Subrata Dutta

।। প্রণয় তিয়াস ।।
(ছোট গল্প)
সুব্রত দত্ত
——————–

নতুন অধ্যাপক প্রিয়ব্রত সান্যাল ক্লাস নিচ্ছে। আজকের বিষয় গ্লোবাল ওয়ার্মিং। শেষে সে বলে,
— “সব রাষ্ট্রকেই বিশ্ব উষ্ণায়ন কমানোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। তবে প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাঁর দেশের ঠান্ডা কমাতে যে বিশ্ব উষ্ণায়নকে আহ্বান জানিয়েছিলেন তাকে আমি সমর্থন করতে পারছি না।”
ক্লাসে হাসির রোল ওঠে। প্রিয়ব্রত লক্ষ্য করে, একটি মেয়ে তার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে। কিন্তু অন্যদের মত প্রতিক্রিয়া নেই। সে মেয়েটিকে বলে,
— “এই যে, হ্যাঁ তোমাকেই বলছি। কোথায় ছিলে এতক্ষণ?”
— “কেন স্যার? এখানেই তো আছি।”
— “না নেই, তোমার নাম?”
— “তমালিকা বোস।”
— “শোনো, আমার ক্লাস ভাল না লাগলে বাইরে যেতে পারো। পাশের পার্কেও আড্ডা মারতে পারো। ভাল লাগবে।”
— “না স্যার, আপনাকে খুব ভাল লাগে।”
ক্লাশে চাপা একটা গুঞ্জন শুরু হয়। প্রিয়ব্রত অবাক হয়ে বলে,
— “কি?”
— “না, মানে আপনার পড়ানো।”
এবার হাসির রোল ওঠে।
— “ঠিক আছে, পরের দিন থেকে যেন অন্যমনস্ক হতে না দেখি।”

২৫-শে বৈশাখ। ছোট করে রবীন্দ্র জয়ন্তী পালন হবে। প্রফেসররাও আমন্ত্রিত। প্রিয়ব্রতর কাছেও ছাত্র ছাত্রীদের আবদার, আবৃত্তি করে শোনাতে হবে। নাছোড়বান্দা সব। করতেই হলো। তমালিকাই সঞ্চয়িতা হাতে ধরিয়ে দিল। প্রিয়ব্রত দরাজ গলায় শুরু করে ‘অনন্ত প্রেম’ কবিতাটি। “তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি শতরূপে শতবার …।” সবাই বিমুগ্ধ! আর তমালিকা একদম আপ্লুত। এই আবৃত্তি যেন তার উদ্দেশ্যেই করা। মাইক্রোফোনে ঘোষণা – এর পরে সঙ্গীত পরিবেশন করবে তমালিকা বোস। ঘোষণা কানে যায় না তার। সুপর্ণা ধাক্কা দিয়ে বলে,
— “যা, এবার তোর গান!”
— “ও হ্যাঁ।”
তমালিকা গান শুরু করে।
“তুমি কোন ভাঙনের পথে এলে সুপ্তরাতে।
আমার ভাঙল যা তা ধন্য হল চরণপাতে …”
হাততালির শব্দে ভরে উঠল হলঘর। প্রিয়ব্রত ডেকে বলে,
— “বাঃ, চমৎকার তোমার কন্ঠস্বর, তোমার গায়কী।
গান শেখো নাকি?”
— “হ্যাঁ স্যার। কিন্তু আপনি এত সুন্দর আবৃত্তি করেন, জানতাম না তো!”
— ” ঐ, একসময়ে চর্চা ছিল। আগের মত আর পারি কই?”
— “না স্যার, অসাধারণ লেগেছে আপনাকে।”
— “আমাকে — মানে?”
— “মানে, আপনার আবৃত্তি।”
— “ও, তবে তুমি কিন্তু গানের চর্চা চালিয়ে যেও। তা বিশ্বভারতী – রবীন্দ্র ভারতী ছেড়ে এই কলেজে কেন?”
— “দেখুন না স্যার, ওখানেও চান্স পেয়েছিলাম। কিন্তু বাবা মায়ের ইচ্ছেতেই এই কাঠখোট্টা সাবজেক্ট নিয়ে পড়তে হচ্ছে।”
—“বাঃ, মা বাবার বাধ্য মেয়ে তুমি তাহলে।”
— “স্যার, আমাকে পড়াবেন?”
— “আমি তো বাইরে পড়াই না। নাঃ, আমি যাই। তাড়া আছে। পরে কথা হবে।”
তমালিকার মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। অর্ধেক যুদ্ধ যেন জয় করে ফেলেছে সে।

কয়েকদিন বাদে প্রিয়ব্রত অন্য ক্লাস নিয়ে ফিরছে। করিডোরে তমালিকা সামনে পরে যায়। বলে,
— “স্যার, পড়াবেন তো? বাড়িতে বলেছি আপনার কথা।”
— “কিন্তু আমি যে বললাম, বাইরে কোথাও ..”
তমালিকা প্রিয়ব্রতর হাত ধরে গা ঘেঁষে বলে,
— “বলুন না স্যার, না হলে আমি পাশ করতে পারব না।”
প্রিয়ব্রত অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। কেউ দেখে ফেললে কি ভাববে? বলে,
— “ওঃ, হাতটা ছাড়ো। ঠিক আছে পড়াতে পারি একটা শর্তে।”
— “কি শর্ত স্যার? আমি সব দিতে প্রস্তুত।”
— “আমি তো বাইরে পড়াই না। তাই পড়ানোর fees নেব না। ঠিক আছে?”
বলে হাঁটতে শুরু করে। পেছন থেকে তমালিকা ডাকে,
— “স্যার!”
প্রিয়ব্রত দাঁড়িয়ে পেছনে ফিরে দেখে তমালিকা দৌড়ে তার দিকেই আসছে। গা ঘেঁষে প্রায় ধাক্কা দিয়ে ঠোঁট যতটা সম্ভব কম নাড়িয়ে বলে,
— “আই লাভ ইউ স্যার!”
বলেই ছুটে চলে যায় ক্লাসে। প্রিয়ব্রত হতভম্ব হয়ে পড়ে। চারদিকে তাকিয়ে দেখে নেয়, কেউ দেখে বা শুনে ফেলল কি না। নাঃ, ভাগ্যিস কেউ নেই! নিজের হৃদপিণ্ডের শব্দ নিজের কানেই বড্ড অচেনা লাগে। তবে মেয়েটাকে খারাপ লাগে না। কিন্তু শিক্ষক-ছাত্রীর সম্পর্কের বাধাটাই বড় বাধা। তাই প্রিয়ব্রতকে সংযত থাকতে হয়!

সপ্তাহে একদিন পড়ায় প্রিয়ব্রত। সে পড়িয়েই যায় আর তমালিকা হাঁ করে তাকিয়ে কি যেন ভাবে। প্রিয়ব্রত ওকে বকে। তমালিকার তাতে ভ্রূক্ষেপ নেই। সে বলে,
— “স্যার, পড়ে আর কি হবে। সেই তো গৃহবধূ হতে হবে প্রফেসরের।”
— ‘প্রফেসর? ঠিক করা আছে নাকি?”
— “হ্যাঁ তো। স্যার, আপনার শার্টের বোতামটা কেমন যেন হয়ে আছে।”
বলে সে প্রিয়ব্রতর ওপর ঝুঁকে পড়ে বোতামটা নাড়াচাড়া করতে থাকে। তমালিকার উষ্ণ শ্বাস প্রিয়ব্রতর মুখে পড়ছে। প্রিয়ব্রতর কেমন যেন একটা অনুভুতি হতে থাকে। তবু নিজেকে শাসন করে। নিরুপায় হয়ে হঠাৎ প্রিয়ব্রত চিৎকার করে ওঠে,
— “হোয়াট ননসেন্স! বসো, নিজের চেয়ারে বসো।”
আচমকা এমন একটা চরম আঘাত আসবে তা ভাবতে পারেনি তমালিকা। অপমানে কান গরম হয়ে যায়। থর থর করে কাঁপতে থাকে। মা ছুটে এসে জিজ্ঞেস করেন,
— “কি হয়েছে? স্যার, ওকে আচ্ছামত বকে দিন তো। নিশ্চয়ই পড়া করছে না। তাই না?”
— “না, ঠিক আছে। করবে ও ভালই পড়াশোনা করবে।”
তমালিকার চোখ দিয়ে নিঃশব্দে টস টস করে জল পড়ছে। প্রিয়ব্রত এই গুমোট পরিবেশটাকে হালকা করতে সান্ত্বনা দিয়ে বলে,
— “দেখো, আমরা বিশ্ব উষ্ণায়ন কমাতে চেষ্টা করছি। আর মানুষের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের উষ্ণতাও স্বাভাবিক। তবে সেটা স্থান কাল পাত্র ভেদে।”
তমালিকা মাথা নিচু করেই থাকে। কোনো কথা বলে না। প্রিয়ব্রত জিজ্ঞেস করে,
—“কি হল? আজ আর পড়বে না?”
তমালিকা তবুও কোনও উত্তর দেয় না।
— “ঠিক আছে আজ চলি। পরের দিন কিন্তু ফাঁকি দিলে চলবে না। ঠিক আছে?”
প্রিয়ব্রত চলে যায়। তমালিকা অন্যদিনের মত গেট পর্যন্ত এগিয়ে দেয় না। আস্তে আস্তে উঠে দরজা বন্ধ করে। তার মনে আজ আর কোনও স্বপ্ন নেই। নিরাশার অন্ধকারে সে নিমজ্জিত।

অনেকটা সময় কোনও সাড়াশব্দ না পেয়ে মা এসে ডাক দেন,
— “কি রে তমা, কি করছিস? বকা খেয়ে মন খারাপ! স্যার বকেছেন, বেশ করেছেন। পড়া না করলে তো বকা খেতেই হবে। কি রে, আয়। খাবার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে যে!”
অনেক ডাকাডাকিতেও তমালিকা দরজা খোলে না, সাড়াও দেয় না। এসব শুনে বাবাও হাজির হয়ে বলেন,
— “এই তোমার লাই পেয়ে পেয়ে মেয়েটার আজ এত জেদ বেড়েছে। নাও, এবার সামলাও।”
বাবাও অনেকবার ডাক দিলেন। তাতেও সাড়া মিললো না। এবার বিষয়টা আতঙ্কের হয়ে দাঁড়ালো। চিৎকার চেঁচামেচিতে প্রতিবেশীরাও চলে এসেছে কৌতূহল নিয়ে। উপায়ান্তর না দেখে শেষে দরজা ভাঙা হলো। মা দেখেন — মেয়ে মেঝেতে এলিয়ে পড়ে রয়েছে। রক্তে ভেসে গিয়েছে মেঝে। পাশে একটা ছুরি পড়ে রয়েছে। হাতের শিরা কেটে ফেলেছে। মা চিৎকার করে ওঠেন,
— “ওগো, মেয়েটার কি হলো? এই তমা, কথা বল। তোর কি হয়েছে বলবি তো! এমন কাজ করলি কেন?”
বাবা বলেন,
— “চুপ করো। নার্সিংহোমে নিয়ে যেতে হবে তাড়াতাড়ি।”
সাথে সাথে নার্সিংহোমে ভর্তি করানো হয়। পুলিশও আসে ইন্টারোগেট করতে। প্রিয়ব্রত খবর পেয়েই ছুটে আসে। ৭২ ঘন্টার অবজার্ভেশনে থাকতেই হবে। তার আগে ডাক্তার কিছুই বলতে পারবেন না। প্রিয়ব্রতর নিজেকে অপরাধী মনে হয়। দিনরাত সে নার্সিংহোমে সুখবরের আশায় অপেক্ষায় পড়ে থাকে। সে একটু বেশিই রিয়াক্ট করে ফেলেছিলো। তার জন্যেই আজ তমালিকার জীবন সংশয় দেখা দিয়েছে।
তিনদিন কেটে গেছে উৎকন্ঠায় পায়চারি করছে
প্রিয়ব্রত। মা বাবা চেয়ারে বসে রয়েছেন। একজন নার্স এসে বললেন,
— “তমালিকা বোসের বাড়ির লোক কে আছেন? ভেতরে যান। আপনাদের পেশেন্টের জ্ঞান ফিরেছে।”
প্রিয়ব্রত নিজেই যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। ভগবানের উদ্দেশ্যে প্রণাম ঠুকে ভেতরে ছুটে যায়। বাবাও যাওয়ার জন্য উঠছিলেন। মা হাত ধরে বসিয়ে দিয়ে বললেন,
— “আঃ, ও যাক না আগে।”
প্রিয়ব্রত দেখে, তমালিকার চোখ বন্ধ। ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে তাকে। প্রসাধনহীন মুখে অবিন্যস্ত চুল হাওয়ায় খেলা করছে যেন। বেডের পাশে টুলে বসে প্রিয়ব্রত ডাকে,
— “তমালিকা, এই তমালিকা। এই যে আমি। আমি এসেছি। আমি কে বলো তো? প্রিয়ব্রত! তোমার প্রিয়–”
তমালিকা ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকায়। দু’চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। প্রিয়ব্রত চোখ মুছে দিয়ে বলে,
— “উঁহু, আর কান্না নয়। আই লাভ ইউ টু।”
তমালিকার চোখের জল যেন বাঁধা মনে না। হাত বাড়িয়ে দেয় প্রিয়ব্রতর দিকে। প্রিয়ব্রতও তার নির্ভরতার হাত বাড়িয়ে দেয় তমালিকার বাড়ানো হাতে।

(সমাপ্ত)

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top