Story — Kanan Kumar Mukherjee

  Story   --     Kanan Kumar Mukherjee
ঘুমের ঘোরে ধড়পড় করে বিছানায় উঠে বসে সুদীপ্ত। কোন এক দুঃস্বপ্ন যেন তাকে বারবার তাড়া করে বেড়ায়। এই শীতের রাতেও তার কপাল ঘামে ভিজে যায়। ঢকঢক করে জলের বোতল শেষ করে দেয় নিমেষে। ঘড়িতে ঠিক রাত্রি দুটো। বিছানা ছেড়ে সুদীপ্ত এসে দাঁড়ায় খোলা ব্যালকনির সামনে। 

চারিদিক নিস্তব্ধ। দুএকটি প্রাইভেট কার বা ট্যাক্সি ছুটে যাচ্ছে এদিকে ওদিকে। শহর কলকাতা বোধহয় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। উদাস দৃষ্টিতে সুদীপ্ত তাকিয়ে থাকে নিকষ কালো আকাশের দিকে। নিমজ্জিত হয় তার অতীত সুখস্মৃতিতে। এমন একাকী রাত অতিবাহিত করার কথা কোনদিনই কল্পনা করেনি সুদীপ্ত। 

তার আশা ছিল, ভরসা ছিল, কল্পনা ছিল, স্বপ্ন ছিল। স্নাতকোত্তরে পাঠকালীন সে নিজের অজান্তেই ভালবেসে ফেলে ছিল সহপাঠিনী ঈশিতাকে। ঈশিতারা ছিল দুই বোন। দিদির বিবাহ হয়ে গিয়েছিল কয়েক বছর আগে। তাই দিদির বিবাহের পরে বাবা মায়ের কাছে ইশিতাই ছিল সবে ধন নীলমণি। প্রথম দর্শনেই মনে মনে ঈশিতার প্রেমে পড়ে গিয়েছিল সুদীপ্ত। তার ছিপছিপে গড়ন, ফর্সা রং, কালো হরিণ চোখ সুদীপ্তকে আকর্ষিত করত বারে বারে। চোখে হালকা কাজল, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক আর কপালের ছোট্ট একটা টিপ তার সৌন্দর্যকে করে তুলত আরও মোহময়ী। সাথে ছিল গালে টোল পড়া সেই ভুবনমোহিনী হাসি।

তাই যাবতীয় সংকোচ জড়তাকে কাটিয়ে সাহস করে সুদীপ্ত একদিন বলেই ফেলেছিল তার মনের কথাটা, ” আই লাভ ইউ ইশিতা“! উত্তরে ঈশিতার লজ্জা জড়ানো টোল পড়া হাসির অভিব্যক্তিই যেন নির্দেশ করতে চেয়েছিলো তার ইতিবাচক সম্মতির। সময়ের দাবি মেনে ক্রমে ভালোবাসার গভীরতা বাড়ে। বাড়ে ঘনিষ্ঠতা। ঈশিতার শরীরের প্রত্যেকটি ভাঁজে পৌঁছে যায় সুদীপ্তর ভালোবাসার স্পর্শ। হালকা লিপস্টিকে রাঙ্গানো ঈশিতার ঠোঁটে ভালবাসার কামড় বসিয়ে দেয় সুদীপ্ত। প্রেম দংশনে উদ্বেলিতউত্তেজিত ঈশিতা নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করে। ততোধিক শক্তি দিয়ে ঈশিতার শরীরকে জাপ্টে ধরে সুদীপ্ত যেন বলতে চায়যেতে আমি দিব না তোমায় কিন্তু বিধির বিধান হয়তো লেখা ছিল অন্যভাবে। মাস্টার্স কমপ্লিট হওয়ার পর ঈশিতার বাবামা চিন্তিত হয়ে পড়েন কন্যার বিবাহের জন্য।

বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রের পাত্রপাত্রী বিভাগে দেওয়া হয় ঈশিতার বিবাহের বিজ্ঞাপন। রক্ষণশীল পরিবারের অনুশাসনের কাছের ঈশিতার কোন আপত্তি বাধা ধোপে টেকেনি। প্রতিষ্টিত, সুদর্শন স্বচ্ছল পরিবারের পাত্রের সঙ্গে বিবাহ সম্পন্ন হয় ঈশিতার। কালের নিয়মে সুদীপ্তও ভোলার চেষ্টা করে ঈশিতার সাথে কাটানো তার সুখ স্মৃতি। সময়ের দাবি মেনে সেও আবদ্ধ হয় বিবাহ বন্ধনে। বাবা, মা স্ত্রী বহ্নিতাকে নিয়ে শুরু হয় সুদীপ্তর নতুন জীবন। সুদীপ্তর বাবা ছিলেন সরকারি চাকুরে, এখন অবসরপ্রাপ্ত। মা হাউসওয়াইফ। মাস্টার্স সম্পূর্ণ করে সুদীপ্তও জোগাড় করে ফেলে একটা বেসরকারি সংস্থার় কাজ। যেহেতু বেসরকারি সংস্থায় কাজ, আরামআয়েসের এখানে কোন জায়গা নেই। সপ্তাহের দিনই হাড়ভাঙা খাটুনি। ভাগ্য খারাপ থাকলে আবার কখনো কখনো রবিবারেও ছুটি মেলে না। 

তবুও সুদীপ্ত মানিয়ে নেয়! গল্পেউপন্যাসেটিভি সিরিয়ালে নারীদের শ্বশুর বাড়িতে মানিয়ে নেওয়ার অনেক কাহিনী রচিত হয়। কিন্তু যারা সুদীপ্তর মতো জীবনের বেশিরভাগ সময়টাই মালিকের ইচ্ছে অনিচ্ছের সঙ্গে মানিয়ে চলতে গিয়ে নিজেদের সুখস্বাচ্ছন্দকে জলাঞ্জলি দিয়ে জীবন অতিবাহিত করেকাব্য, কবিতা, গল্পউপন্যাসে তাদের মানিয়ে নেওয়ার কাহিনি রয়ে যায় অবগুন্ঠিত, উপেক্ষিত। বহ্নিতা বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। সম্পূর্ণভাবে ঘরোয়া। কন্যার স্নাতক কমপ্লিট হওয়ার পরে আর পাঁচটা মধ্যবিত্ত বাঙালি বাবা মায়ের মতো তার বাবা মা চিন্তিত হয়ে পড়েন বিবাহের জন্য। পাড়ার ভট্টাচার্যী কাকুর সৌজন্যে সুদীপ্তর পরিবারের সঙ্গে ওদের পরিবারের পরিচয় এবং বিবাহ বন্ধনের পরিপূর্ণতা। দিন মাস বছর পেরিয়ে এভাবেই কাটছিল ওদের দাম্পত্য জীবন। কিন্তু বছর দুয়েক পরেই অনিবার্য সামাজিক চাহিদা ওদের স্বাভাবিক জীবনের ছন্দকে বিব্রত করেছে বারে বারে।

পাড়ার কলতলায়, স্নানের ঘাটে পরিচিতা বয়স্কা মাসিমা, ঠাকুমা, দিদিমা, পিসিমাদের বারবার তার মায়ের কাছে সেই অনিবার্য প্রশ্ন – ‘বউটা কিছু বটে কিনা!’ বন্ধু মহলেও ঠাট্টাইয়ার্কি, টীকাটিপ্পনীসুদীপ্ত কবে বাবা হচ্ছিস!’ অনেকটা সেই প্রবাদটির মতযার বিয়ে তার মনে নেই পাড়াপড়শির ঘুম নেই তবে সময়ের সাথে সাথে এই সামাজিক চাহিদার যৌক্তিকতা তারাও উপলব্ধি করে এবং এই চাহিদাকে মান্যতা দেওয়ার অভিপ্রায়ে তারা পৌঁছে যায় শহরের বিখ্যাত বিশেষজ্ঞের চেম্বারে। দীর্ঘ এবং সময় সাপেক্ষ পরীক্ষানিরীক্ষার পর অবশেষে জানা যায় সুদীপ্ত পিতৃত্বে অক্ষম। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে তাদের। সুদীপ্তবহ্নিতার জীবনের চলার পথ যেন থমকে যায়। যেকোনো সফল দাম্পত্য জীবনের মোক্ষ লাভই হল পিতৃত্ব বা মাতৃত্বের স্বাদ। 

সে স্বাদ বঞ্চিত জীবন সুদীপ্ত এবং বহ্নিতার দাম্পত্য জীবনের চলার পথে অপ্রাসঙ্গিক অনর্থক বলে মনে হয়। পরদিন সকালে বহ্নিতা উঠে পড়ে সবার আগে। সুদীপ্তর তখনো ঘুম ভাঙেনি। ঝটপট শাড়িটা ছেড়ে নেয় সে। আজ সে সাজগোজ করার ইচ্ছা হারিয়েছে। ফেসওয়াস, ফেসপাউডার, আইলাইনার, কাজল, টিপ, লিপ্সটিক আজ তার কাছে অপ্রাসঙ্গিক। প্রস্তুত হয়ে সে সুদীপ্তর কপালে হাত রাখে। আড়মোড়া ভেঙে সুদীপ্ত চোখ খুলে অবাক হয়। অস্ফুটে বলে ওঠে কোথায় যাচ্ছ বহ্নিতা! দু চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে বহ্নিতার। অবশ্য সে অশ্রুতে আজ আর তার গালের মেকআপ উঠে যাওয়ার ভয় নেই। বহ্নিতার অশ্রুসজল চোখ আর নীরবতাই সুদীপ্তর সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেয়। কিন্তু সুদীপ্তর কাছে আজ আর এমন কিছু নেই যার দাবি নিয়ে বহ্নিতাকে সে আটকে রাখবে। সুদীপ্ত অনুভব করে আজও নারীর গর্ব আর অহংকার তার মাতৃত্বের স্বাদ। সেই স্বাদ দিতে অপারগ সুদীপ্ত যে তার গর্ব আর অহংকারের জায়গাকে পদদলিত করেছে! বহ্নিতা যাত্রা করে অজানা ভবিষ্যতের উদ্দেশ্যে। 

পিছনে পড়ে থাকে সুদীপ্তর সঙ্গে কাটানো তার এই বছরের স্মৃতি। সুদীপ্ত তাকিয়ে থাকে বহ্নিতার যাত্রা পথের দিকে। বহ্নিতার সংসার ত্যাগ সুদীপ্তর দাম্পত্য জীবনের স্বপ্নকে চুরমার করে দেয়। বুক ভরা হতাশা বেদনায় নিমজ্জিত হয় তার মন। এরপর কালের নিয়মে পিতৃমাতৃহীন হয় সুদীপ্ত। গ্রামের বাড়িতে তার আর মন বসে না। ভুলে থাকার অভিপ্রায়ে সে কলকাতা শহরে ফ্ল্যাট বাড়ি ভাড়া করে। ইশিতাবহ্নিতার স্মৃতি তাকে কুরে কুরে খায়। তবে ঈশ্বর বলে যদি কেউ থাকেন তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন সুদীপ্তও আজ প্রতারিত। সুদীপ্ত যদি পিতৃত্বে অক্ষম হয় তাহলে তার কলেজ বান্ধবী লাইলীর গর্ভের অবৈধ সন্তান নিশ্চয়ই তার ছিল না। কলেজের দ্বিতীয় বর্ষে পড়াকালীন লাইলীর সঙ্গে তার বন্ধুত্ব ঘনিষ্ঠতা। লাইলীর বাবামায়ের অনুপস্থিতির সুযোগে একদিন তাদের বাড়িতে এই ঘনিষ্ঠতা পরিপূর্ণতা পায়। লাইলী গর্ভবতী হয় এবং দাবি করে সুদীপ্তই তার সন্তানের পিতা। অজানা আশঙ্কায় ভীত সুদীপ্ত লাইলীর কুমারীত্বের কলঙ্কমোচনের উদ্দেশ্যে সমস্ত দায়ভার বহন করতে বাধ্য হয়। 

এও এক নিয়তির পরিহাস। এসব ভাবতে ভাবতেই ভোর হয়ে যায়। ভোরের আকাশে পাখির দল উড়ে যাচ্ছে। ট্রাম বাসের আনাগোনাও বাড়ছে আস্তে আস্তে। পূব আকাশের রক্তিম আভা জানান দিচ্ছে সূর্যি মামার ঘুম ভাঙছে। হতে পারে বিগত রাত অনেক স্বপ্ন ভালোবাসাকে পরিপূর্ণতা দিল। হতে পারে আজকের অপরাহ্ণে লেকের ধারে অথবা ভিক্টোরিয়ার ঝোপের আড়ালে অনেক ভালোবাসা পরিপূর্ণতা পাবে।

অথবা যাদের ভিক্টোরিয়া বা লেকের ধার নেই তারা তাদের ভালবাসার পরিপূর্ণতা খুঁজে নেবে পুকুরের ধারে, গাছ গাছালির মাঝে অথবা পার্কের দোলনায় ছাতার আড়ালে। এভাবেই ভালোবাসার ঘূর্ণিপাকে লাইলিঈশিতাবহ্নিতাদের সাথে ঘুরে চলেছে সুদীপ্তরা, – যার পরিসমাপ্তি অনিকেত ভবিষ্যতের হাতে এবং আশা, ভরসা, কল্পনা স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটতে পারে যে কোন মুহূর্তে। এসব ভাবতে ভাবতেই ক্লান্ত অবসন্ন শরীরটাকে আর একবার বিছানায় ছুড়ে দেয় সুদীপ্ত।
  
 সমাপ্ত      

ফেসবুক মন্তব্য

Published by Story And Article

Word Finder

Leave a Reply

%d bloggers like this: