যেখানে আসিয়া এক হ‘য়ে গেছে
সব বাধা–ব্যবধান,
যেখানে মিশেছে হিন্দু–বৌদ্ধ–মুসলিম–ক্রিশ্চান।
(‘সাম্যবাদী‘১৯২৪)
কবির এসকল অন্তর্ভেদী প্রসঙ্গ প্রান্তিক  গণমানুষেরএবং নিরন্ন জনগোষ্ঠীর চিরদুঃখের  পাণ্ডুলিপি সফল উৎকর্ষজাত শৈল্পিক বিভায়  উদ্ভাসিত। ‘ আমারকৈফিয়ত‘এ তাঁর বিদগ্ধ বিজ্ঞাপনে সেই অবিনাশী সুরই প্রতিধ্বনিত হতে দেখা যায় :
“পরোয়া করি না,বাঁচি বা না–বাঁচি
যুগের হুজুগ কেটে গেলে।
মাথার উপর জ্বলিছেন রবি,
রয়েছে সোনার শত ছেলে।
প্রার্থনা ক‘রো–যারা কেড়ে খায়
তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস।
যেন লেখা হয় আমার রক্ত–লেখায় তাদের সর্বনাশ।
(‘সর্বহারা‘-১৯২৬)
এ ধারায় নজরুলের দ্রোহী সত্তা এবং তাঁর  নৈর্ব্যক্তিকচেতনা; স্বাতন্ত্র্য কবিস্বভাবের ব্যক্ত বিমূর্ত শক্তি,সমকালে দৃশ্যমান ধারায় উৎপীড়ক,
জুলুমবাজের বিপক্ষে অবস্থান নেয়–এবং তাদের সর্বোচ্চ ধ্বংস কামনা করে।এ প্রসঙ্গে সমালোচক সঞ্জয় ভট্টাচার্য বলেন:
 ‘যুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে কবি–সৈনিকের যা স্বাভাবিক পরিণতি,নজরুল ইসলামেরতাই হয়েছিল।
…কবি সৈনিক নজরুল ইসলামের তাই কবি– বিদ্রোহী হয়ে ওঠা তাঁর জীবনেরই একটি  যুক্তিযুক্ত পরিণতি।‘
(শ্রী সঞ্জয় ভট্টাচার্য, ‘কবি নজরুল‘-১৯৫৭,পৃ.২৯)
নজরুল চির তারুণ্যকে আবাহন করেছেন  নিষ্ঠতায় দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে। তাঁর  ‘জঞ্জির‘(১৩৩৫) এর‘অগ্রপথিক‘ কবিতায় সেই  প্রত্যয়ী সুর স্পন্দিত হয়েছে দক্ষতায় :
“নাগিনী–দশনা রণরঙ্গিণী শস্ত্রকর
তোর দেশ–মাতা,তাহারি পতাকা তুলিয়া ধর। “
বস্তুত ‘কৃষ্ণকণ্ঠ‘ কবি নজরুল তাঁর মন্থিত বিষ  থেকে নিজেকে উৎসর্জন করতে চেয়েছেন  স্বদেশ, মানুষ আর মানবতার জন্য। এরই ধারাবাহিক ক্রমায়ত–বিদ্যমান সমাজ বাস্তবতায় চির আবেগের অন্তঃপুরে চিরউদ্দাম, চিরচঞ্চল অনুধ্যানগুলো দেশপ্রেম,  দ্রোহএবং পাশাপাশি মানুষের প্রতি চির প্রেমের কোমলোজ্জ্বল অনুভূতি উদ্ভাসিত  হতে দেখা যায়।
এভাবেই তাঁর ‘উচ্ছ্বসিত সৌন্দর্যপিপাসু কবিমনের‘

নন্দিত উদ্ভাস স্পষ্টীকৃত হয় কবিতার গীতিময় পঙক্তিতে। (শ্রী ভূদেব চট্টোপাধ্যায় ‘বাংলাসাহিত্যের সংক্ষিপ্তইতিহাস‘,পৃ. ৩০৯)        ‘উচ্ছল‘ কবি–নজরুলের আবেগ থেকেই তাঁর হাতধরে বেরিয়ে আসলো চিত্তরঞ্জনের জন্য ‘’চিত্তনামা‘!

এর অব্যবহিত পরে, অসামান্য দক্ষতায়,অনায়াসঅনবদ্যতার ছোঁয়ায়  কালজয়ী অমর কাব্যগ্রন্থ‘অগ্নিবীণা‘(১৯২২); যা তাঁর দ্রোহের সন্দীপিত সত্তার অনন্য দ্যোতক। বলা যায় আবেগের নৈর্ব্যক্তিকতায় কবিস্বভাবের অন্যতম এক দীপ্ত অভিব্যক্তি।অতঃপর তাঁর কবিচেতনার ক্রমোৎকর্ষ– কবিতার অন্তঃপুরেঅবাধ –অবিরাম জীবন ও  বাস্তবতার নিরীক্ষিত আলেখ্যকে তুলে ধরে। রচনায় তুলে আনেন সময়ের দৃশ্যমান চিত্র!

অনুভবের ধারাবাহিকতায় কবি সমকালের ‘খিলাফত আন্দোলনের‘(১৯২০)সম কালীন সমাজবাস্তবতায় বিদ্যমান অনুষঙ্গগুলো তুলে ধরতেউপস্থাপন করেন ‘কামালপাশা ‘(১৯২১)’শাত–ইলআরব‘(১৯২১)এর মতো অজর কবিতা; যেখানেনিষ্ঠারসঙ্গে উপস্থাপিত হয়েছে  অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানবিক চিত্র।এখানে নজরুল হিন্দু–মুসলিমের মৈত্রীসাধনের চিত্রকে তুলে এনেছেন বিমূর্ত আবেগের নিত্য সত্যোপলব্ধির ভেতর এবং তা–অকৃপণ প্রকাশ করেছেন অসম্ভব দৃঢ়তার সাথে।বস্তুত নজরুলের‘আবেগের আবেদনই তাঁর প্রধান বৈশিষ্ট্য।(‘ হরপ্রসাদ, ‘কবিতার বিচিত্র কথা‘ পৃ.৩৬৫)।

অধ্যাপক সৌম্য ঘোষ

কবিতার রূপকল্প : পর্ব ১২
  || রবীন্দ্র পরবর্তিকাল এবং আধুনিক কবিতার আন্দোলন ||
   ‘কল্লোল’ ও তার সহযোগ ‘উত্তরা’ ‘, কালি- কলম’, ‘ধূপছায়া’ ,।  ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘প্রগতি’ এবং সামান্য পরে প্রকাশিত ‘পরিচয়’ পত্রিকা কে কেন্দ্র করে শুরু হয় রবীন্দ্র পরবর্তী আধুনিক কবিতার আন্দোলন। বিশ শতকের তৃতীয় দশকে এই আন্দোলনের সূচনা। ১৯২৪ থেকে ১৯৩০ এই কালপর্বে প্রকাশিত হয়েছিল বুদ্ধদেব বসুর ‘মর্মবাণী’ ও  ‘বন্দীর-বন্দনা’,  অমিয় চক্রবর্তীর ‘কবিতাবলী’,  জীবনানন্দের ‘ঝরা পালক’ ,
 সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘তন্বী’ , অজিত দত্তের ‘কুসুমের মাস’ ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থ । ১৯৩০ সালে প্রকাশিত হয় সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘কাব্যের-মুক্তি’ প্রবন্ধ।

                  যদিও বোদলেয়ার থেকে পশ্চিমে আধুনিক কবিতার সূত্রপাত মনে করেন অনেকে তবু প্রথম মহাযুদ্ধের পরই ইউরোপের পোড়ো জমি তে আধুনিক কবিতার জন্ম হয় । আর তার প্রভাবে গড়ে ওঠে বাংলা আধুনিক কবিতার ধারা। এই ধারার প্রধান কবিরা প্রত্যেকেই ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন । সুধীন্দ্রনাথ আধুনিক কবিদের “মাধুকরী ব্রতনিষ্ঠ পরিব্রাজকের” সঙ্গে তুলনা করেছিলেন । যাদের দ্বারে দ্বারে ভূক্তাবশিষ্ঠ ভিক্ষা করতে হয় । অতুলচন্দ্র গুপ্ত এবং স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ, আধুনিক কবিতা কে ‘পশ্চিমের প্রতিধ্বনি মাত্র’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন । প্রকৃতপক্ষে, বিশ শতকে অসহযোগ আন্দোলন বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক বিপর্যয় , বেকার সমস্যা আমাদের দেশের অনুভূতিপ্রবণ শিক্ষিত যুবকদের বিশ্ববীক্ষা কে বিচলিত করেছিল । এই বিপর্যস্ত সময়ে শিল্পীকে খুঁজতে হয় প্রকাশের নতুন প্রকরণ ভঙ্গিমা এবং শৈলী।

        ‌             আধুনিক কবিতা আন্দোলনের নেপথ্যে আরো একটি জোরালো যুক্তি ছিল, রবীন্দ্র বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার তাগিদ । তৎকালীন সমাজে তীব্র অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক সমস্যার মধ্যে বাস করে তরুণ কবিদের পক্ষে রবীন্দ্র ভাবনা ও নন্দনতত্ত্বে বিলাসিতা করা সম্ভব ছিল না । সেটাই ছিল সময়ের দাবী। তীব্র সমস্যাজর্জরিত যুবক সম্প্রদায়ের কাছে রবীন্দ্রনাথ ‘অনাত্মীয়’ ঠেকেছিল। রবীন্দ্র অনুসারী কবিকুলের রবীন্দ্র রোমন্থন অসহনীয় ঠেকেছিল । তাঁরা বুঝেছিলেন, কাব্যভাষার এই রবীন্দ্র পুনরাবৃত্তি বাংলা সাহিত্যের পক্ষে ক্ষতিকর ।

বুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন,  “বাঙালি কবির পক্ষে , বিশ শতকের তৃতীয় ও চতুর্থ দশকে, প্রধানতম সমস্যা ছিলেন রবীন্দ্রনাথ।” তথাপি, বুদ্ধদেব বসু, অমিয় চক্রবর্তী, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত এনারা ছন্দে কাব্যভাষ্যে সেই রবীন্দ্রনাথকেই শিরোধার্য করতেন । প্রকৃতপক্ষে, কবি জীবনানন্দ দাশ ই সর্বপ্রথম সম্পূর্ণভাবে রবীন্দ্র প্রভাব কাটিয়ে সম্পূর্ণ নতুন শৈলী ও আঙ্গিকে আত্মপ্রকাশ করলেন । সেই হিসাবে, রবীন্দ্রনাথের পরবর্তী ধারা জীবনানন্দ দাশ । অন্য কেউ নন।

                     গণতান্ত্রিক সভ্যতায় গড়ে উঠেছে মহাকায় নগর । আধুনিকতার জন্ম নগরে। আধুনিক কবিতার প্রেক্ষিত নাগরিক। আধুনিক বাংলা কবিতাও বিশেষভাবে কলকাতা শহরের কবিতা । ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে আধুনিকতার জন্ম। কিন্তু এই ব্যবস্থার উন্মার্গগামিতা, পরিবেশ বিরোধিতা, বিশৃঙ্খলা তৎকালীন তরুণ কবিরা মেনে নিতে পারেননি। এই পর্বের নাগরিক কবিরা ইতিহাস সচেতন । মনীষা তাঁদের কবিতার মৌলিক লক্ষণ । তাঁদের কবিতা স্থাপত্যের মত, স্বভাব কবি নন। পাঠকদের কাছে এই কবিতা সচেতন মনোযোগ দাবি করে । এই সব কবিতায় আছে চেতন-অবচেতন -অচেতন ,  বাস্তব-পরাবাস্তব কল্পনা, মিথ ও তীর্যক ভাষণ । তাই অমনোযোগী পাঠকের কাছে এই সকল কবিতা হয়ে উঠতে পারে দুর্বোধ্য । এই ভাবেই শুরু হল রবীন্দ্র- উত্তর আধুনিক কবিতা । যাকে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন,  ‘রবীন্দ্র-ধুত্তোর’ কবিতা ।
                      আধুনিক রবীন্দ্র উত্তর সাহিত্য বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ  “সাহিত্যে নবত্ম”(১৯২৭) এবং “আধুনিক কাব্য”(১৯৩৩) প্রবন্ধে তাঁর প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলেন। তিনি এই আধুনিকতাকে “বেআব্রুতা ও নির্বিচার অলজ্জতা” বলে মনে করতেন। আধুনিকতার বিরুদ্ধে উঠেছিল পাশ্চাত্য অনুকরণের অভিযোগ ।  ” বাঁশরী” নাটকে, তিনি নায়িকার মুখ দিয়ে বলিয়েছিলেন, আধুনিক লেখকদের সাহিত্য ‘বানিয়ে তোলা লেখা’, ‘বই পড়া লেখা’ । তিনি আধুনিক সাহিত্যকে মনে করতেন,
” ক্ষণজীবী বাক্য পতঙ্গের গুঞ্জন ধ্বনি ।” আধুনিক কবিদের বাস্তবতার দোহাই রবীন্দ্রনাথ মানেননি।
তিনি মনে করতেন, “আধুনিকতা হচ্ছে দারিদ্র্যের আস্ফালন, আর লালসার অসংযম ।”আধুনিক কবিতার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের আরো একটি অভিযোগ ছিল, “উগ্র মেধার প্রতাপ ও বিস্ময়কর দুর্বোধ্যতা ।”

                       স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর পূর্ববর্তী কবিদের,’ মধুসূদন -হেমচন্দ্র -নবীনচন্দ্রের ‘ কাব্য সংস্কার ভেঙে নতুন আঙ্গিক ও শৈলীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন । তৎকালীন সমালোচকেরা রবি ঠাকুরের এই কাব্য রীতিকে খোলা মনে মেনে নিতে পারেননি। তিনি নিজেও স্বীকার করেছিলেন, সাহিত্যও বাঁক নিতে পারে । তিনি নিজের “শেষের কবিতা” য় অমিত রায়ের মুখ দিয়ে বলেছিলেন,   “এখন থেকে ফেলে দাও মন ভোলাবার ছলা-কলা ছন্দোবদ্ধ ।”   “বিশ্বকে নির্বিকার তদ্গত ভাবে দেখতে চায় আধুনিক কবিতা ।

” কবিতার ইতিহাস যদি সত্যিই হয় তা টেকনিকের ইতিহাস, তাহলে তারই গরজে পদ্যছন্দের  “সলজ্জ অবগুন্ঠন প্রথা” ভেঙে গদ্যের স্বাধীন ক্ষেত্রে স্বাভাবিক সঞ্চালনের জন্য উদ্ভাবিত হয় গদ্য ছন্দ । একথা তিনি নিজেই বলেছিলেন একসময়।  রবীন্দ্র উত্তর আধুনিকতার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথ খোলা মনে আধুনিকতার সদর্থক দিককে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন ।।

অধ্যাপক সৌম্য ঘোষ । চুঁচুড়া

কবিতার রূপকল্প : পর্ব ১৩

|| রবীন্দ্র পরবর্তিকাল এবং আধুনিক কবিতার আন্দোলন ||

১৯০০ সালের প্রারাম্ভে বা তার আগে-পরে বাংলা সাহিত্য জগতে দিকপাল নক্ষত্র গনের আবির্ভাব হয়েছিল । এঁদের মধ্যে জীবনানন্দ দাশ বয়সে একটু বড় ( ১৮৯৯–১৯৫৪) । সুধীন্দ্রনাথ দত্ত (১৯০১–৬০) , মনীশ ঘটক (১৯০২–৭৯), অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত (১৯০৩–৭৬), জসীমউদ্দীন (১৯০৩–৭৬), অন্নদাশঙ্কর রায় (১৯০৪–), প্রেমেন্দ্র মিত্র (১৯০৪–৮৮), অজিত দত্ত (১৯০৪–), বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮– ৭৪) , সঞ্জয় ভট্টাচার্য (১৯০৯–৬৯) এবং বিষ্ণু দে (১৯০৯–) ইত্যাদি।

আধুনিক কবিদের মধ্যে বয়সের সবচেয়ে বড় জীবনানন্দ দাশ। রবীন্দ্র পরবর্তী কালের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে অবিসংবাদিত স্বীকৃতি পেয়েছেন। কবি জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে আলোচনা একটু পরে করবো। প্রথমে যার কথা বলতে চাই, তিনি স্বনামখ্যাত প্রেমেন্দ্র মিত্র। প্রেমেন্দ্র মিত্র, সম্পূর্ণ আধুনিক কবি কিনা এ নিয়ে নানাজনের সংশয় আছে। কিন্তু গল্পকার হিসেবে তাঁর আধুনিকতা প্রবাদপ্রতিম।

কবি হিসেবে প্রেমেন্দ্র মিত্র যেন নজরুল ও আধুনিকদের মধ্যে যোজক । দুই সময়কালের মধ্যে তিনি সেতু-বন্ধন করেছিলেন। বলা যেতে পারে, আধুনিকতার ভূমিকা তিনিই রচনা করেছিলেন। তাঁর কবিতায় রচনাগত সরলতা তাঁকে জনপ্রিয়তা দিয়েছে। রবীন্দ্র পরবর্তী কালে গদ্যছন্দের চর্চায় তিনি সফল হয়েছিলেন। তাঁর কবিতায় উৎকণ্ঠা বা সমাজ বিরোধিতা নেই। নেই বৈয়াকরণিক বিপর্যয় বা বাগভঙ্গির তীর্যকতা । তাঁর কবিতা সরল আশাবাদ দ্বারা প্রাণিত । তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ “প্রথমা” চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল :

“এ মাটির ঢেলা কবে যে ছুঁড়িল সূর্যের পানে ভাই
পৃথিবী যাহার নাম ?
লক্ষ্যভ্রষ্ট চিরদিন সে যে ঘুরিয়া-ঘুরিয়া ফেরে
সূর্যেরে অবিরাম ।”

কিম্বা,

“আমি কবি যতো কামারের আর কাঁসারির আর ছুতোরের ,
মুটে মজুরের —
আমি কবি যত ইতরের ।”

এই কবিতাকে কি ব্যঙ্গ করে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন তাঁর কবিতা “শৌখিন মজদুরি ।”

অনেক সময় তাঁর কবিতায় পাওয়া যায়, নজরুল সুলভ কাব্যিক বাগ্মিতা । প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতা আমরা পাই পরাজিত মানুষের প্রতি মানবিক করুণা এবং মুক্ত পৃথিবীর মানব ইতিহাসের হাতছানি :

” পৃথিবীর স্তরে স্তরে কত ঘুম অগাধ অধীর
সুমের, মেম্ফিস, উর, নিনেভে, ওফির
মরুর বালুকালুপ্ত গাঢ় ঘুম
কত নগরীর;
অন্ধকারে আজো তার ঢেউ ।”

শতাব্দীর সমান বয়সী কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত। তিনি আত্মমগ্ন নির্জনতার কবি ছিলেন না। তিনি মনে করতেন, সভ্যতার বাইরে ব্যক্তিসত্তার অস্তিত্ব বা মুক্তি নেই। ‘ব্যক্তিগত মনীষায় জাতীয় মানস’ ফুটিয়ে তোলাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। এলিয়ট বলেছিলেন, পোড়ো জমি আর ক্যাকটাসের কথা । সুধীন্দ্রনাথ বললেন, মরুভূমি আর ফণীমনসার কথা। “ভগ্ন সেতু নদীতে নদীতে/
মরু নগরে নগরে ।” তাঁর প্রথম কাব্য “তন্বী” । পরবর্তীকালে প্রকাশিত হয়, ‘অর্কেস্ট্রা’, ‘ক্রন্দসী’, ‘উত্তর ফাল্গুনী’, এবং’সংবর্ত’। শেষ কাব্য ‘দশমী’ ।

“অবশ্য অপ্রতিকার্য অন্তিম কুম্ভক:
অনুত্তার্য নাস্তির কিনারা ;
বৈকল্যের ষড়যন্ত্রে তুঙ্গী ধ্রুবতারা
ও মগ্ন চুম্বক ।”

কখনো লিখেছেন ,

“জন্মাবধি যুদ্ধে যুদ্ধে, বিপ্লবে বিপ্লবে
বিনষ্টির চক্রবৃদ্ধি দেখে, মনুষ্যধর্মের স্তবে
নিরুত্তর, অভিব্যক্তিবাদে অবিশ্বাসী, প্রগতিতে
যত না পশ্চাৎপদ , ততোধিক বিমুখ অতীতে।”
কখনো রোমান্টিক হয়ে যান,
“বাঁশির বর্বর কান্না, মৃদঙ্গের আদিম উচ্ছ্বাস ।”
কখনো লেখেন,
“তোমারে ভুলিবো আমি, তুমি মোরে, ভুলিবে
নিশ্চয়;
মদনের চিতানলে অনঙ্গের হবে আবির্ভাব..”

কবি অমিয় চক্রবর্তী (১৯০১–৮৬) রচনা ভঙ্গিতে রবীন্দ্রনাথ থেকে স্বতন্ত্র হলেও রবীন্দ্র ভাবনা মন্ডলের বাসিন্দা ছিলেন। তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘খসড়া’, এবং ‘একমুঠো’ প্রকাশের পরই তিনি পাঠকের নজরে আসেন। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কবিতার বই ‘অভিজ্ঞান বসন্ত’, ‘দূর যানি’, ‘পারাপার’, ‘পালাবদল’ ইত্যাদি ইত্যাদি। অমিয় চক্রবর্তীর কবিতায় হপকিন্সের প্রভাব লক্ষ্য করা যায় ।

“অন্ধকার মধ্যদিনে বৃষ্টি ঝরে মনের মাটিতে।
বৃষ্টি ঝরে রুক্ষ মাঠে, দিগন্তপিয়াসী মাঠে, স্তব্ধ
মাঠে,
মরুময় দীর্ঘ তিয়াষার মাঠে…”
তিনি লিখেছেন,

” শুধু জানি আগুন, আগুনের কাজ, সৃষ্টির
আগুন লাগলে প্রাণে
তীব্র হানে বেদনা জাগবার, আর্টের আগুন
মরিয়াকে টানে । ”
কবি অমিয় চক্রবর্তীর কবিতায় আমরা পাই এক মরমীয়াবাদ । পাই অলৌকিকতা। পাই সেক্যুলার আধ্যাত্মিকতা ।

“মেলাবেন তিনি ঝড়ো হাওয়া আর
পোড়ো বাড়িটার
ঐ ভাঙা দরজাটা।
মেলাবেন ।”
যিনি মেলান , তিনি ‘হে প্রভু ঈশ্বর মহাশয়।’

মহামন্বন্তরের বেদনায় তাঁর কবিতার আলো আজো অনির্বাণ:

“পাথরে মোড়ানো হৃদয় নগর
জন্মে না কিছু অন্ন–
এখানে তোমরা আসবে কিসের জন্য?….
আসো যদি তবে শাবল হাতুড়ি
আনো ভাঙাবার যন্ত্র
নতুন চাষের মন্ত্র। ”

কী অসাধারণ স্তবক !

কবি বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮–৭৪)

তিনি একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার, গল্পকার, অনুবাদক, সম্পাদক ও সাহিত্য-সমালোচক । বিংশ শতাব্দীর বিশ ও ত্রিশের দশকের নতুন কাব্যরীতির সূচনাকারী অন্যতম কবি । তবে সাহিত্য সমালোচনা ও কবিতা পত্রিকার প্রকাশ ও সম্পাদনার জন্য তিনি বিশেষভাবে সম্মাননীয়। ‘প্রগতি’ ও ‘কবিতা’ পত্রিকার সম্পাদক এবং ‘কবিতাভবন’ প্রকাশনার কর্ণধার হিসাবে আধুনিক বাংলা কবিতা আন্দোলনের প্রধান নেতা ও মুখ্য প্রচারক। তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘বন্দীর বন্দনা’ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কবি পরিচিতি খ্যাতি লাভ করে। পরবর্তীকালে তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ ‘কঙ্কাবতী’, ‘দময়ন্তী’, ‘শীতে প্রার্থনা: বসন্তের উত্তর’,
‘যে আঁধার আলোর অধিক’, ‘মরচে-পড়া পেরেকের গান’ প্রভৃতি। তিনি রোমান্টিক, অন্ত: প্রেরণায় বিশ্বাসী, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ আস্থাশীল। তাঁর কবিতা পড়ে স্বয়ং কবিগুরু প্রীত হয়েছিলেন ।
কাব্য জীবনের সূচনায় তিনি লিখেছিলেন :

“আমি যে রচিত কাব্য, এই উদ্দেশ্য ছিল না স্রষ্টার,
তবু কাব্য রচিলাম ; এই গর্ব বিদ্রোহ আমার।”

তিনি মনে করতেন, প্রকৃতি ও চৈতন্যের দ্বন্দ্বই আধুনিকতার মূলকথা । তিনি র‍্যাঁবো , বোদলেয়ার, হেরডারলিন , রিলকের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। প্রাচীন ভারতের সবচেয়ে রোমান্টিক কাব্য কালিদাসের ‘মেঘদুত’-এর অনুবাদ করেছিলেন। তাঁর অসামান্য ‘দময়ন্তী’ কাব্যগ্রন্থ চিরন্তন যৌবনের বন্দনা । তাঁর কবিতায় আছে প্যাশনের তীব্রতা।
“ঘুম নেই, স্বপ্ন নেই, দিন নেই,
কিছু নেই , কিছু নেই…..
আমার উন্মত্ত তীব্র, আত্মহারা
ভালোবাসা ছাড়া ।”
বুদ্ধদেব বসুর সবচেয়ে ভালো কবিতা সংকলন
“যে-আঁধার আলোর অধিক” । কেন উপমা, কেন ছন্দ, কিভাবে স্মৃতি বা মগ্নচৈতন্যে সঞ্চিত অভিজ্ঞতাপুঞ্জ থেকে তৈরি প্রেরণার তাড়নায় কবিতার জন্ম হয়, কিভাবে চৈতন্য সেই আবেগের তাড়নাকে বশীভূত করে , এইসব প্রশ্নের কাব্যময় জবাব খুঁজেছেন এই বইতে। কবির সঙ্গে কবির এই সংলাপের বিষয় কাব্যাদর্শ । তিনি বলতেন, প্রেরণা বিনা কবির গতি নেই , ‘ সারথি নিস্পৃহ যবে, সেইক্ষনে নিঃশেষ অর্জুন “।

বিষ্ণু দে
—————-
বিষ্ণু দে (১৯০৯–৮২) -র কবিতায় পাওয়া যায় এক বিবর্তন ধারা । তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ
‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ , ‘ চোরাবালি’ , ‘অন্বিষ্ট’, ‘ আলেখ্য’, ‘স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যৎ’, ‘ইতিহাসে ট্রাজিক উল্লাসে’ প্রভৃতি । তাঁর কাব্য জীবনে প্রথম পর্বে তিনি এলিয়টের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। পরবর্তীকালে তাঁর কাব্যে এলুয়ার, লোরকা, নেরুদা প্রভৃতির ছায়া নজরে পড়ে। তিনি লিখেছিলেন, “মানুষের অরণ্যের মাঝে আমি বিদেশী পথিক ।” তিনি প্রার্থনা করেন, “মৈনাক ডুবিয়ে দিক পৃথিবীর জনতাকে আজ।” উজ্জীবনের ইশারা বিখ্যাত কবিতা “ঘোড়সোয়ার”
এ গতিতীব্র অশ্বক্ষুর ধ্বনির মধ্যে:

“হে প্রিয় আমার, প্রিয়তম মোর,
আয়োজন কাঁপে কামনার ঘোর ।
কোথায় পুরুষকার ?
অঙ্গে আমার দেবে না অঙ্গীকার ?”

নাগরিক কবি সান্নিধ্য কামনা করেছেন প্রকৃতির,
“শহরের মন যায় থেকে থেকে ছোট সেই গ্রামে ।”
কবির প্রার্থনা তাই —– “জল দাও আমার শিকড়ে।”
যে বিষ্ণুদে প্রথম পর্বের কবিতায় বিদেশি পুরাণের অনর্গল ব্যবহার করতেন, পরবর্তীকালে তিনি ফিরে আসেন দেশজ পুরাণের কাছে । তাঁর কবিতায় আসে রূপকথা, দেশজ- প্রাকৃত বাচন, ‌কথ্য ভাষার ছন্দ ।

এই সময়ে অন্য কবিদের মধ্যে অন্যতম মনীশ ঘটক (১৯০২–৭৯) । তাঁর কাব্য গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘শিলালিপি’, ‘যদিও সন্ধ্যা’, ‘বিদুষী বাক’ ইত্যাদি। কবি মনীশ ঘটকের কবিতাতেও প্যাশনের তীব্রতা আছে ।
“হায় সখী , হায়
তুমি তো জানিলে নাকো সেই মৃগায়ায়
এক অস্ত্রে হত হলো মৃগী ও নিষাদ ।”

জসীমউদ্দীন
———————

এই সময় আমরা পেলাম কবি জসিমউদ্দিনকে । তিনি একাধারে কবি, গীতিকার, ঔপন্যাসিক ও লেখক। ‘পল্লীকবি’ উপাধিতে ভূষিত । জসীমউদ্‌দীন আবহমান বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে লালিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ আধুনিক কবি।ঐতিহ্যবাহী বাংলা কবিতার মূল ধারাটিকে নগরসভায় নিয়ে আসার কৃতিত্ব জসীমউদ্‌দীনের। তাঁর ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ , ‘ রঙ্গিলা নায়ের মাঝি’ ও ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ বাংলা ভাষার গীতিময় কবিতার উৎকৃষ্টতম নিদর্শনগুলোর অন্যতম। এগুলি দেশভাগের আগে প্রকাশিত হয় । তাঁর কবিতা বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তাঁর সঙ্গে কুমুদরঞ্জন মল্লিকের কিছুটা মিল আছে।

“তবুও গাঁয়ে নামলো না জল , গগনখানা ফাঁকা;
নিঠুর নীলের বক্ষে আগুন করেছে যেন খাঁ খাঁ ।”

ওনার কলম :
|| আমন্ত্রণ ||
—————————
“তুমি যাবে ভাই – যাবে মোর সাথে, আমাদের ছোট গাঁয়,
গাছের ছায়ায় লতায় পাতায় উদাসী বনের বায়;
মায়া মমতায় জড়াজড়ি করি
মোর গেহখানি রহিয়াছে ভরি,
মায়ের বুকেতে, বোনের আদরে, ভাইয়ের স্নেহের ছায়,
তুমি যাবে ভাই – যাবে মোর সাথে, আমাদের ছোট গাঁয়,…….”

এই সময়ে অন্য কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অজিত দত্ত (১৯০৭–৭৯) । অজিত দত্ত তাঁর কবিতায় এক নিপুণ রোমান্টিক সুর সংযোজন করেছিলেন । তাঁর সেই বিশিষ্টতা পাওয়া যায় তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘কুসুমের মাস’ ও ‘পাতাল কন্যা’গ্রন্থে :

” তুমি ফুল ভালোবাসো? লাল ফুল? চোখে
যাহা লাগে,
কঠিন সৌন্দর্যে যার নয়ন সে হয় প্রতিহত?
আমিও কুসুমপ্রিয় । আজিকে তো কুসুমের মাস
মোর হাতে হাত দাও, চলো যাই কুসুম-বিতানে।
বসিয়া নিভৃত কুঞ্জে কহিবো তোমার কানে কানে
কোন ফুলে ভরে আছি জীবনের মধু অবকাশ।”

তাঁর কাব্য নায়িকা মালতী । সেই মালতি যেন লোককথার রাজকন্যা। সনেট রচনায় অজিত দত্ত কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন।

অন্যান্য উল্লেখযোগ্য, কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, হেমচন্দ্র বাগচী (১৯০৪–), অন্নদাশঙ্কর রায় (১৯০৪–), নিশিকান্ত রায়চৌধুরী (১৯০৯–), সঞ্জয় ভট্টাচার্য (১৯০৯–৬৯) প্রভৃতি। মূলতঃ কথাসাহিত্যিক অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত কবিতার বইয়ের সংখ্যা মাত্র সাত । হেমচন্দ্র বাগচীর কবিতায় চেয়ে দেখার আনন্দ আছে । তাঁর কবিতার বই ‘দীপান্বিতা’ , ‘মানস বিরহ’ । অন্নদাশঙ্কর রায়ের খ্যাতি মূলতঃ ছড়াকার হিসেবে বেশি । তাঁর বিখ্যাত ছড়া —-

” তেলের শিশি ভাঙলো বলে খুকুর পরে রাগ করো
তোমরা যে সব বুড়ো খোকা ভারত ভেঙে ভাগ
করো
তার বেলা ?”

“পূর্বাশা”- পত্রিকার সম্পাদক কথাসাহিত্যিক সঞ্জয় ভট্টাচার্য কিছু ভালো কবিতা লিখেছিলেন। ‘সাগর ও অন্যান্য কবিতা’, ‘উর্বর উর্বশী’, ‘প্রাচীন প্রাচী’ প্রভৃতি তাঁর প্রধান কাব্যগ্রন্থ। তিনি তাঁর কাব্য জীবনে , এক এক পর্বে এক এক কবি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন ।

“এই আলো এই ছায়া যখন উধাও
বিকেলের উপকূলে বিকেলের শ্বাস ফেলে চুপচাপ
ঝাউ
ভালো-লাগা ভালো-লাগা মন—– নেই তা- ও
তখনো হয়তো কিছু থাকবে কোথাও ।।”

কবিতার রূপকল্প : পর্ব ১৪

 

কবিতার রূপকল্প : পর্ব ১৪

|| রবীন্দ্র পরবর্তী কাল এবং আধুনিকতার
আন্দোলন ||

সৌম্য ঘোষ

তিনি প্রকৃতির কবি, বিষণ্ণতার কবি । রবীন্দ্রোত্তর আধুনিক বাংলা কবিতায় তাঁর অবিসংবাদিত পরিচিতি নানাভাবেই প্রকাশ মুখর । রবীন্দ্র পরবর্তীকালে সর্বশ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। তিনি জীবনানন্দ দাশ । ১৮৯৯ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি বরিশালের এক শিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন জীবনানন্দ। জীবনানন্দ কবি কুসুমকুমারী দাশের পুত্র । জীবনানন্দের ঠাকুরদা সর্বানন্দ দাশগুপ্ত ছিলেন বরিশালের ব্রাহ্মসমাজ আন্দোলনের পুরোধা । পিতা সত্যানন্দ দাস একজন শিক্ষক । তিনি ছিলেন প্রবন্ধকার ও পত্রিকার প্রকাশক ।

কবির ৫৬ বসন্তের ছোট্ট এক টুকরো জীবন কেটেছে চরম দারিদ্র্য ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে । কর্মজীবনে স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে কোথাও থিতু হতে পারেননি । তিনি বহু কলেজে অধ্যাপনা করেছেন । ১৯৩৫ সালে বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র, ও সমর সেন একটি নতুন কবিতার পত্রিকা প্রকাশ করেন যার নাম “কবিতা” । প্রথম সংখ্যায় জীবনানন্দের “মৃত্যুর আগে” কবিতাটি প্রকাশ পায় ।

কবিতাটি পড়ার পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, “চিত্ররূপময়!” ১৯৩৮ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর “বাংলা কাব্য পরিচয়” নামক একটি কবিতার সংকলন সম্পাদনা করেন । এই সংকলনে তিনি জীবনানন্দ দাশের কবিতা নিয়েছিলেন । বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত “কবিতা” পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যাতে (১৩৪২) জীবনানন্দ দাশের অমর কবিতা ” বনলতা সেন” প্রকাশিত হয়। এই কবিতাটি বাংলা ভাষার অন্যতম জনপ্রিয় কবিতা ।

জীবনানন্দ দাশ বাংলা রূপকথার ছাঁচে গল্প বলার ধারায় কবিতায় লৌকিকতার আমেজ নিয়ে আনেন । মানব সভ্যতার ইতিহাস চেতনার সঙ্গে রূপসী বাংলার নিসর্গ প্রীতিকে চিত্রিত করেন ।

“কচি লেবু পাতার মতো নরম সবুজ আলোয়
পৃথিবী ভরে গিয়েছে এই ভোরের বেলা;
কাঁচা বাতাবির মতো সবুজ ঘাস– তেমনি সুঘ্রান
হরিণেরা দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে নিচ্ছে !
আমারো ইচ্ছা করে এই ঘাসের এই ঘ্রাণ হরিৎ মদের মতো
গেলাসে গেলাসে পান করি….. … ”

প্রকৃতির বুকেই তাঁর প্রেম ।তাই কবি তাঁর মানসী শঙ্খমালাকে খুঁজেছেন নক্ষত্রে, সন্ধ্যার নদীর জলে, জোনাকি দেহে ,ধানক্ষেতে ,অঘ্রাণের অন্ধকারে :

“খুঁজেছি নক্ষত্রে আমি কুয়াশার পাখনায়
সন্ধ্যার নদীর জলে নামে যে আলোক
জোনাকি দেহ হতে খুজেছি তোমারে সেইখানে ধূসর প্যাঁচার মতো ডানা মেলে অঘ্রাণের অন্ধকারে
ধানসিঁড়ির মত ধানে আর ধানে
তোমারে খুঁজেছি আমি নির্জন প্যাঁচার মতো প্রাণে।

স্বভাবে তিনি ছিলেন অন্তর্মুখী ; দৃষ্টিতে ছিল চেতনা থেকে নিশ্চেতনা ও পরচেতনার শব্দরূপ আবিষ্কারের লক্ষ্য । তিনি ইতিহাস সচেতনতা দিয়ে অতীত ও বর্তমানকে অচ্ছেদ্য সম্পর্ক সূত্রে এক করেছেন । জীবনানন্দ বাংলা কাব্য সাহিত্যের যে অজ্ঞাত পূর্ব ধারা আবিষ্কার করেছিলেন তা জীবনানন্দের সমকালীন সময়ের কাব্য রসিক কিংবা নন্দনতাত্ত্বিকরা অনুধাবন করতে পারেননি । তাই জীবদ্দশায় তিনি কবি খ্যাতি পাননি । তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ “বনলতা সেন” ১৯৫৩ সালে রবীন্দ্র পুরস্কারে ভূষিত হয় । ১৯৫৪ সালে তাঁর “শ্রেষ্ঠ কবিতা “গ্রন্থটির জন্য আকাডেমী পুরস্কার লাভ করেন ।

তিনি মনে করতেন, “উপমাই কবিত্ব ।” তাই অনর্গল উপমা ব্যবহারে তাঁর কবিতা সচিত্র । গ্রাম বাংলার প্রতি মুগ্ধ কবি বলতে পারেন—-

“বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ
খুঁজিতে যাইনা আর ।”

তাঁর সমালোচকদের উদ্দেশ্যে তিনি লিখেছিলেন—-

“অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ,
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চেয়ে দেখে তারা।”

২২শে অক্টোবর, ১৯৫৪ সালে এক ট্রাম দুর্ঘটনায় অন্যমনস্ক আত্মস্থ ঘরে ফিরতে চাওয়া
কবির পথচলা স্তব্ধ হয়ে যায় ।।

 কবিতার রূপকল্প:  পর্ব:১৫
        ||  রবীন্দ্র পরবর্তীকাল  এবং আধুনিক কবিতার  আন্দোলন ||

            এই পর্বে কবিতার রূপকল্প আলোচনা করার পূর্বে সেই সময়কার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আলোচনা করা জরুরি । তৎকালীন বিশ্ব পরিস্থিতি এবং অবশ্যই আমাদের দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ইতিহাস অনুধাবন না করলে , কবিতার আবহমানতাকে ধরা সম্ভব না ।
          ১৯৩৬ সালে শুরু হয় স্পেনের গৃহযুদ্ধ, ১৯৩৭ সালে জাপান আক্রমণ করে চীন দেশ । অতঃপর শুরু হয় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ । ১৯৪১ সালে হিটলার সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করে । সারা বিশ্বব্যাপী ফ্যাসিবাদ বিরোধী মানুষের ফ্রন্ট গঠিত হয় । আমাদের দেশের ভিতরেও পরিস্থিতি ছিল অগ্নিগর্ভ । চল্লিশের দশকে সারা ভারতবর্ষের সঙ্গে বাংলাদেশ ( অখন্ড বাংলা) উত্তাল হয়ে ওঠে । রাজনৈতিক বিক্ষোভ আলোড়িত করে সমস্ত দেশকে। প্রতিরোধ রচনায়  একত্র হয়ে ছিলেন রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে সংস্কৃতিকর্মীরাও । এই দশকে গান্ধীজীর ভারতছাড়ো আন্দোলন, আজাদ হিন্দ ফৌজের মুক্তি আন্দোলন, নৌসেনার বিদ্রোহ, ‘ডাক ও তার’ কর্মীদের হরতাল  । চূড়ান্ত মুহূর্তে পৌঁছানো দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম । সেই সময় ইংরেজ শাসকবর্গের চরম ঔদাসীন্যে ও হৃদয়হীনতা পঞ্চাশের মহামন্বন্তর  এবং ইংরেজ শাসকদের প্ররোচনায় হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা । এই শতকের শেষে দ্বিখণ্ডিত ভারতবর্ষের স্বাধীনতা এলো । পূর্ববঙ্গ এবং পশ্চিম পাকিস্তান থেকে উদ্বাস্তু স্রোত এসে আছড়ে পড়লো এই দেশে।
                    সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার তাঁর আত্মজীবনীতে , তৎকালীন সময়ের ভয়াবহতা কিছুটা বর্ণনা করেছেন । স্বাধীনতা লাভের পর হিন্দু-মুসলিম-শিখ-পাঠানদের মধ্যে যে রক্তক্ষয়ী ভয়ঙ্কর সংঘাত হয়েছিল, তাতে কয়েক লক্ষ মানুষের জীবন হানি হয় । প্রাণ রক্ষার প্রবল আকাঙ্ক্ষা সৃষ্ট বাস্তুত্যাগে জনতার বিশাল কাফেলাকে তিনি মানুষের হিমবাহ রূপে বর্ণনা করেছেন ।
                    সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশে রাষ্ট্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে সেই সময় কম্যুনিস্ট পার্টি বিপ্লবের  সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। শুরু হয় তেভাগা আন্দোলন। এই সমগ্র পরিস্থিতি চল্লিশ দশকের বাংলা কবিতাকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিলো । শিল্পকলার সাহিত্যের ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট পার্টি নিয়ন্ত্রণকারী ভূমিকা গ্রহণ করার চেষ্টা করে । এর সমর্থক ছিলেন ফরাসি কবি লুই
আরাগঁ  ।  শিল্প-কলা-সাহিত্যে রাজনৈতিক পার্টির
হস্তক্ষেপ  বুদ্ধদেব বসু , বিষ্ণু দে, অরুণ মিত্র মেনে নেননি।  এই সময়ের অভিঘাতে বদলে যায় বিষ্ণু  দের কবিতা , বুদ্ধদেব বসুর মতো কলাকৈবল্যবাদী কবিও লিখলেন :
“বৃহন্নলা, ছিন্ন করো ছদ্মবেশ ।”
                          প্রগতিপন্থী !
                          প্রগতিপন্থী এই কবি গোষ্ঠীর মধ্যে অগ্রণী ছিলেন সমর সেন (১৯১৬–৮৭) এবং সুভাষ মুখোপাধ্যায় (১৯১৯– ২০০৩) । কবি সমর সেন তাঁর আঠারো বছর বয়স থেকে ত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত মাত্র বারো বছর কবিতা লিখেছিলেন। প্রথম দিকে তিনি আধুনিক সভ্যতার বন্ধ্যাত্ব ও শূন্যতার কবি ছিলেন।
 ” শ্রান্ত হয়ে এলো অগণিত কত প্রহরের ক্রন্দন
    তবু আমার রক্তে খালি তোমার সুর বাজে ।”
তাঁর কবিতা পড়তে পড়তে মনে পড়ে এলিয়টের পদগুচ্ছ ” waste and void ” . তাঁর কবিতার ছন্দে আমরা পাই , ” চীনের গণিকা, মাতালের স্খলিত চিৎকার, লম্পটের পদধ্বনি, রেস্তোহীন
গুলিখোর , চিৎপুরের ঘাটের নারীদলের কথা । বাংলা গদ্যছন্দে তিনি অনবদ্য। তাঁর কবিতা নির্মেদ
নির্ভার , সরল ভাষা , কিন্তু একেবারে স্বকীয় । তিনি মনে করতেন, বিস্তীর্ণ নগরে যে আধুনিক সভ্যতার প্রতীক তার অবক্ষয় ও আসন্ন বিনাশ অবশ্যম্ভাবী । লিখলেন, ” আমাদের মৃত্যু হবে পান্ডুর মত । ” পান্ডুর অসংযত যৌনাচার এবং ধৃতরাষ্ট্রের সজ্ঞান অন্ধতা ।
 “তাই ঘরে বসে সর্বনাশের সমস্ত ইতিহাস
  অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের মতো বিচলিত শুনি,
  আর ব্যর্থ বিলাপের বিকারে বলি :
   আমাদের মুক্তি নেই , আমাদের জয়াশা নেই ।”
তাঁর চিত্রকল্প গুলি অসামান্য :
—– ” চাঁদ ওঠে জ্বলন্ত খড়্গের মত”।
—–  “এখানে সন্ধ্যা নামল শীতের শকুনের মতো”।
—–   “বন্য মহিষের আক্রোশে জগদ্দল মেঘ
          ঘন ঘন ডাকে ।”
—–  “উজ্জ্বল, ক্ষুধিত জাগুয়ার যেন
          এপ্রিলের বসন্ত আজ ।”
 তিনি মনে করতেন, অনুর্বর সভ্যতার ধ্বংস অনিবার্য, এবং তার ধ্বংসস্তূপ থেকে জন্ম নেবে নতুন সভ্যতা ।
 “কালের গলিত গর্ভ থেকে বিপ্লবের ধাত্রী
   যুগে যুগে নতুন জন্ম আনে ।”
সাহিত্য সংস্কৃতিতে রাজনৈতিক মতবাদের উগ্ৰ হস্তক্ষেপ তিনি পরবর্তীকালে মেনে নিতে পারছিলেন না । বরং তাঁর মনে হচ্ছিল , ব্যক্তিগত সততা বজায় রাখার মধ্য দিয়েই কবি হতে পারেন প্রগতিশীল ।  ফলে নিজের রাজনৈতিক দলের সহকর্মীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন । ব্যথিত কবি স্তব্ধ হয়ে গেলেন :
          ” শুনি না আর সমুদ্রের গান
       থেমেছে রক্তে ট্রামের বাসের বেতাল স্পন্দন
      ভুলে গেছি সাঁওতাল পরগনার লালমাটি…
    রোমান্টিক ব্যাধি আর রূপান্তরিত হয় কবিতায় “
                   সুভাষ মুখোপাধ্যায়
               —————————–—–
                  সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁর কবিতার বই “পদাতিক” নিয়ে আবির্ভূত হয়ে সাড়া ফেলে দিলেন। আর তিনি প্রথম থেকেই রাজনীতিকে করে নিলেন কবিতার বিষয়। সেই সময় রাজনীতিকে কবিতার বিষয় করা নিয়ে বুদ্ধদেব বসুসহ অন্যান্যদের দ্বিধা ছিল, কিন্তু শৈল্য কুশলী সুভাষ পেয়েছিলেন অকুণ্ঠ অভ্যর্থনা । তাঁর এই সব কবিতায় ছিল ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তারুণ্যের উদ্দীপনা ।
         “প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য
           ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা ।”
চল্লিশ দশকে শুরু হলো কবিতার শেষ চরণে আশাবাদী সার কথা বলা। তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা  ” মিছিলের মুখ ।”
          “বিস্রস্ত কয়েকটি কেশাগ্র
           আগুনের শিখার মত হাওয়ায় কম্পমান।
           তখন অপ্রতিদ্বন্দ্বী সেই মুখ
            নিষ্কোষিত তরবারির মত …..।”
এই কবিতায় প্রেম ও রাজনীতির অনবদ্য একাত্মতা।
                       অমরুশতক , হাফেজ, চর্যাপদ, গাঁথাসপ্তশতী থেকে শুরু করে সারা জীবন অনেক কবির কবিতা তরজমা করেছেন । তবে সবচেয়ে ফলপ্রসূ হয়েছিলেন তুর্কি কবি নাজিম হিকমতের কবিতা অনুবাদ করে। এরপরই তিনি লিখলেন “ফুল ফুটুক ” কবিতা গুচ্ছ । তাঁর জনপ্রিয় কবিতার স্তবক “ফুল ফুটুক না ফুটুক, আজ বসন্ত” । এই কবিতাগুচ্ছে আছে শহরতলীর চটকল কেন্দ্রিক বস্তি জীবনের সব চিত্রকল্প।একসময় যিনি ফুল খেলা নিয়ে বিদ্রুপ করেছিলেন তিনি পরবর্তীকালে সন্ধ্যামণি ফুল ফোটাবার কথা বললেন।   তাঁর ” কাল মধুমাস” আত্মজৈবনিক কবিতা যেখানে ফিরে আসে হারানো সব স্মৃতি।
“পদাতিক কবি” সুভাষ মুখোপাধ্যায় আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে জীবনের কথা লিখে গেছেন। তিনি জানতেন, ” নটেগাছ মুড়োলেও বীজ থেকে জন্ম দেবে মাটি ।”
       পদাতিক কবির স্মরনীয় কবিতা :
  ” শতাব্দী লাঞ্ছিত আর্তের কান্না
প্রতি নিঃশ্বাসে আনে লজ্জা;
মৃত্যুর ভয়ে ভীরু বসে থাকা, আর না –
পরো পরো যুদ্ধের সজ্জা।
প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য
এসে গেছে ধ্বংসের বার্তা,
দুর্যোগে পথ হয়, হোক দুর্বোধ্য
চিনে নেবে যৌবন আত্মা।”
কবিতা — ‘ বায়ে চলো ভাই , বায়ে চলো’
“বাঁয়ে চলো ভাই,
বাঁয়ে—
কালো রাত্রির বুক চিরে,
চলো
দুহাতে উপড়ে আনি
আমাদেরই লাল রক্তে রঙিন সকাল”।
               অরুণ মিত্র । কবি অরুণ মিত্র সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সমসাময়িক বটে, কিন্তু তিনি সুভাষের মত নিষ্ঠাবান রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না । কবি হিসেবে তিনি একেবারেই স্বতন্ত্র। তিনি অনুভব করেছিলেন, শিল্পসাহিত্য সৃজন একক সাধনার বস্তু ।  ‘ প্রান্তরেখা’ কবিতার পর , তাঁর লেখা প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল । এরপর তিনি ফ্রান্সে চলে যান । ফরাসি কবিতার সঙ্গে পরিচয় তাঁকে আপন পথে এগোতে আত্মবিশ্বাস যোগায় ।
ধ্যানলীন অরুণ মিত্রের কবিতা । স্বগতোক্তর  মত অন্তর্লীন কবিতা রচনা আদর্শ তিনি প্রধানত অর্জন করেছেন  স্যাঁ ঝন্ , পেরসে , পোল এলুয়ার  প্রভৃতির কাছ থেকে । তাঁর অসামান্য স্তবক–
 ” সমস্ত লাবণ্য শব্দেই ছেঁকে তোলা যাবে “
  ” আমি বাক্য দিয়ে আমার প্রেম প্রমাণ করেছি”
             কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
            ________________________
                  ২০২০ সাল কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মশতবার্ষিকী । আজীবন আধুনিক বাংলা কবিতায় তিনি যে কত প্রাসঙ্গিক, আজও তা তাঁর কবিতা পড়লেই বোঝা যায় । তাঁর সমস্ত উচ্চারণ, শব্দগুলির জন্ম যেন উঁচু  ঘাড় , ফোলানো শিরা , আর উঁচু পর্দা থেকে । কিন্তু তা বিশুদ্ধ কাব্যগুনে পুষ্ট । সমস্ত অসাম্যের বিরুদ্ধে, সমস্ত লাঞ্ছনার বিপরীতে তাঁর প্রচন্ড রণহুঙ্কার ধ্বনিত হয় । দেশভাগ, পার্টি ভাগ, খাদ্য আন্দোলন থেকে শুরু করে নকশালবাড়ি আন্দোলন, জরুরি অবস্থা, বন্দী মুক্তি আন্দোলন ——– তাঁর লড়াই,  তাঁর সংগ্রাম। পাশাপাশি মধ্যবিত্ত মন- মেজাজ- মানসিকতাকে চাবকে শাসনের পর বিধ্বস্ত দেহে তাঁর হৃদয় থেকে উৎসারিত রক্তমাখা শব্দ—- একটি নির্মল প্রেমের কবিতা ।
                         ঢাকাই টানে বাঙাল ভাষায় কথা বলতেন। কবিতা মাথায় এলে হাতের কাছে যা পেতেন—— তাতেই লিখে রাখতেন। এই ভাবেই একদিন লিখলেন কালজয়ী কবিতা :
 “মাটি তো আগুনের মতো হবেই
 যদি তুমি ফসল ফলাতে না জানো
 যদি তুমি বৃষ্টি আনার মন্ত্র ভুলে যাও
 তোমার স্বদেশ তাহলে মরুভূমি ।
 যে মানুষ গান গাইতে জানে না
 যখন প্রলয় আসে, সে বোবা ও অন্ধ হয়ে যায়।”
সরল সাদাসিধে জীবনযাপনে, নিজের আদর্শ,দ স্বাধীনতা ও সততার প্রতি দায়বদ্ধতায় অন্য কারো সঙ্গে যাঁর মেলেনা । তাই তাঁকে রাখা হয় , মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও ঋত্বিক ঘটকের পাশে। দেশভাগ তাঁকে আলোড়িত করেছিলো :
“আমার জন্মভূমিকে এখন আমি স্বদেশ বলতে পারিনা ।”
মুখোশ পরা মানুষ দেখতে দেখতে ক্লান্ত কবি লিখলেন :
“আসলে মুখোশ মোটেই বাইরের নয়। বরং ভিতরের
যাকে আমরা সত্তিকারের মুখ ভাবি
তেমন কিছুই মানুষের নেই।”
তাঁর আত্মমর্যাদা বোধ ছিল প্রখর। বলতেন, “কবি যত শক্তিমান ই  হন , তাকে ভালো মানুষও হতে হবে ।” একজন প্রকৃত বামপন্থী কম্যুনিস্ট । তাঁর উচ্চারণ স্লোগান হয়েও কবিতা , সোচ্চার হয়ে ওঠা মন্ত্র ;  কবিতার মন্ত্র :
“অন্ন বাক্য, অন্ন প্রাণ
 অন্নই  চেতনা
 অন্ন ধ্বনি, অন্ন মন্ত্র ,অন্ন আরাধনা ।”
স্বদেশের প্রতি তাঁর গভীর মমতা ঝড়ে পড়তো :
“তোর কি কোন তুলনা হয়?
 তুই ঘুমের মধ্যে জলভরা মেঘ,
 জাগরণে জন্মভূমির মাটি ।”
                    সুকান্ত ভট্টাচার্য
                  ————————–
                    দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ , মহামন্বন্তর , হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার রক্ত কলুষিত দিনগুলিতে যাত্রা শুরু করলেন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য ( ১৯২৬–৪৭) ।  আত্মপরিচয় দিয়ে তিনি লিখলেন, “আমি এক দুর্ভিক্ষের কবি,/ প্রত্যহ দুঃস্বপ্ন দেখি, মৃত্যুর সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি ।” দেশ যখন সাম্রাজ্যবাদ- বিরোধী আন্দোলনে উত্তাল, তখন সুকান্তর কবিতায় পেলাম পরাধীনতার বেদনা :
“এদেশে জন্মে পদাঘাতই শুধু পেলাম,
 অবাক পৃথিবী! সেলাম, তোমাকে সেলাম।”
তাঁর দ্যুতিময় ছত্র :
“ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়;
 পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি ।”
ইংরেজ কবি অডেনের “Night Mail” কবিতা থেকে বীজ এসে অঙ্কুরিত হলো সুকান্তর ” রানার ” ।
                     প্রগতি আন্দোলন প্রভাবিত আরো কয়েকজন কবি হলেন, বিমল চন্দ্র ঘোষ, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, সরোজ দত্ত, চঞ্চল কুমার চট্টোপাধ্যায় এবং দিনেশ দাস । বিমল চন্দ্র ঘোষ প্রথমদিকে কবিতা লিখলেও পরের দিকে তিনি বিখ্যাত গান রচনা করেছিলেন । যেমন,  ” উজ্জ্বল এক ঝাঁক পায়রা ” ,  ” ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস ” । কবি জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র র কবিতায় বিষ্ণু দের প্রভাব স্পষ্ট । উত্তরকালে  বিখ্যাত  নকশালপন্থী নেতা কবি সরোজ দত্ত ।
                     চল্লিশের দশকের প্রথমার্ধে কবি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন চঞ্চল কুমার চট্টোপাধ্যায় । তাঁর তিনটি কাব্য সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল।  চল্লিশ দশকের অন্যান্য স্বনামধন্য কবিরা হলেন ,  কিরণ শঙ্কর সেনগুপ্ত, মনীন্দ্র রায়, মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়, রাম বসু, অসীম রায় প্রভৃতি ।  কবি কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত র  মমতাময় আত্মস্থতা :
  ” অংকুর থেকে আস্তে আস্তে ফুল
     সময় লাগে
      বীজ থেকে আস্তে আস্তে ধান
      সময় লাগে…. ‌।”
এই কবিতার ব্যপ্তি ও  রেশ  চেতনায় গেঁথে যায়।
                  কবি মনীন্দ্র রায় দক্ষতার সঙ্গে কবিতা রচনা করেছেন । তাঁর কবিতার প্রধান বিষয় হল প্রবাহ কাল ।
” এই করতলে
   আয়ুর মতোই আমি কয়েকটি রেখায়
   বন্দি করে রেখেছি ত্রিকাল ।”
কি অসাধারণত্ব  !
                    কবি সিদ্ধেশ্বর সেন কবিতা লেখা শুরু করেন চল্লিশ দশকের কারফিউর রাতগুলিতে। তাঁর কবিতায় ভারতীয় ঐতিহ্য আত্মস্থ , শ্লোকের প্রতিধ্বনি । তিনি ধরতে চান কবিতায় চিরন্তন ধৈর্য :
 ” এই প্রাণময় গ্রহে , নৃত্যপর ঘুরণে, আহ্নিকে,
   মুক্তি চাই মানবতা , অবিচ্ছিন্ন সময়ের দিকে ।”

Leave a Comment

Your email address will not be published.