গল্পকার এস এম নিজামুদ্দিন এক প্রজ্ঞার আলোকবর্তিকা // তৈমুর খান

.

https://www.sahityakaal.com

.

পাঠক, চেনেন গল্পকার এস এম নিজামুদ্দিনকে ?

.

.

জনবহুল মুর্শিদাবাদ জেলার জঙ্গিপুরে হাজার হাজার জনতার ভিড়ে মিশে থাকা একজন অতিসাধারণ মানুষ। জন্মেছিলেন ভারতের স্বাধীনতা লাভের ৬ মাস আগে (১ লা জানুয়ারি ১৯৪৭)।পিতার নাম আব্দুস সালাম, মাতা শাকিনা বানু। ছোট থেকেই লড়াই করে বড় হয়েছেন। দারিদ্র তাঁকে হারমানাতে পারেনি।

.

.

অন্ধকারের প্রান্তিক মানুষদের জীবনযন্ত্রণার প্রতিনিধি হিসেবেই তিনি কলম ধরেছেন। রাজনীতির পতাকা হাতে মঞ্চে মঞ্চে উঠে তিনি ভাষণ দিতে চাননি। নিরীহ অতিসাধারণ জীবনযাপনের মধ্যেও লালন করেছেন আলোকবর্তিকার অনন্ত আকাঙ্ক্ষা। যার জন্য তাঁর লেখনী সত্যদ্রষ্টা ৠষির মহানুভবতার ব্যাপ্তি অর্জন করতে পেরেছে।

.

.

লিখেছেন প্রায় ১০০ খানা গল্প, কিন্তু আশ্চর্য উদাসীনতায় পাণ্ডুলিপিগুলিও সযত্নে রাখতে পারেননি। বন্যা কবলিত এলাকায় বসবাস বলে বারবার তা নষ্ট হয়ে গেছে। জীবিকার তাড়নায় নিজেও বারবার ছিন্নমূল জীবন কাটিয়েছেন।

.

.

আত্মপ্রচারের কোনও মাধ্যমই তাঁর সহায়ক হয়নি। তবু মুর্শিদাবাদ সাহিত্য একাদেমি থেকে দুটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে —“জীবনের রংবদল”  ও “আলোকবর্তিকা” (২০১১) নামে। পরবর্তী সময়ে “ফেরারি আসামি” (২০১২) এবং “ফেরারি আসামির দিনলিপি ” (২০১৬) নামে আরও দুটি কাব্যসংকলনও প্রকাশ করেছেন।

.

.

গ্রন্থবদ্ধ গল্পগুলির সংখ্যা ২৬ টি। আরও কিছু গল্প অপ্রকাশিত থেকে গেছে। কিছু উপন্যাসও। তাঁর গল্প লেখার ধরন, ভাষা ব্যবহার আমাকে প্রথম থেকেই মুগ্ধ করেছে। শিক্ষাহীন সমাজে ধর্মের নামে নানা গোঁড়ামি অত্যাচারের বিরুদ্ধে তাঁর লেখনী শানিত তরবারির মতো। তেমনি ব্যক্তিজীবনের ভাঙন, পারিবারিক জীবনের নানা অন্তরায়, বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া নিম্নবর্গের জীবনযন্ত্রণার কথাই তিনি বলতে চেয়েছেন।

.

.

ধর্মীয় বিধানকে আক্রমণ না করেও এক বাস্তব ও সত্যের নিরিখে মানবিকতার মহান ঐতিহ্যেই তাঁর গল্পকে মূল বাহন করে তুলেছেন। তেমনি চমকপ্রদ ঘটনা নয়, ঘটনার অন্তরালে মননবিক্রিয়ার প্রেক্ষাপটকেই তিনি তুলে ধরেছেন। মূলত “জীবনের রঙ বদল”, “নৈশ-বিদ্যালয়ের মেয়ে”, “দলিজ” প্রভৃতি গল্প পাঠ করলে বোঝা যাবে লেখকের বিশ্লেষণী ক্ষমতা কতখানি। সংঘাত ও ব্যক্তিদহনের নিবিড় আশ্লেষে পাঠকের হৃদয়কে মোচড় দেয়। প্রতিটিতেই ঝরঝরে গতিময়তার সঙ্গে প্রচ্ছন্ন দিকনির্দেশেরও ইংগিত আছে।

.

.

বহুবিবাহ, বহু সন্তানের জন্ম, শরিয়তি আইন, মৌলানাদের একগুঁয়েমি, মোল্লাতন্ত্রের গোঁড়ামি সবকিছুর মূলেই তিনি তাঁর লেখনীর দ্বারা যুক্তিকে পৌঁছে দিয়েছেন। ভণ্ডামি ও কুসংস্কারকে কখনোই মেনে নিতে পারেননি। “ব্যবধান”  নামে একটি গল্পের চরিত্রের মুখ দিয়ে তিনি বলিয়েছেন —“আমি বলতে চাইছি, ধর্মটা হচ্ছে আফিমের মত একটা নেশা। আফিম খাওয়া মানুষ যেমন বুঁদ হয়ে থাকে, জগতের কোনও খবর কানে পৌঁছয় না, তেমনি যারা ধর্ম ধর্ম করে, ধার্মিক মানুষগুলো অন্য নিরীহ মানুষদের সভ্যজগতের সমস্ত চিন্তা চেতনা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেয়।”

.

.

“আঁধার”  গল্পে আর একটি সমস্যার কথা —“তোমাদের যত অভাব, তার চেয়েও বেশি সন্তান, একটু চিন্তা ভাবনা করলে হয় না? আর তোমার শরীর বলেও তো কথা আছে ?”  ঘিঞ্জি এলাকার বাসিন্দাদের নিম্নমানের জীবনযাত্রা কত অসহায়তায় ভরা, কত কান্নায় সিক্ত, কত হাহাকারে রিক্ত তা তাঁর গল্পের বিষয়। সমাজবোধের জাগরণ এবং কল্যাণের পরমব্রতকেই তিনি ধারণ করতে চেয়েছেন। সর্বোপরি তাঁর অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়েই জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়া।

.

.

সেদিক দিয়ে তুলনামূলক ধর্মসাহিত্যের প্রবক্তা আমেরিকান অধ্যাপক ও চিন্তাবিদ জোসেফ ক্যাম্পবেল-এর কথাটিই সত্য হয়ে উঠেছে —“I don’t believe people are looking for the meaning of life as much as they are looking for the experience of being alive.”  এস এম নিজামুদ্দিনের গল্পে সেই প্রজ্ঞারই অনুরণন শুনতে পাই ।

.

.

কাব্যসংকলন দুটিতে লেখকের ব্যক্তিগত জীবনের নানা অন্তরায় ও দীর্ঘশ্বাস উঠে এসেছে। দৈব দুর্বিপাকে তিনি  মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত হয়ে ফেরারি আসামির জীবন অতিবাহিত করেছেন। বেশ কয়েক বছর ভয়াবহ কষ্টের মধ্যে দিয়েই তাঁর দিন কাটে। সেইসময় পথই তাঁর কাছে বাঁচার একমাত্র আশ্রয়। অনিশ্চিত সেই জীবনবাদের ক্ষয় ও ক্ষরণ কবিতাগুলিতে জীবন্ত হয়ে উঠেছে :

.

.

“ বহুদিন পথে পথে চলতে চলতে
একদিন পথের মাঝে থমকে দাঁড়াই।
কোথায় যাব আমি? কোন্ পথ দিয়ে?
দিশেহারা পথিক, চারিদিকে চেয়ে দেখি
পৃথিবীর অজস্র পথ গেছে এঁকেবেঁকে।

জীবনপথের রণভূমিতে দিনাতিপাত করি
বিস্তর যন্ত্রণা সহ্য করে পথে পথে চলি
অদম্য নেশা পেয়ে বসে আঁকাবাঁকা পথে।

পথের চারপাশে নিঃশব্দ আর একাকিত্ব
প্রতিমুহূর্তের ভাবনারা আমাকে জীর্ণ করে,
সমগ্র সত্তা জুড়ে পথে ঢলে পড়ে ইচ্ছার মৃত্যু।

কালের উজানে বদলে যায় পথের রেখা-চিত্র
জীবনে আসে পরিবর্তনের বৈশাখি ঝড়
সেই ঝড়ে বাঁচার অদম্য আগ্রাসী ক্ষুধা।

জীবন গ্লানির সমুদ্রে সাঁতার কেটে কেটে
এখন চলমান মুহূর্তকে আঁকড়ে ধরি।
বিগত বিস্মৃত হয়ে হেঁটে চলি
আঁকাবাঁকা সেই পথ ধরে।”(দিশাহীন পথ)

.

.

পৃথিবীর কোনও পথই সোজা পথ নয়। জীবনের পথ রণভূমিতে আকীর্ণ। যন্ত্রণার প্রতিটি স্তরেই লেখক আত্মযাপনের নিবিড় মুহূর্তগুলি কবিতার শব্দে গেঁথেছেন । কী মর্মস্পর্শী উপলব্ধি! কী অসাধারণ ক্ষরণ! গ্লানির সমুদ্রে সাঁতার কেটে বাঁচার আনন্দে সামিল হওয়ার প্রয়াসকে কুর্নিশ জানাতেই হয়। বাংলাভাষী পাঠকও এই কবিকে নতুন করে বরণ করে নেবেন।

.

.

.

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *