Story – Bapan Gope

Story -   Bapan Gope
আমাদের পাড়ার গেন্দু , বাড়ির সামনে দিয়ে গট গট করে হেঁটে যাচ্ছে। আমাকে তো চেনেন, খেয়ে কাম না থাকলে যা হয়, বারান্দায় বসে দিলাম ডাক। গেন্দু কিন্তু থামলো না, বাধ্য হয়ে একটা খিস্তি দিয়ে ডাকতেই সামনে এসে দাড়ালো। গেন্দুর পরিচয় দেওয়া হয় নি তাই না আমাদের পাড়ার পুরনো বাসিন্দা ওরা, ওরা তিন ভাই। গেন্দু ছোট , বিয়ে টিয়ে করে সংসারের দায়িত্ব নিতে চায় নি দেখে বিয়ে করে নি। 


আসলে পাড়ায় কানা ঘুচো সবাই আলোচনা করে গেন্দু কে কেও মেয়ে দিতে চায় না কাজ কম্ম নাই , সারাদিন রঘুর দোকানে মাগনায় চা আর রিন্টুর দোকানের ফাই ফরমাস খেটে বিনে পয়সায় গুটকা। এর বাইরে ওকে কেও কোথাও দেখেছে বলে বলতে পারবে না। বয়স কখনো কখনো ৩০ দেখায় আবার কখনো ৫০ দেখায় , ঠিক দেখে আন্দাজ করা মুশকিল। তবে ওর বাড়ির পাশের কাকা একদিন বলেছিলো ওর বয়স ৩৮. দেখতে অনেকটা গলায় রুমাল বাঁধা পুরনো সিনেমার প্রধান গুন্ডার পাস্ব চরিত্রের মতো।


সব সময় চেক শার্ট আর হাফ প্যান্ট ছারা ওকে পাওয়া যায় না। গায়ের রং দুধে আলতার মতো না হলেও একটু কম বেশি হবে হয়তো। সামনে আসতে প্রশ্ন ছুড়ে দিলাম, কি রে হন্ত দন্ত হয়ে কোথায় যাচ্ছিস? আর বলো না, আজকের সকাল টাই বিচ্ছিরি গেলো কেনো কি হলো ? ভোর রাতে একটা বাজে স্বপ্ন দেখেছি কি স্বপ্ন ? বাজে বলতে …. না না তোমার ওই মুচকি হাসি বন্ধ করো, আমি বোকা নই তবে খুব খারাপ স্বপ্ন দেখেছি। তাই অস্থির অস্থির লাগছে। 

আরে গেন্দু আমি কি খারাপ কিছু বললাম , স্বপ্ন টা কি ছিলো বলবি তো, সত্যি তো তোকে একটু অন্যরকম লাগছে। না থাক , ভোরের স্বপ্ন বলতে নেই, সবাই বলে। আমি চললাম দাদা। আরে গেন্দু ভোরের স্বপ্ন বললে বিপদ কাটে শুনে নে আমার মার কাছে। মা মা একটু শোনো তো এই দেখো গেন্দু কি বলে। ভোরের স্বপ্ন নাকি বলতে নেই। মা হাসি মুখে গেন্দু কে বললো ভোরের স্বপ্ন বলে ফেলতে হয়। তোমরা যতই বলো আমি এইটা বলতে পারবো না, খুব খারাপ স্বপ্ন

আরে বলবি তো স্বপ্ন টা কি? ততক্ষণে ভিতরে ভিতরে স্বপ্ন টা জানার জন্য বেশ উৎসাহ তৈরি হয়ে গেছে। স্বপ্নের কথা না শুনিয়ে ছাড়বোই না গেন্দু বুঝতে পেরেছে, স্বপ্নের কথা না বললেই ভালো করতো। এখন বিজয় দা কোনো ভাবেই ছাড়বে না দাদা বলো না, কাল রাত্রে খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়েছি।


হটাৎ রাত্রে দেখছি আমার শরীর ঠান্ডা লাগছে। আমি ভাবছি শীত তো চলে গেছে, কম্বল টাও এই তো সেদিন রোদ্রে শুকিয়ে পুরনো ভেঙ্গে যাওয়া স্কুল নিয়ে যাওয়া টিনের বাক্সের মতো দেখতে , পুরনো বাক্সে রেখে দিয়েছি। ওটা থাকলে বেশ ভালো হতো। শীত টাও যাই যাই করে যাচ্ছে না। ওকে যে কে আটকে রেখেছে। চারদিকে এমন একটা গুমোট ভাব যে ঠান্ডা লাগাটাই স্বাভাবিক। আমি এসব ভাবছি আর ওদিকে শরীরের উত্তাপ বাড়তে থাকলো।


একটা সময় আর থাকতে পারছি না। বিছানার চাদরের একটা অংশ টেনে কোনো রকম ভাবে গায়ে জড়িয়ে দিলাম। কিন্তু এতেও কাজ হচ্ছে না , উত্তাপ বেড়েই চলছে। কিছুক্ষণ পর ক্রমাগত হাঁচি আসছে, সাথে গলা খুশখুশ, মাথার যন্ত্রণা। তার পর শ্বাসকষ্ট। আমি পুরো ভয় পেয়ে গেলাম। এমনিতেই তো চারদিকে কি সব করুণা করুণা শুনছি। ভাবলাম সেরকম কিছু হলো কি না ভয় পেয়ে ঘেমে নেয়ে একসা। বিছানার চাদর ঘামের গন্ধ মেখে চারিদিকে কোবরার গন্ধ বিলীন করছে। এখন কি করবো? আমার কি হবে ? আমার হলে নাকি সবার হবে


কেও কাছে আসবে না। একটা সময় শীতলা মায়ের আশীর্বাদ হলে, বসন্ত হলে যেমন কেও কাওকে ছোওয়া ছুয়ী করতো না সেরকম নাকি। তখন তো অনেক নিয়ম করে থাকতে হতো। অনেক অনেক নিয়ম। বিছানায় বসে ভাবছি আর ঘামছি কেও শুনলে কি হবে, আমার করুণা হয়েছে এটা কাউকে জানতে দেওয়া যাবে না। বলে চুপ করে গেলো গেন্দু। আমি পুরো ঘর বন্দী অবস্থায় বেশ মজা পেয়ে চেপে ধরলাম। কি রে তারপর ? তারপর আর কি , পাশের বাড়ির পুতলির মা সেদিন বলেছিলো , তারামায়ের মন্দিরে গিয়ে ঘণ্টি আর কাসর বাজাতে সঙ্গে করুণা তুই যা , তুই যা বলে চেঁচাতে আমিও পুতলীর মায়ের কথা মতো দৌড়ে চলে গেলাম তারা মায়ের মন্দিরে

কিন্তু চাতালের গেট বন্ধ। আমি ভাবলাম গেট যখন বন্ধ তখন বাইরে থেকেই ভক্তি ভোরে চিৎকার করি , পরে না দুপুরের দিকে আসবো। বেশ বাইরে থেকেই কিছু না পেয়ে টিনের গেটের উপরেই পাথর ছুড়ে শব্দ করতে লাগলাম আর জোরে জোরে চিৎকার করে বলতে থাকলাম , করুণা তুই যা, যা করুণা যা তার পর চলে আসলাম। দুপুর হলো আবার মন্দিরে গেলাম কিন্তু গেট বন্ধ

ভাবলাম বিকেলে খুলবে কিন্তু বিকেলেও বন্ধ। নিরূপায় হয়ে গণেশ পণ্ডিত এর বাড়ি পৌঁছলাম। কিন্তু ততক্ষণে কাঁশি আর শ্বাসকষ্ট বেশ বেড়ে গেছে মুখে কি সব লাগায় মার্কস নাকি মাকস। ঠিক ওটা না পেয়ে পুরনো একটা রুমাল মুখে বেঁধে ছুটলাম। পণ্ডিত বললো এখন মন্দির বন্ধ থাকবে কিছুদিন লোক দাউন চলছে তাই এবার আমি তো বেশ ঘাব্রে গেলাম এখন কি হবে  


আমি রঘুর দোকানে বসে ঠিক শুনেছিলাম , কি সব কয়লা বাড়ির উঠোনে পাওয়া যায়, সেটা বার করে গায়ে মাখতে হবে। আবার কেও বলেছিলো যাদের একটি মাত্র পুত্র সন্তান সেই মায়ের থেকে জল চেয়ে খেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি বেশ চিন্তায় পরলাম এভাবেই রাত হলো , ভোর হলো , এক এক করে দুই দিন পার হলো কিন্তু উত্তাপ কমছে না , সাথে হাঁচি আর শ্বাসকষ্ট বাড়ছে বুঝতে পারছি আমাকে কিছু একটা করতেই হবে। আমি চিন্তা করছি ঘরে বসে হটাৎ মনে পড়লো মোস্তাক সেদিন বলেছিলো। 

ফলে চললাম মাসা মসজিদ এর চাতালের উদ্দেশ্যে। একটু দূরে হলেও অল্প সময়েই পৌঁছে গেলাম। কিন্তু কি , একটা বড়ো তালা চাতালের গেটে। আমি তো অবাক , ওই পথ দিয়ে অনেক গিয়েছি কোনোদিন এভাবে গেটে তালা দেখি নাই পাশেই মৌলবী সাহেবের বাড়ি পূর্বেই পরিচয় ছিলো বাড়িতে গিয়ে ডাকতেই বললেন এখন নাকি সব বন্ধ সরকারের কঠোর নির্দেশ ভিড় যাতে না হয় তার জন্য এই ভাবনা ভদ্র ছেলের মতো কাশতে কাশতে আর হাঁচি মারতে মারতে বাড়ি ফিরলাম


ফিরে দেখি সে কি কান্ড আমি বললাম, কি হলো বল, কি কান্ড ? আর বলো না দাদা, বাড়ি শুদ্ধ লোক। আমি ভাবছি বাড়িতে আবার কি হলো। তার পর যা হলো সত্যি আর বলে বোঝাতে পারবো না আরে গেন্দু কি হলো , তারপর কি হয়েছে বলবি তো কি আর হবে , পাড়ার গোকুল নেতা, দেবু পঞ্চায়েত , ফুল্লু মামা , আশা দিদি মনি , পুলিশ সবাই নাকি আমার অপেক্ষায়। তাদের নাকি গণেশ পণ্ডিত আর মাসা মসজিদ এর মৌলবী ইতিমধ্যে ফোন করে জানিয়েছে। আমি নাকি করুণায় আক্রান্ত। হটাৎ করেই মনে পড়লো মসজিদ থেকে বাড়ি আসার পথে সবাই কেমন জানি ভাবে তাকাচ্ছিলো। মনে হচ্ছিলো আমি চুড়ি ডাকাতি করেছি। এখন তো দেখছি সত্যি তাই


আশা দিদিমনি প্রথম বললো একমিটার দুর থেকেগেন্দু তোমাকে হাসপাতালে যেতে হবে। বাড়িতে থাকা নিরাপদ নয় আমি ভাবছি কি এমন হলো দুদিন আগে তো কেও হাসপাতালের কথা বলতো না। বলতো মন্দির বানানোর কথা, মসজিদ বানাবার কথা, বেসরকারি নার্সিং হোমের পরিষেবার কথা। এখন হাসপাতাল কেনো। কই কেও তো হাসপাতাল বানাবার কথা বলে না। এই তো সেদিন গোকুল নেতা বলেছিলো কোথায় নাকি কোন নেতার তিন হাজার কোটি টাকা খরচ করে মূর্তি বানিয়েছে। কই কোনো দিন তো হাসপাতাল গুলোতে টাকা খরচের কথা শুনি নি। আর সরকারি হাসপাতাল আমাকে নাকি ১৪ দিন থাকতে হবে

কি করে থাকবো রঘুর চা, রিন্টুর মাগ্নায় গুটখা ছাড়া ভাবতে ভাবতে গেন্দু কেদে ফেললো। ঠিক সেই সময় ঘুমটাও ভেঙ্গে গেলো। রঘু বুঝলো এটা স্বপ্ন। ওর করুণা হয় নি , ওকে হাসপাতাল যেতে হবে না। বলে হাসতে থাকলো আমি পুরো ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেছি। এটা কি স্বপ্ন নাকি বাস্তব বোঝার চেষ্টা করছি। গেন্দু আমায় চুপ থাকতে দেখে হাঁটা দিয়েছে তার পথে।।।

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: