Sudip Ghoshal

ভূতের গল্প
সেই চোখদুটো
সুদীপ ঘোষাল
দীনেশ গল্প বলছে বন্ধুমহলের আড্ডায় ।সে বলছে,ঝিনুকঘাটার  ভূতের জঙ্গলে বেড়াতে গেছিলাম আমরা কয়েকজন গরমের ছুটিতে।  সেখানে গিয়ে কুকুররূপী ভূত দেখেছিলাম।পশুরাও যে প্রেতযোনি প্রাপ্ত হয় শুনেছিলাম কিন্তু সেই প্রথম দেখা পশুভূত।
তার বন্ধু রমেন বলল,কতরকমের ভূত আছে বল তো, শুনি। তুই তো ভূত গবেষক। বলে বন্ধুটি হাসতে শুরু করল।
দীনেশ বলল, হ্যাঁ,বলছি শোন তাহলে।  পেত্নী হল‌ ভারি বদমেজাজি। পা থাকে পিছনে ঘোরানো। যখন যেমন ইচ্ছে আকার নিতে পারে। এমনকী পুরুষেরও। ও বলে রাখি, এরা আসলে নারী ভূত। বেঁচে থাকতে কিছু অতৃপ্ত আশা ছিল এবং অবিবাহিত অবস্থাতেই ইহলোক ত্যাগ করেছে।শাকচুন্নি, এয়ো স্ত্রীরা মরে হয় এই প্রকার ভূত। সাদা শাড়ি আর হাতে শাঁখা। এরা থাকে আমগাছে। আর ভর করে এয়ো স্ত্রীদের ওপর। যাতে বিবাহিত জীবন যাপন করতে পারে।চোর মরলে হয় চোরাচুন্নি।  ভারি দুষ্টু প্রকৃতির। পূর্ণিমার রাতে বাড়িতে ঢোকে। তাড়ানোর উপায় নেই,তবু গঙ্গাজল বা হনুমান স্তোত্রগান করলে কিছুটা রক্ষা পাওয়া যায়।শ্রী হনুমানের এই মন্ত্রটা মনে রাখিস,”দীনদয়াল বীরদুসংভারী, হর হে নাথ মম সংকটভারি।”
সচরাচর ভূত দেখা যায় না। থাকে জঙ্গলে,শ্যাওড়াগাছে বা শিমূলগাছে।  পথিকের পিছু নেয় সবসময়। সুযোগ পেলে মেরে  মাংস খায়। ভীষণ বিপজ্জনক। মাছ,মাংস খেতে ভালোবাসে,এটুকুই যা দোষের বা গুণের, যাই বলো না কেন । থাকে গ্রামের পুকুরের ধারে। মাছ ধরে ফেরার সময় অনেকে এদের খপ্পরে পড়ে, মেছেলরা। এরা  সেই লোককে বাঁশবাগানে নিয়ে যায়। তার পর ভয় দেখিয়ে মাছ কেড়ে নিয়ে খায়। পুকুর থেকেও চুরি করে মাছ।(@সুদীপ ঘোষাল) মেছোভূত থাকে পুকুরের ধারে। নিশিভূতের লোকজনকে জলে ডুবিয়ে মারা এদের খুব ভাল লাগে। চেনা লোকের  গলা নকল করে ঘর থেকে ডেকে আনে।আঁয় আঁয় বলে ডাকে।তিনবার না ডাকলে, এই নিশিভূতের ডাকে সাড়া দিয়ে যে ঘর ছাড়ে, সে আর ঘরে ফিরতে পারে না।  নিশিরা কোনও মানুষকে দু’‌বারের বেশি ডাকতে পারে না। তাই সাবধান!‌ রাতে কেউ তিনবার ডাকলে তবেই বের হবেন।গেছো ভূত,ব্রহ্মদৈত্য গাছে বসবাস করে। (@সুদীপ ঘোষাল)রাতে গাছের নিচ দিয়ে মানুষ  গেলে, তাঁর কাঁধে লাফিয়ে পড়ে।  ব্রাহ্মণ মরলে হয় এই ভূত। তাই সাদা ধুতি আর পৈতে পরে থাকে।  মানুষের উপকারও এরা করে।
 পশুর আক্রমণে যেসব লোক মারা যান, তাঁরাই নাকি হন বাঘাভূত। কুকুর, বেড়াল পিটিয়ে মারলে সেই কুকুর বা বিড়াল প্রেতযোনি প্রাপ্ত হয়।পরিক্ষিত সত্যঘটনা। না দেখলে বিশ্বাস হয় না।
জঙ্গল এলাকায় এ ধরনের ভূত নাকি দেখা যায়। মাঝে মাঝে এরা গ্রামবাসীদের ভয় দেখানোর জন্য বাঘের বা কুকুরের  স্বরে ডেকে ওঠে। ‌ মাথা নেই,মুন্ডু নেই,  মনে করা হয়। রেলে কাটা পড়লে বা কেউ মাথা কাটলে হয় স্কন্ধকাটা। সারাক্ষণ নাকি নিজেদের মাথা খুঁজে বেড়ায়।  এ শ্রেণীর ভূতেরা এক বা দলছুট পথিককে রাস্তা  ভুলিয়ে দেয়। ভয়ের  ঘোরে আচ্ছন্ন করে রাখে। অচেনা স্থানে নিয়ে আসে। এর কবলে পড়ে মাঝে মাঝে মানুষ একই রাস্তায় বারবার গোল হয়ে  ঘুরপাক খেতে থাকে।সাধারণত বটগাছ বা ঝোপজঙ্গলে লুকিয়ে থাকে। রাতে পথিক যদি একা একা সেই জঙ্গল পেরোতে যায়, তখন তাকে ধরে তালগাছের মগডালে চড়িয়ে দেয়।(@সুদীপ ঘোষাল)।
মিলু বলল,তারপর বেড়াতে গিয়ে কি হল বল?দীনেশ শুরু করল তার অভিজ্ঞতার কাহিনী।ঝিনুকঘাটার জঙ্গলে একটা খড়ের চালের ঘরে রাতবাস করেছিলাম আমাদের অফিসের কয়েকজন কলিগ।কলিগরা বন্ধু না হলেও বন্ধুর মত। একটা বন্ধুর রাতের বেলা বাথরুম যাওয়ার প্রয়োজন হলো।আমি সঙ্গে আছি।এখানে বাথরুম বলতে চটের আড়াল দেওয়া, বেড়ার ঘর।অজানা এক ঝোড়ো হাওয়া এসে চট উড়িয়ে নিয়ে ফেললো দূরের পুকুরে। আমার  বন্ধুটি বললো,অই দেখ জঙ্গলে একটা গরু,  দুটো পা উপরে তুলে মানুষের মতো নেচে নেচে নানরকম অঙ্গভঙ্গি করছে। আমি বললাম,যাঃ,ওটা গরু নয়,  কোন মানুষ  ভয় দেখাচ্ছে।আমার কথার উত্তরে গরুটা বিড়াল হয়ে গেলো। তারপর মানুষের মতো দাঁত বের করে হাসতে লাগলো।
আমার বন্ধু ভয়ে বু বু করতে লাগলো। ওর আর বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজন হলো না।ওখানেই দুস্কর্ম করে ফেললো ভয়ে।আমি বললাম,ওই দেখ বিড়ালটা আবার কুকুর হয়ে গেলো। তারপর ঘেউ, ঘেউ করতে করতে আমাদের পিছনে ছুটতে লাগলো। ঘর থেকে সকল বন্ধুরা বাইরে বেড়িয়ে  প্রাণপণে ছুটতে শুরু করলাম। ভুলে গেলাম ঘরবাড়ির কথা। আমি না ছুটে ভয়ে জঙ্গলের আড়ালে বসে লুকিয়ে রইলাম। ভয়ে বোবা হয়ে গেলাম।  তারপর হঠাৎ একটা লোক এসে বন্ধুদের বললো,কি ব্যাপার ছুটছেন কেন? আমি শুনতে পেলাম বন্ধুরা  বলছে,কুকুরে তাড়া করেছে। লোকটা বললো,কই,কুকুর তো দেখছি না। বন্ধু বললো,এখানেই ছিলো। তারপর লোকটি নিজেই কুকুর রূপ গ্রহণ করে  বললো,দেখুন তো এই কুকুরটা কি না? লোকটার পরিবর্তে, একইরকম কুকুর।  আবার অনেকগুলো কুকুর হাজির হলো।
আমি দেখছি,একটা কুকুরের,  হাঁমুখ বড় হতে শুরু করলো। তারপর একটা বন্ধুকে কামড়ে ধরল।আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ে রইলাম জঙ্গলে।
পরের দিন সকালে জ্ঞান ফিরলে দেখলাম,আমার  বন্ধুটির মৃতলাশ  ঘিরে অনেক মানুষের ভিড়।  একজনের মুখে শুনলাম,এখানে মানুষের লাশ দেখা যায় প্রায়শই । পশুভূতের পাল্লায় পড়ে বেঘোরে প্রাণ যায় মানুষের। এখানে একটা রাস্তার কুকুরকে কিছু মানুষে পিটিয়ে মেরেছিল। সেই থেকে এই আক্রমণ শুরু হয়েছে প্রেতযোনী প্রাপ্ত পশুভূতের।(@,সুদীপ ঘোষাল)
লোকটি বলল,তারপর থেকে এখানে আর কেউ কোনো পশুহত্যা করে না।
আমি সে যাত্রা বেঁচে গেলেও বন্ধুকে না পেয়ে মর্মাহত হলাম। মনে পড়ল গতরাতের কথা।গতরাতে, একটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করতে করতে সেই বড় কুকুরটার সঙ্গে চলেছে,  শিকারের সন্ধানে।বড় কুকুরটা হঠাৎ বিড়ালের রূপ ধরে আমার দিকে সোজাচোখে একবার দেখেছিলো।সেই চোখদুটো আজও ভুলতে পারিনি…

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top